জাহাঙ্গীর সবুজাভ-নীল রঙের একটা রেশমের তাকিয়ায় পিঠ ঠেকিয়ে মেহেরুন্নিসার পাশে আধশোয়া হতে, সে খুররমের চিঠিটা এমন ভঙ্গিতে পুনরায় হাতে তুলে নেয় যেন সে পুরো বিষয়টা বিবেচনা করতে আগ্রহী কিন্তু সে আসলে নিজে চিন্তা করার জন্য খানিকটা সময় নিতে চাইছে। তার মনে ইতিমধ্যেই একটা পরিকল্পনা রূপ নিতে শুরু করেছে কিন্তু তার নিজেকে আগে নিশ্চিত হতে হবে যে সে প্রতিটা আঙ্গিক বিবেচনা করেছে। খুররমকে সে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারে না সে যদি একবার দরবারে ফিরে আসে ভালো করেই জানতে পারবে–যা সে করবেই–যে সেই ছিল তার আব্বাজানের ক্রোধের মূল উস্কানিদাতা আর ধারণকারী। সে অবশেষে নিজের প্রতিটা শব্দ যত্নের সাথে বাছাই করে মৃদু কণ্ঠে আর ধীরে কথা শুরু করে।
‘আমি প্রায়ই একটা বিষয় ভাবি কি পরিতাপের বিষয় যে খুররম উচ্চাকাঙ্খার দ্বারা নিজেকে এভাবে প্রলুব্ধ হবার সুযোগ দিয়েছে। সে এখন পর্যন্ত নিজের কর্মকাণ্ড দ্বারা একটা বিষয় নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে যে শাসক হবার অধিকার খসরুর চেয়ে–বা বস্তুতপক্ষে হতভাগ্য পারভেজের চেয়ে যে সুরার প্রতি নিজের আসক্তি কখনও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি কোনোভাবেই তার বেশি প্রাপ্য নয়। কিন্তু তাঁর গুণ আছে এবং সে যদি আপনার প্রতি বাস্তবিকই অনুগত হয়ে থাকে তাহলে সাম্রাজ্যের মঙ্গলের জন্য তার গুণাবলী কেন নিয়োগ করা হবে না? আর আপনি একটু আগে যেমন বললেন, আপনি যদি তার সাথে উদারতাপূর্ণ আচরণ করেন তাহলে সেটা আপনার প্রতি প্রজাদের শ্রদ্ধাই কেবল বৃদ্ধি করবে।’
জাহাঙ্গীর মাথা নাড়ে, স্পষ্টতই খুশি হয়েছে। মেহেরুন্নিসা উৎসাহিত বোধ করে, কথা অব্যাহত রাখে। কিন্তু আপাতত তাকে কিছুদিন দরবার থেকে দূরে রাখাটাই হয়ত বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাকে কোনো দুর্গম প্রদেশের রাজ্যপালের দায়িত্ব দেন। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থান করে কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দ্বারা পুনরায় তাকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে দেন। আপনি তারপরেই কেবল জানতে পারবেন যে তাঁর এই বশ্যতা স্বীকার ঠিক কতখানি আন্তরিক।’
‘আমি তাকে বালাঘাটের সুবেদার হিসাবে প্রেরণ করতে পারি…’
হিন্দুস্তানের মধ্যভাগের এই প্রত্যন্ত প্রদেশের নাম উল্লেখ করায় যেখান থেকে খুব কমই খাজনা পাওয়া যায়-যা নিশ্চিতভাবেই বিশাল একটা বাহিনীকে সুসজ্জিত করার জন্য যথেষ্ট নয়–মেহেরুন্নিসা হাসে। সে নিজেও এরচেয়ে উপযুক্ত কোনো প্রদেশের নাম ভাবতে পারে না। ‘চমৎকার একটা প্রস্তাব, সে বলে। বালাঘাট, কিন্তু সেই সাথে দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলো থেকে খুব একটা দূরে নয় যারা সবসময়ে আপনার জন্য সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করে এসেছে। আপনার বিরুদ্ধে তাঁরা যুবরাজকে হয়তো বিদ্রোহী করার প্রয়াস নেবে। তারা বলছে যে যৌথ বাহিনী গঠন করার পরামর্শ মালিক আম্বার খুররমকে দিয়েছে।’
‘আমি হয়তো তার জন্য অন্য কোনো স্থান খুঁজে বের করবো? সেটা কাবুল হতে পারে?’ জাহাঙ্গীর তাঁর আব্বাজানের রক্ষিতা আনারকলিকে প্ররোচিত করার পরে সেখানে নিজের নির্বাসনের কথা ভেবে ক্ষণিকের জন্য হেসে উঠে। মেহেরুন্নিসাকে তখনই সে প্রথমবারের মত দেখেছিল।
না। কাবুল অনেকবেশি গুরুত্বপূর্ণ আর সমৃদ্ধশালী এলাকা, জাহাঙ্গীরের ভাবনা তাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছে সে সম্বন্ধে উদাসীন, মেহেরুন্নিসা বলে। তাঁর ধৃষ্টতার জন্য এটা রীতিমত পুরষ্কার হিসাবে বিবেচিত হবে। বালাঘাট সেই তুলনায় অনেক ভালো। সে যদি সেখানে যায় তাহলে তাকে নিজের অহঙ্কার বিসর্জন দিতে হবে। কিন্তু আমাদের তার আগে নিশ্চিত হতে হবে সে আবারও বিদ্রোহ করার জন্য আগ্রহী হবে না।’
‘কিন্তু কীভাবে? তাঁর সম্বন্ধে খবর পাঠাতে গুপ্তচর প্রেরণ করা যায়।
না। গুপ্তচরদের কেনা সম্ভব। আমার ধারণা খুররম নিজেই হয়তো উত্তরটা দিতে পারবে। সে তাঁর চিঠিতে নিজের জীবনের কসম করে সে আপনার প্রতি নিজের আনুগত্যের কথা বলেছে–কিন্তু সেই সাথে সে নিজের পরিবারের কথাও বলেছে। আপনি সেটাই পরীক্ষা করে দেখেন।
কীভাবে?
আপনি আপনার ক্ষমার শর্ত হিসাবে তার বড় ছেলে দারা শুকোহকে দরবারে পাঠাবার আদেশ দেন–আর সেইসাথে দারার কোনো এক ভাই তার সাথে আসতে পারে।’
‘তুমি বলতে চাইছে বন্দি হিসাবে?’
‘হ্যাঁ, এক অর্থে দেখতে গেলে আপনি তাই বলতে পারেন। খুররমে ছেলেরা যদি আপনার কাছে থাকে তাহলে সে আপনার বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার সাহস পাবে না।
‘আমি বিশ্বাস সেটা… কিন্তু তাকে তার সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা করাটা কি ঠিক হবে? আমি আমার নিজের ছেলেবেলার অভিজ্ঞতা থেকে জানি পিতামাতার ভালোবাসা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’ জাহাঙ্গীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন পুরান একটা অন্ধকার ছায়া তাঁর মনের প্রান্তরে ভেসে উঠেছে।
তাঁদের সাথে ভালো আচরণ করা হবে এবং তারা তাদের দাদাজানের কাছে দরবারে অবস্থান করলে যেসব সুবিধা ভোগ করবে সেটার কথাও বিবেচনা করবেন। আর খুররম যদি সত্যিই চিঠিতে যা লিখেছে সেটা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নই উঠবে না।’
জাহাঙ্গীর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। মেহেরুন্নিসা বুঝতে পারে তার পরামর্শ তাকে বিস্মিত করেছে, সম্ভবত তাকে চমকে দিয়েছে, কিন্তু তিনি যখন বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করবেন তিনি অবধারিতভাবে এর মাঝে বিচক্ষণতার ছায়া দেখতে পাবেন। সে নিজে যতই বিষয়টা নিয়ে ভাবে, ততই তার ধারণাটা পছন্দ হয়, যদিও তাকে একটা বিষয় নিশ্চিত করতে হবে যে বস্তুতপক্ষে জাহাঙ্গীর যেন তার নাতিদের খুব বেশি একটা দেখতে না পায়…
