‘আমি কেবল আপনার বিষয় ভাবছি,’ জাহাঙ্গীরের আরেকটু নিকটে সরে এসে সে কিছুক্ষণ পরে বলে এবং নিজের মাথাটা তার কাঁধে রাখে। সে টের পায় তিনি প্রায়শই যেমন করে থাকেন ঠিক সেভাবে তাঁর লম্বা চুলে বিলি কাটতে শুরু করেছেন। খুররমের আচরণের কারণে আপনি যথেষ্ট দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়েছেন। কিন্তু আপনি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে রাজি হয়ে একজন মহান সম্রাটের ন্যায় ক্ষমাপ্রদর্শন করেছেন কিন্তু আপনাকে নিজের জন্যও সতর্ক থাকতে হবে। আমার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন এবং আমি নিশ্চিত তাহলে সবকিছু আপনি যেমন চান সেরকমই হবে। খুররমকে আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে এবং আপনি মহবত খান আর তার বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে পারবেন তাকে অনুসরণ করা বন্ধ করে। অকৃতজ্ঞ আর বিদ্রোহী সন্তানদের কারণে আপনি ইতিমধ্যে অনেক সহ্য করেছেন। এসবের একটা সমাপ্তি হওয়া দরকার।’
জাহাঙ্গীর তার হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে নিজের চোখ কচলায় তারপরে সে হাসে যদিও সেটা একটা বিষণ্ণ আর ক্লান্ত হাসি। আমি নিশ্চিত, তুমি ঠিকই বলেছো। তুমি সবসময়ে তাই বলে থাকো। আগামীকাল আমি আমার মন্ত্রণাদাতাদের ডেকে পাঠাব এবং তাদের আমার সিদ্ধান্ত জানাব। খুররমের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে ভালোই হয়। আমি আমার নাতিদের সঙ্গ উপভোগই করবো। দারা শুকোহ নিশ্চয়ই এতদিনে অনেকটাই বদলে গিয়েছে।
*
পরের দিন সকালবেলা, নিকোলাস জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত কক্ষে যাবার আদেশ লাভ করে। আগ্রায় পৌঁছাবার পর থেকেই সে খসরুর হুশিয়ারি স্মরণ করে আতঙ্কিত হয়ে রয়েছে। কিন্তু অনাকাঙ্খিত কিছুই এখনও ঘটেনি এবং সে নিরাপদে জাহাঙ্গীরের হাতে তাঁর চিঠিটা পৌঁছে দিয়েছে।
নিকোলাসকে একজন কর্চি যখন পথ দেখিয়ে একটা কক্ষে নিয়ে আসে সে জাহাঙ্গীরকে কক্ষের কেন্দ্রে নিজের রাত্রিবাস পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁর মাথার ধুসর চুল অবিন্যস্ত। নিকোলাসের মাথা নত করা অভিবাদনের প্রতি তিনি স্বীকৃতি দেয়ার সময় তাঁর ঝুলে পড়া মুখের মাঝে অতীতের সেই কর্তৃত্বপরায়ণতার একটা ছাপ ঠিকই ফুটে উঠে কিন্তু ইংরেজ দূত তাকে এখন যখন তাঁর একান্ত কক্ষে দেখে সে স্পষ্টই দেখতে পায় তিনি আর স্যার টমাস যখন পানাহারের সাথী ছিলেন আর সকাল না হওয়া পর্যন্ত সারারাত ভর গল্প করতেন সেই সময়ের তুলনায় তিনি কতটা বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
‘এটা আমার ছেলের কাছে নিয়ে যাও।’ জাহাঙ্গীর তার দিকে কারুকাজ করা একটা চামড়ার থলে এগিয়ে দেয়। তার চিঠির উত্তর ভেতরে রয়েছে। যত্ন করে রাখবে। আমি তোমার আর তোমার দেহরক্ষীদের জন্য তাজা ঘোড়ার বন্দোবস্ত করতে বলেছি যাতে তোমরা দ্রুত যেতে পারো।
‘জাহাপনাকে ধন্যবাদ।’ নিকোলাস থলেটা নেয়, জাহাঙ্গীর কি লিখেছেন জানবার জন্য তাঁর ভীষণ আগ্রহ হয়। সে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে আশা করে যে জাহাঙ্গীর হয়ত তাকে কোনো ইঙ্গিত দেবেন কিন্তু সম্রাট ইতিমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং একজন পরিচারকের ধরে থাকা পানি ভর্তি রূপার পাত্রে মুখ প্রাক্ষালণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
জাহাঙ্গীর আধ ঘন্টা পরে একটা গবাক্ষ থেকে নিকোলাস আর তার দেহরক্ষীদের আগ্রা দূর্গ থেকে নিচে আগ্রার ঘিঞ্জি রাস্তার দিকে নেমে যাওয়া ঢালু পথ দিয়ে দুলকি চালে নামতে দেখে। তাঁর চিঠির প্রতি খুররমের প্রতিক্রিয়া কি হবে? তিনি ভাবতে চেষ্টা করেন। আর ঠিক তখনই আরেকটা ভাবনা প্রথমবাবের মত তার মনে উদিত হয়। আরজুমান্দ কীভাবে–তাঁর প্রিয় মেহেরুন্নিসার বংশের আরেকজন রমণী–প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে? সে কি নিজের সন্তানদের যেতে দিতে রাজি হবে নাকি খুররমকে অনুরোধ করবে বিষয়টা প্রতিহত করতে?
২.০৫ চরম মূল্যশোধ
‘মহবত খান আপনাকে পরাজিত আর বন্দি করার জন্য তার সাধ্য অনুযায়ী সবকিছু করবে।’ আজম বকস জ্বলন্ত কয়লার পাত্রে গুতো দেয় এবং খুররমকে তাঁর তেপায় নিয়ে আরেকটু নিকটে উষ্ণতার কাছে আসতে ইঙ্গিত করে। শরতকাল সমাগত প্রায় এবং পাহাড়ের উপর দিয়ে উত্তরপশ্চিম দিক থেকে ইতিমধ্যেই শীতল বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করায় তারা দু’জনে, গান্ধক নদীর তীরে মাটির ইটের তৈরি দূর্গের প্রাঙ্গণে যেখানে বসে রয়েছে যেখানে আজম বকস খুররম আর তার পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে, সামান্য কাঁপতে থাকে।
‘মহবত খানকে আপনি চেনেন? খুররম খানিকটা বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চায়। আজম বকস একজন বৃদ্ধ মানুষ–সত্তরের অনেক উপরে তাঁর বয়স–আর যুবক বয়সে তিনি আকবরের বাহিনীতে যুদ্ধ করেছেন।
‘কেবল তাঁর নামে চিনি। তারা বলে লোকটা নাকি জাত সেনাপতি, অকুতোভয় আর বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান আর সেই সাথে উচ্চাকাঙ্খী। তাঁর এমনই গুণ যে তাঁর রাজপুত অশ্বারোহীরা সে যদিও তাদের গোত্রের লোক না তবুও আমৃত্যু তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছে।’
খুররম অপলক দৃষ্টিতে গনগনে কয়লার মাঝে তাকিয়ে থাকে। সেদিনই সকালে আজম বকসের কয়েকজন লোক এসে যখন জানিয়েছে যে মহবত খানের অগ্রবর্তী বাহিনী মাত্র চার সপ্তাহ দূরে অবস্থান করছে সে রীতিমত বিস্মিত হয়েছে। সে আশা করেছিল এখানে সে কিছুদিন নিরাপদে অবস্থান করতে পারবে। তার ছেলেবেলার স্মৃতিতে আবছা মনে থাকা এই বৃদ্ধ যোদ্ধার কাছ থেকে পাটনার উত্তরে তাঁর পৈতৃক শক্তঘাঁটিতে আশ্রয়ের আমন্ত্রণ লাভ করা তাঁর জন্য ছিল স্বাগত বিস্ময়। সে হুগলী ত্যাগ করার এক সপ্তাহ পরে আজম খানের লোকজন তাকে খুঁজে পায়। বৃদ্ধ লোকটা তাঁর চিঠিতে জানায় যে তিনি খুররমের দুরবস্থা সম্বন্ধে জানেন এবং আকবরের স্মৃতির খাতিরে, যাকে তিনি শ্ৰদ্ধ করেন, জানেন যে খুররম তার প্রিয় নাতি ছিল, তিনি তাকে সাহায্য করার প্রস্তাব করছেন। খুররম সাথে সাথে রওয়ানা দিয়েছিল যা তাকে হুগলীর প্রায় দুইশ মাইল উত্তরে নিয়ে আসে। কিন্তু আরো একবার মনে হচ্ছে এই আশ্রয়ও ক্ষণস্থায়ী প্রতিপন্ন হতে চলেছে। মহবত খানের বাহিনীর বিরুদ্ধে এই ছোট দূর্গ কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারবে না। সে তার বন্ধুকে কোনোভাবেই বিপদে ফেলতে পারে না। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল মহবত খানের বাহিনী এখনও কেন তাকে অনুসরণ করছে।
