‘আমি এখন আপনার সন্তান যুবরাজ খুররমের সহচর, তিনি আমার উপর বিশ্বাস করে মহামান্য সম্রাটের জন্য একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। নিকোলাস তাঁর কাঁধে ঝুলতে থাকা উটের চামড়ার তৈরি লাল রঙের থলের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করে। জাহাঙ্গীর দেখতে পায় উত্তেজনার কারণে তাঁর আঙুল মৃদু কাঁপছে যদিও সে যখন তাঁর উদ্ভট বাচনভঙ্গিতে ফার্সীতে কথা বলে তাঁর কণ্ঠস্বর স্পষ্ট আর সংযত শোনায়।
‘বদমাশটা কি বলার মত ধৃষ্টতা দেখিয়েছে আমি সেটা নিজে পড়ে দেখতে আগ্রহী, জাহাঙ্গীর তাঁর উজির মাজিদ খানকে ইঙ্গিত করতে, তিনি জাহাঙ্গীরের বেদীর ডানপাশে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখান থেকে সামনের দিকে এগিয়ে আসেন এবং তাকে দেবার জন্য নিকোলাসের হাত থেকে চিঠিটা গ্রহণ করেন। জাহাঙ্গীর ধীরে ধীরে সীলমোহর ভাঙেন, চিঠিটা খোলেন এবং মুক্তার মত ঝরঝরে হস্তাক্ষরে লেখা ঘন সন্নিবদ্ধ পংক্তির দিকে তাকান। তাঁর নিজের আব্বাজান মহামতি আকবর–যিনি নিজে লিখতে বা পড়তে অপারগ ছিলেন–খুররমের মার্জিত লিপিকলার জন্য গর্বিত ছিলেন। তিনি সহসা মানসপটে আকবরকে দেখতে পান প্রথমদিন মক্তবে যাবার সময় লাহোরের রাস্তা দিয়ে চার বছরের খুররমকে বহনকারী হাতি নিয়ে বিজয়দৃপ্ত শোভাযাত্রা সহকারে এগিয়ে যাচ্ছেন যখন পুরোটা সময় তিনি নিজে একপাশে কেবল দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিজের জন্মদাতা পিতা আর আপন সন্তান উভয়ের কাছেই সেই মুহূর্তে তিনি ছিলেন অনুপস্থিত।
তার মাথা যেন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়তে চাইছে কিন্তু নিরবে এবং ধীরে পড়তে শুরু করে, তিনি নিজেকে মনোনিবেশ করতে বাধ্য করেন চিঠিতে কি লেখা রয়েছে সেটা বোঝার জন্য।
আব্বাজান, কোনো কারণবশত যা আমার বোধগম্যতার অতীত, আপনার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবার এবং আমার বিরুদ্ধে আপনার ক্রোধের উদ্রেক ঘটাবার দুর্ভাগ্য আমায় বরণ করতে হয়েছে। আপনি আমায় ত্যাজ্য করেছেন। আমায় বন্দি করার জন্য আপনি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছেন এমনকি আমায় অপরাধী ঘোষণা করে আপনি আপনা সাম্রাজ্যের সবাইকে আমাকে হত্যা করার অধিকার দিয়েছেন। আমি আপনার কাছে এসবের কারণ জানতে চাই না। আপনি একজন সম্রাট যার নিজের সাম্রাজ্য নিজের পছন্দমত শাসন করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমি আমার জন্মদাতা পিতা আর সেই সাথে আমার সম্রাট হিসাবে আপনার কাছে এই আবেদন করছি। আপনাকে ক্রুদ্ধ করার মত কোনো কিছু আমি হয়তো করেছি সেজন্য আমি দুঃখিত এবং আমি নিজেকে আপনার করুণার কাছে সমর্পণ করছি। আমার স্ত্রী আর সন্তানেরা এই যাযাবর জীবন আর সহ্য করতে পারছে না, বিশেষ করে কোথায় বা আদৌ আমরা নিরাপত্তা খুঁজে পাবো সেটাই যখন অজানা। আমার জন্য যদি নাও হয়, তাঁদের কথা বিবেচনা করে হলেও, আমি আপনার কাছে মিনতি করছি আমাদের বিরোধ নিষ্পত্তির একটা সুযোগ দেওয়া হোক। আপনি আমাকে যে আদেশ দেবেন আমি সেটা অবশ্যই পালন করবো–সাম্রাজ্যের যে প্রান্তেই আপনি আমাকে পাঠাতে চান আমি সেখানেই যেতে প্রস্তুত–কিন্তু আমাদের মাঝে বিদ্যমান এই বিরোধ সমাপ্ত করেন। আমি নিজের নামে এবং আমার পুরো পরিবারের নামে কসম করে বলছি যে আমি আপনার অনুগত আর বাধ্য সন্তান। আমায় অন্ধকারাচ্ছন্নতা থেকে আপনার ক্ষমার সূর্যালোকে ফিরিয়ে নিন।
জাহাঙ্গীর চিঠিটা নামিয়ে রাখে এবং নিজের সামনের দিকে চোখ তুলে তাকায়। তার অমাত্যদের সবাই তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তাদের কৌতূহলের তীব্রতা তিনি অনুভব করতে পারেন। তিনি আবারও দৃষ্টি নত করে চিঠিটা দেখেন। আপনি একজন সম্রাট যার নিজের সাম্রাজ্য নিজের পছন্দমত শাসন করার অধিকার রয়েছে। খুররম কি আসলেই কথাটা বোঝাতে চেয়েছে?
‘যুবরাজ খুররম আমার অনুগ্রহ ভিক্ষা করেছে, জাহাঙ্গীর অবশেষে বলেন এবং নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সারিবদ্ধ অমাত্যদের মাঝে একটা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তে দেখেন, আমি আমার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করবো। তার সামনে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা নিকোলাসের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে তোমায় ডেকে পাঠাব।’ তারপরে, খানিকটা কম্পিত ভঙ্গিতে এবং তখনও খুররমের চিঠি আঁকড়ে ধরে রেখে তিনি নিজের সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ান, বেদী থেকে নেমে আসেন এবং মন আর মানসিকতায় একটা বিক্ষোভ নিয়ে দরবার ত্যাগ করেন।
*
হেরেমে নিজের কক্ষে জাহাঙ্গীরের আগমনের অপেক্ষায় প্রতিক্ষারত মেহেরুন্নিসা একাকী পায়চারি করে সে খুব ভালো করেই জানে তিনি আসবেন। খুররম চিঠিতে আসলেই কি লিখেছে? সে জানবার জন্য ছটফট করে কিন্তু একই সময়ে খানিকটা শঙ্কিতও বোধ করে। খুররম তার আব্বাজানের সাথে বিরোধের প্রথম মাসগুলোতে যে চিঠিগুলো লিখেছিল সেগুলোর মত এটাও যদি সে কোনোমতে অভিগ্রহণ করতে পারতো। খুররম চিঠিতে যাই লিখে থাকুক, সে খুব ভালো করেই দেখেছে তার চিঠি পেয়ে জাহাঙ্গীর ঠিক কতটা আবেগতাড়িত হয়েছেন। খুররমের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধ যা পুরো বিষয়টা তার জন্য সহজ করে দিয়েছিল তাকে অপরাধী ঘোষণা করতে সম্রাটকে রাজি করাতে প্রশমিত হতে আরম্ভ করেছে। শারীরিক আর মানসিকভাবে জাহাঙ্গীর বৃদ্ধ হচ্ছেন। বার্ধক্যের শীতল বাতাসের প্রথম ঝাপটা যখন পুরুষের উপর বইতে শুরু করে তখন তাদের মাঝে কখনও কখনও যখন সময় রয়েছে তখন নিজেদের জীবনের ভুলগুলি শুধরে নেয়ার একটা আকাঙ্খ জন্মে। জাহাঙ্গীর হয়ত নিজের মনের গহীনে খুররমের সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন।
