‘আমি আশা করেছিলাম আমার আব্বাজান মহবত খানকে ডেকে পাঠাবেন। আমি আমার বার্তাবাহককে আগ্রা পাঠাবার পরে প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হতে চলেছে।
‘আপনার বার্তাবাহক কি বিশ্বস্ত?
‘হ্যাঁ। আমি নিশ্চিত সে বিশ্বস্ত। কিন্তু আগ্রার পথে তাকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হবে এবং সে সম্ভবত কখনও সেখানে পৌঁছাতেই পারে নি। সম্রাজ্ঞী হয়ত আমার অভিযান সম্পর্কে আগেই জানতে পেরেছিলেন এবং তাকে অভিগ্রহণের জন্য আততায়ীর দল প্রেরণ করেছেন। সে হয়ত দস্যুবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে বা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমার হয়ত একজন ইউরোপীয়কে পাঠান উচিত হয় নি। আমাদের চেয়ে তারা অনেক অল্পতেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবকিছু যদি ঠিকমত সংগঠিত হতো তাহলে এতদিনে তার আমাকে খুঁজে পাবার কথা। মহবত খান যদি আমাকে অনুসরণ করা অব্যাহত রাখে তাহলে আমার গন্তব্য মোটেই গোপন কোনো ব্যাপার নয় আর তাছাড়া অনেকেই হুগলী থেকে এদিকে আমার বাহিনীকে আসতে দেখেছে। খুররম মুখ তুলে রাতের আকাশের উজ্জ্বল তারকারাজির দিকে তাকায়। মাথার উপরের এই রহস্যময় আর অনন্ত বিস্তারের কাছে মানুষের জীবন কত নগণ্য আর ক্ষণস্থায়ী…
‘এতটা বিষণ্ণ হবেন না। আজম খানের কর্কশ কণ্ঠস্বরে তার ভাবনার রেশ ছিন্ন হয়। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। আমার বহুবছরের অভিজ্ঞতা একটা জিনিষ অন্তত আমায় শিখিয়েছে–ধৈর্যধারণ করতে। সবকিছু এখনও হয়ত ঠিক হয়ে যাবে।’
খুররম মাথা নাড়ে কিন্তু সেটা কেবল ভদ্রতার খাতিরে। তাঁর পক্ষে ধৈর্যধারণ করা সম্ভব না বিশেষ করে তার নিজের এবং তাঁর পরিবারের জীবন যখন বিপজ্জনভাবে ভারসাম্যে বিরাজ করছে।
*
কিন্তু দুইদিন পরে, আজম বকসের ধারণাই সঠিক প্রমাণিত হয়। খুররম আরজুমান্দের সাথে বসে থাকবার সময় সহসা নতুন লোকের আগমন ঘোষণা করে দূর্গের ছোট তোরণদ্বার থেকে ঢোলের শব্দ ভেসে আসতে শুনে। সে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সংকীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচের আঙিনার দিকে নামতে শুরু করে।
নিকোলাস ব্যালেনটাইন ঘোড়া থেকে নামছে। সে মুখ ঢেকে রাখা কাপড় সরাতে খুররম দেখে তাকে পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে। তার চোয়ালের হাড় বসে গিয়েছে এবং তার গালে বেশ কয়েকদিনের না কামানো দাড়ির জঙ্গল।
‘যুবরাজ।
নিকোলাস যখন তাঁর সামনে হাঁটু ভেঙে বসতে যাবে খুররম দ্রুত তাকে বলে, ‘এসবের এখন কোনো প্রয়োজন নেই। আমায় বলো কি হয়েছিল। তুমি কি আব্বাজানের কাছে আমার পত্র পৌঁছে দিতে পেরেছিলে? তিনি কি উত্তর দিয়েছেন?
‘কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমি আগ্রা পৌঁছাই যদিও আমি যেমনটা আশা করেছিলাম তার চেয়ে ধীর গতিতে অগ্রসর হই। সম্রাট দেওয়ানি আমে আমার সাথে দেখা করেন যেখানে বাস্তবিকই তিনি আপনার চিঠিটা পাঠ করেছিলেন। তিনি পরের দিন আমাকে এটা দিয়ে আপনার কাছে নিয়ে আসতে বলেন। নিকোলাস তার চামড়ার আঁটসাট জামার ভেতর হাত দিয়ে চামড়ার থলেটা বের করে যা জাহাঙ্গীর তার কাছে দিয়েছে। রাস্তায় কয়েক ঘন্টার জন্য ঘুমাবার সময়ও সে সবসময়ে এটার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সতর্ক থেকেছে, সবসময়ে থলেটা তার জামার ভেতরে বুকের কাছে গুঁজে রেখেছে। সে খুররমের হাতে থলেটা তুলে দেবার সময় বুঝতে পারে তার উপর থেকে একটা বোঝা নেমে গেল।
খুররম অস্থির আঙুল দিয়ে থলেটা খুলে, ভেতর থেকে চিঠিটা বের করে এবং পড়তে শুরু করে। নিকোলাস তার দিকে তাকিয়ে প্রথমে তাঁর চেহারায় খুশি, তারপরে বিভ্রান্তি এবং শেষে সেখানে ক্রোধের অভিব্যক্তি ফুটতে দেখে। সে একই সাথে খুররমকে দ্রুত শ্বাস নিতে শুনে এবং তাকিয়ে দেখে কীভাবে তার আঙুল কাগজটা দোমড়াতে শুরু করেছে। তারপরে সহসা নিকোলাস এবং তাঁর দেহরক্ষীদের এবং প্রাঙ্গণে উপস্থিত অন্যান্য পরিচারকদের উপস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠে, সবাই একাগ্রচিত্তে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে বুঝতে পেরে খুররম মনে হয় নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। তোমাকে ধন্যবাদ,’ সে মৃদু কণ্ঠে নিকোলাসকে বলে। তুমি একটা কঠিন দায়িত্ব আনুগত্যের সাথে আর দারুণভাবে সম্পন্ন করেছো। তোমার বিশ্রাম নেয়া হলে আমরা তখন আবার এ বিষয়ে আলোচনা করবো। আমি জানতে চাই দরবারে তোমার অবস্থানের সময় কি কি হয়েছিল কিন্তু তার আগে আমায় আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে হবে।’
খুররম যখন ঘুরে দাঁড়িয়ে ছায়ার ভিতরে ফিরে এসে উপরের তলায় উঠে যাওয়া সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করে, নিকোলাসের কাছে তাকে তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ মনে হয় যিনি কিছুক্ষণ আগে সূর্যালোকিত আঙ্গিণায় উদ্গ্রীব ভঙ্গিতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর মাথা নত করা এবং তিনি ধীর পায়ে আরজুমান্দের কক্ষের দিকে এগিয়ে চলেছেন যেন তিনি সেখানে পৌঁছানোটা যতটা দেরি করা সম্ভব করতে আগ্রহী।
আরজুমান্দ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তোমার বার্তাবাহক দরবার থেকে ফিরে এসেছে, তাই না? খুররম মাথা নাড়ে এবং ধীরে ওক কাঠের পাল্লা যুক্ত দরজাটা নিজের পেছনে টেনে বন্ধ করে দেয় যাতে কেউ তাদের দেখতে না পায়।
‘খুররম, আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? আপনার আব্বাজান কি বলেছেন?
সে প্রথমে ইতস্তত করে, তারপরে বলতে আরম্ভ করে। আমি যদি বালাঘাটে আমার অবশিষ্ট লোকদের নিয়ে যেতে রাজি হই আমাকে সেখানের সুবেদার করা হয়েছে তাহলে আব্বাজান মহবত খান আর তার বাহিনীকে ডেকে পাঠাবেন। আমাকে সম্মতি দিতে হবে যে তিনি দরবারে ডেকে না পাঠান পর্যন্ত আমি সেখানে যাব না।’
