দুই মাস পূর্বে, সুরার প্রভাবজনিত চিত্তবৈকল্যের কারণে উচ্চস্বরে প্রলাপ বকতে বকতে পারভেজের মৃত্যু তাকে প্রচণ্ড দুঃখ দিয়েছে, তিনি নিজেই নিজের সুরা আর মাদক সেবনের পরিমাণ সম্পর্কে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছেন আর সম্ভবত তার অন্যান্য সন্তানদের ভুলগুলোর প্রতিও তাঁর মনোভাব অনেকবেশি নমনীয় হতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোয় তিনি বেশ কয়েকবার খসরুর বন্দিদশার কঠোরতা হ্রাস করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন…
মেহেরুন্নিসা বাইরে পায়ের শব্দ আর কণ্ঠস্বর শুনতে পায় হুশিয়ার সম্রাট আসছেন। তারপরে তুতকাঠের উপর গজদন্তের কারুকাজ করা দুই পাল্লার দরজা খুলে যায়। জাহাঙ্গীর তার কক্ষে প্রবেশ করা মাত্র সে তার দিকে দৌড়ে যায় এবং তাঁর হাত ধরে। আপনাকে অসুস্থ আর বিব্রত দেখাচ্ছে। বা-দৌলত এমন কি লিখেছে যা আপনাকে এতটা বিপর্যস্ত করে তুলেছে? তুমি নিজে তাঁর চিঠিটা পড়ে দেখো।
মেহেরুন্নিসা তাঁর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে দ্রুত সেটায় চোখ বুলায়। ‘খুররম খুব ভালো করেই মহবত খানের বিরুদ্ধে সে কোনো রকম প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারবে না তাই সে আপনার কাছে এমন ইনিয়ে বিনিয়ে চিঠি লিখেছে। সে যদিও আপনার করুণা ভিক্ষা করেছে কিন্তু তারপরেও সে এখনও তার দোষ স্বীকার করে নি। এই দেখেন সে কি লিখেছে।’ মেহেরুন্নিসা নিজের মেহেদী রঞ্জিত হাতের আঙুলের অগ্রভাগ একটা পংক্তির উপর রাখে কোনো কারণবশত যা আমার বোধগম্যতার অতীত, আপনার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবার এবং আমার বিরুদ্ধে আপনার ক্রোধের উদ্রেক ঘটাবার দুর্ভাগ্য আমায় বরণ করতে হয়েছে। সে এখনও অহঙ্কার আর ছলনা ভুলেনি। আপনি না চিঠির বক্তব্য অনেকটাই যেন সেই বরং আপনাকে ক্ষমা করছে।
“কিন্তু সে যদি সত্যিই আন্তরিকভাবে আপোষ করতে চায়, জাহাঙ্গীর যুক্তি দেখাতে চেষ্টা করে, আমার বোধহয় বিষয়টা বিবেচনা করে দেখা উচিত। মহবত খান আমার সেরা সেনাপতিদের একজন–আমি সেজন্যই খুররমকে বন্দি করার জন্য তাকে মনোনীত করেছিলাম–আর আমাদের গুপ্তচরেরা যেমন সংবাদ এনেছে যে পারস্যের শাহ আরো একবার কান্দাহার আক্রমণের পরিকল্পনা করছে সেটা যদি সত্যি হয় পারস্যের বাহিনী আক্রমণ করে সেক্ষেত্রে আমি পারস্যের বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রেরণের জন্য তার বাহিনীকে প্রস্তুত অবস্থায় পাবো। সে নিজে একজন পার্সী এবং শাহের প্রাক্তন সেনাপতি হবার কারণে সে তাদের কৌশল আর চিন্তাধারার সাথে বেশ ভালোভাবেই পরিচিত। আর তাছাড়া আমার সন্তানকে পুনরায় আমার কর্তৃত্বের প্রতি বশ্যতা প্রদর্শন করতে দেখলে, স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আনুগত্য প্রদর্শন করছে, আমার সম্মান অনেকটাই বৃদ্ধি করবে।’
মেহেরুন্নিসা তাঁর স্বামীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে বহুদিন তাকে এমন স্পষ্টভাষায় কথা বলতে শোনেন নি। সে যদিও মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে শেষ পর্যন্ত সে যা চাইবে সেদিকেই তাকে সে নিয়ে যেতে পারবে, সম্ভবত তিনি ঠিকই বলছেন। একটা পরিবর্তনের সময় বোধহয় হয়েছে। সে জাহাঙ্গীরকে এইমাত্র যা বলেছে তারপরেও কোনো নিশ্চয়তা নেই যে মহবত খান, যোগ্য আর দক্ষ সেনাপতি হিসাবে তাঁর যতই সুনাম থাক, তিনি খুররমকে বন্দি করতে পারবেন, সে যতদিন বিদ্রোহী থাকবে ততদিনই সে জাহাঙ্গীরের জন্য তাঁর নিজের আর শাহরিয়ার এবং লাডলিকে নিয়ে তার পরিকল্পনার জন্য একটা হুমকি হয়ে থাকবে। খুররম নিজেও একজন দক্ষ আর যোগ্য নেতা। মহবত খানকে মোকাবেলা করতে সক্ষম এমন একটা বিশাল বাহিনী সে হয়ত গঠন করতে পারবে এই সম্ভাবনাকে কখনও উড়িয়ে দেয়া যায় না। সে গুজব শুনতে পেয়েছে যে মালিক আম্বার ইতিমধ্যে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে তার সাথে মৈত্রীর একটা প্রস্তাব দিয়েছে। সে হয়ত এমন একটা বাহিনী গঠনের অভিপ্রায়ে সাম্রাজ্য থেকে একেবারেই পালিয়ে যেতে পারে। পারস্যের শাহ ভৌগলিক ছাড়ের বিনিময়ে তাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারলে খুশিই হবে কোনো সন্দেহ নেই। খুররম যদি শাহকে কান্দাহার শহর যা তিনি ভীষণভাবে অধিকারের কামনা করেন। প্রত্যার্পণের প্রস্তাব দেয় তাহলে কি হবে? মোগল শাসকদের তাঁর নিজের দেশবাসী পূর্বে আরো দুবার সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিল–প্রথমবার বাবর, দ্বিতীয়বার হুমায়ুন–প্রতিবারই তাঁদের কাঙ্খিত কোনো কিছুর বিনিময়ে।
‘তোমার কি মনে হয়? আমার কি রাজি হওয়া উচিত? জাহাঙ্গীর তার হাতের ব্যাঘের মস্তক খোদিত অঙ্গুরীয় যা একটা সময় তাঁর পূর্বপুরুষ মহান তৈমূরের হাতে শোভা পেত, অস্থির ভঙ্গিতে ঘোরাতে ঘোরাতে নাছোড়বান্দার মত জানতে চায়।
মেহেরুন্নিসার মস্তিষ্ক সহসা ঝড়ের বেগে চিন্তা করতে আরম্ভ করে কিন্তু তার অভিব্যক্তি শান্ত দেখায় যখন সে ধীরে কথা বলতে শুরু করে, আপনি সম্ভবত ঠিকই বলেছেন। বহুদিন ধরে এই বিরোধ চলছে এবং এর নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমার নিজের পরিবারের ভিতরেও এই বিরোধের ফলে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে যা আমার নিজের জন্যও অনেক দিন ধরেই কষ্টের একটা কারণ হয়ে উঠেছে। আমি জানি আমার ভাই আসফ খান কতটা খুশি হবে যদি এই দ্বন্দ্বের উপশম ঘটে। কিন্তু আমাদের যত্নের সাথে চিন্তা করতে হবে। আসুন এবং আমার পাশে বসুন।
