*
মহবত খান সেই রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারেন না, তার তাবুর অভ্যন্তরভাগ গরম আর বায়ুহীন সেটাই একমাত্র কারণ না–তাবুর ভেতরটা আসলেই সেরকম–বা তিনি তাঁর স্বদেশের সুরা সিরাজ নিজের কয়েকজন বয়োজ্যষ্ঠ সেনাপতিদের সাথে বসে প্রচুর পান করেছেন–সেটাও তিনি করেছেন–কিন্তু সেসব কারণে না তার ঘুম হয়না কারণ তিনি খানিকটা অসন্তুষ্টবোধ করেন যেভাবে সাংক্ষেপিক ভঙ্গিতে তাকে আর তার বাহিনীকে আগ্রা ডেকে পাঠান হয়েছে–এবং সেটাও ম্রাটের আদেশে নয়, তিনি চিন্তা করেন, সম্রাজ্ঞীর আদেশে। তাঁর অসন্তোষের বাড়তি আরেকটা কারণ এই যে তিনি অবশ্য পালনীয় আদেশজ্ঞাপক এই চিঠির মূল আরম্ভক। সে কল্পনা করে যদিও এবারই প্রথম নয় কেন সে সম্রাটের প্রতি তার আনুগত্যকে ব্যবহার করে তাকে একজন সাধারণ সৈন্যের মত এটা সেটা আদেশ দেয়ার সুযোগ কেন মেহেরুন্নিসাকে দেবে। খুররম আর তার মিত্রদের পরাস্ত করতে পারলে তার অনুসারীরা যে বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হত সেটা থেকে এবার অযৌক্তিকভাবে তিনি তাকে আর তার লোকদের কেন বঞ্চিত করেছেন? এবং তিনি যদিও একজন মামুলি রমণী যদিও তিনি তার দেখা সবচেয়ে ধূর্ত আর হিসেবী মহিলা আর সেইসাথে তারই মত পারস্যের অধিবাসী।
তিনি যদিও সম্রাটকে–সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে পরাক্রমশালী মানুষ ভেড়য়া পোষা কুকুরে পর্যবসিত করেছেন কিন্তু সে নিজে তাঁর চেয়ে উন্নত বা নিদেনপক্ষে তাঁর সমকক্ষ সবক্ষেত্রে। তাঁদের দুজনের দেহেই যদিও পার্সী রক্ত প্রবাহিত কিন্তু পারস্যে তাঁর পরিবার অনেকবেশি অভিজাত হিসাবে স্বীকৃত। তাঁর চেয়ে কোনোভাবেই মেহেরুন্নিসার ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার এক্তিয়ার নেই। তিনি ধূর্ত হতে পারেন কিন্তু তিনি কোনোভাবেই তার চেয়ে বেশি ধূর্ত নন। তিনি তার মত কোনো সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দান করেন না এবং তাঁর পক্ষে সেটা সম্ভবও না। মহবত খান যতই নিজের সাথে তর্ক করে, সুতির চাদরের নিচে শুয়ে যতই গরমে মাথা নাড়ে এপাশ ওপাশ করে, ততই তার কাছে মনে হয় মেহেরুন্নিসার কর্তৃত্ব তাঁর আর সহ্য করা উচিত হবে না। খুররমের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আর উত্তরাধিকারী হিসাবে নিজের ভোঁতা বুদ্ধির জামাতা শাহরিয়ারকে প্রবর্ধন করে এখন যখন সুরা শেষ পর্যন্ত পারভেজের মৃত্যুর কারণ হয়েছে তখন সে নিজে তারই মত রাজকীয় ক্ষমতার একজন চৌকষ নিয়ন্তা। সে সম্ভবত ভুলই করেছে আরও আগেই হয়ত অসুস্থ সম্রাট আর তার হিসেবী, স্বার্থসিদ্ধিতে নিপূণা এবং রূঢ়ভাষী প্রধানা মহিয়ষীর বিরুদ্ধে তরুণ মহিমান্বিত খুররমের সাথে নিজের বাহিনী নিয়ে যোগ দেয়ার কথা ভাবা উচিত ছিল? অভিযানে প্রেরণ করার কারণে তারা উভয়েই দরবারে অনুপস্থিত থাকার মানে এই যে তার সাথে মাত্র একবারই খুররমের মুখোমুখি দেখা হয়েছে কিন্তু তিনি সব অর্থেই একজন ভালো আর উদার নেতা এবং মহবত খানের নিজস্ব বাহিনীকে তার এড়িয়ে যাবার সামর্থ্যই সেনাপতি হিসাবে তার দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। খুররম এমনই আনুগত্যে উদ্বুদ্ধ করে যে তার দরবারে এবং দরবারের বাইরে এখনও অনেক অনুগামী রয়েছে যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা সবাই আত্মগোপন করে রয়েছে। তার এখন হয়তো পক্ষ পরিবর্তন করা উচিত? যুবরাজকে দীর্ঘ পশ্চাদপসারণের সময় তার সাথে খুররমের সমর্থকদের সংঘটিত বিচ্ছিন্ন লড়াই আর খণ্ডযুদ্ধ সবসময়েই যুদ্ধের রীতিনীতি মেনেই সংঘটিত হয়েছে। কোনো হত্যাযজ্ঞ, কোনো মৃত্যুদণ্ড, নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু উভয়পক্ষের কোনো দিকেই ঘটেনি যার ফলে তিক্ত ঘৃণা বা দীর্ঘস্থায়ী জিঘাংসামূলক বিবাদের সূত্রপাত ঘটতে পারে।
রজনী অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে মহবত খানের আস্থর নড়াচড়া অব্যাহত থাকে, তার মন এখন ঘুমাবার পক্ষে অনেকবেশি সক্রিয়, তার মনে আরেকটা ভাবনার উদয় হয়। সে কি ক্ষমতার এই দ্বন্দ্বের ভিতরে নিজের জন্য আলাদা স্বাধীন একটা ভূমিকা তৈরি করতে পারে না? বার্তাবাহক আর তার আগে যারা এসেছিল তাঁদের কাছ থেকে সে জানতে পেরেছে যে বসন্তের এই সূচনালগ্নে সম্রাট আর সম্রাজ্ঞী অমাত্যদের বিশাল একটা দল আর সাথে মালবাহী বহর নিয়ে–তাঁদের সাথে বিশাল কোনো বাহিনী নেই–কাশ্মীরের অভিমুখে চলেছেন, খুররমকে সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করার পরে তারা খুশি মনে ধরেই নিয়েছেন যে তাঁদের এই মুহূর্তে ভয় পাবার মত আর কোনো হুমকি নেই। তাদের যদি হিসাবে ভুল হয়ে থাকে তাহলে কি হবে এবং সে নিজে তাঁদের অনুগত, বশংবদও বলা চলে, যত রূঢ়ভাবেই দেয়া হোক না কেন সব আদেশ পালনকারী সেনাপতির ভূমিকা থেকে নিজেকে সম্রাজ্যের এবং সেই সাথে তাদের ভাগ্যের নিয়ন্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
সম্রাট দম্পতি নয় বরং সেই কি তাদের নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থানে নেই? সে আর তার অনুগত দশ হাজার সৈন্য যারা সবাই ব্যক্তিগত ভাবে তার প্রতি অনুগত সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীকে অনুসরণ করতে শুরু করে এবং তাদের নিকট হতে খুররমের সন্তানদের ছিনিয়ে নেয় তাহলে কি হবে? এই মুহূর্তে মৈত্রী করার চেয়ে তখন কি সে খুররমের অনুগ্রহ লাভের জন্য সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে না? আরও ভালো হয়, যদিও সেটা আরও দুঃসাহসের কাজ হবে, সে আফিম আসক্ত সম্রাট আর তাঁর স্ত্রীকেও খুররমের সন্তানদের সাথে বন্দি করে, সে তাহলে উভয় পক্ষের সাথে আলোচনার শর্ত নির্ধারণের সুযোগ পাবে। তার অনুগ্রহ লাভ করতে সম্রাট আর খুররম একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করুক। সে যদি খুররমকে ধাওয়া করা অব্যাহত রাখে বা এই মুহূর্তে তার সাথে মৈত্রীর সম্বন্ধ স্থাপন করে তাহলে সে আর কত সম্পদ লুট করতে পারবে বা কত বেশি ক্ষমতার অধিকারী হবে? এমন একটা কৌশল মোটেই কল্পনা নয়। তাঁর দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে যে সবচেয়ে দুঃসাহসী আর অপূর্ববিদিত পরিকল্পনা অনেক সময় সবচেয়ে বেশি সাফল্য লাভ করে সম্ভবত তাঁদের অভিনবত্ব দ্বারা বিস্ময় আর আতঙ্ক সৃষ্টির কারণে। সে ভাবে পুরো বিষয়টাই ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সে বিপদের মুখোমুখি হয়ে বা দীর্ঘ প্রতিকূলতা পরিহার করার পরিকল্পনা করার সময়েই সে কেবল বেঁচে রয়েছে বলে অনুভব করতে পারে। একজন সৈন্য হিসাবে এটাই তার প্রথম পরিচয়। আগামীকাল সকালে সে অবশ্যই নিজের লোকদের সাথে আলোচনা করবে কিন্তু তাদের আনুগত্য কিংবা পুরষ্কারের জন্য তাদের আকাঙ্খ সম্বন্ধে তার ভিতরে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর মন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। সে পুরো রাজকীয় দলকেই বন্দি করবে এবং সম্রাট তৈরি আর বিনাশের খেলা খেলবে। সিদ্ধান্ত নেয়ার কয়েক মিনিটের ভিতরে মশার ভনভন শব্দ আর গরম উপেক্ষা করে, মহবত খান গভীর, নিরপদ্রব নিদ্রায় তলিয়ে যায়।
