‘জাহাপনা। একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে এবং তাঁর স্বপ্নের মাঝে বাস্তবতা এসে হানা দেয়। আগ্রা দূর্গে নিজের ব্যক্তিগত আবাসন কক্ষে দুধের সরের মত রঙের রেশমের কারুকাজ করা নিচু বিছানার উপরে যেখানে সে শুয়েছিল জাহাঙ্গীর মৃদু গোঙানির মত শব্দ তুলে ঘুরে শোয়। সে তখন টের পায় একটা হাত আলতো করে তাঁর কাধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে। জাঁহাপনা, যুবরাজ খুররমের কাছ থেকে একজন বার্তাবাহক এসেছে।’
জাহাঙ্গীর নিজের ছেলের নাম শুনে ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলে এবং ক্লান্ত ভঙ্গিতে উঠে বসে। সুরা-আর আফিমের ধোয়ায় সৃষ্ট তাঁর চমৎকার, শব্দহীন কোমল পৃথিবীর স্বপ্ন ধীরে মিলিয়ে যায় এবং সে চোখ কচলায়। তার বিছানার উল্টো দিকের কারুকাজ করা জালির ভিতর দিয়ে চুঁইয়ে ভিতরে প্রবেশ করা আলোর স্তম্ভের মাঝে সবকিছুই ভীষণ উজ্জ্বল আর নিখুঁত দেখায়। ডিভানের পাশে একটা নিচু তেপায়ার উপরে রাখা রত্নখচিত পানপাত্রের প্রতি তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় যার ভেতর তখনও লাল সুরার কিছুটা অবশিষ্ট আছে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে পানপাত্রটা তুলে নিয়ে একটা চুমুক দেয়, চোখ বন্ধ করে গলার পেছনে তিতকুটে তরলের প্রলেপ অনুভব করে। সে হঠাৎ কাশতে শুরু করে এবং তরুণ পরিচারক যে একটু আগে তার নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটিয়েছে তাঁর দিকে পানি ভর্তি আরেকটা পানপাত্র এগিয়ে দিতে সে পানিটা পান করে।
‘তুমি এইমাত্র কি বললে?
‘আপনার পুত্র, যুবরাজ খুররম, একজন বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন। বার্তাবাহক আপনার সাথে দেখা করার অনুমতি প্রার্থনা করছে।
খুররম? জাহাঙ্গীর এক মুহূর্ত মনে মনে কিছু একটা ভাবে। সে মাঝে মাঝে নিজের প্রাঞ্জল বুনটের স্বপ্নে তার তৃতীয় পুত্রকে দেখেছে কিন্তু সবসময়েই দূর থেকে–নদীর অপর পাড়ে, বা দূর্গের প্রকারবেষ্টিত উঁচু ছাদে বা ধূলোর মেঘের মাঝে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে–সবসময়েই এত দূরে জাহাঙ্গীরের পক্ষে তাকে উদ্দেশ্য কিছু বলা হয়নি এবং আপাতদৃষ্টিতে তাঁর পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। তিনি খুররমকে শেষবার যখন দেখেছিলেন তারপরে অতিক্রান্ত বছরগুলোতে তিনি জেগে থাকা অবস্থায়ও প্রায়ই তাঁর কথা ভেবেছেন, তার আচরণের ফলে সৃষ্ট ক্রোধ আর কষ্টের সাথে মিশে থাকতো অতীতের জন্য একটা আক্ষেপ যখন যুবরাজ ছিল তার সবচেয়ে অনুগত সন্তান যাকে নিয়ে তিনি এতটাই গর্ববোধ করতেন যে তিনি তাকে স্বর্ণমুদ্রা আর মূল্যবান রত্নপাথরে রীতিমত সাত করেছিলেন… সুরা আর আফিমের কারণে তার মন রীতিমত বিভ্রান্ত হয়ে থাকলেও তিনি এটা ঠিকই বুঝতে পারেন যে খুররমের কাছ থেকে এখন কোনো বার্তার একটাই সম্ভাব্য মানে হতে পারে–আত্মসমর্পণ, বিশেষ করে মহবত খান আর তাঁর বাহিনী যখন তাকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছে।
‘আমি দেওয়ানি আমে আসছি,’ তিনি পরিচারককে বলেন, তাঁর কণ্ঠস্বর চাপা শোনায়। দরবার ডাকতে বলো আর সম্রাজ্ঞীর কাছে সংবাদ পাঠাও। বার্তাবাহক কি বলতে চায় তিনি হয়ত জেনানাদের জন্য নির্ধারিত দর্শনার্থী কক্ষ থেকে শুনতে আগ্রহী হবেন… আর এটা আমার সামনে থেকে সরাও, রত্নখচিত পানপাত্রটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে, তিনি একটু থেমে যোগ করেন।
*
জাহাঙ্গীর প্রায় এক ঘন্টা পরে নিজের সিংহাসনে আসন গ্রহণ করে এবং তাঁর ইঙ্গিতে তূর্যবাদক তাঁর হাতের পিতলের বাদ্যযন্ত্রটা নিজের ঠোঁটে স্থাপন করে ধারাবাহিকভাবে ছোট ছোট ধ্বনির একটা সংকেত দিতে যার অর্থ দর্শন দানের জন্য সম্রাট প্রস্তুত। জাহাঙ্গীর তার সিংহাসনের একপাশের দেয়ালের অনেক উঁচুতে স্থাপিত কারুকাজ করা বেষ্টনীর দিকে তাকাতে তার মনে হয় তিনি মুক্তার উষ্ণীষের নিচে একজোড়া কালো চোখের দীপ্তি দেখতে পেয়েছেন। স্বস্তির বিষয়–মেহেরুন্নিসা সেখানে রয়েছেন।
মোগলদের ঐতিহ্যবাহী সবুজ আলখাল্লা পরিহিত চারজন প্রহরীর পেছনে মন্থর গতিতে খুররমের প্রেরিত বার্তাবাহক সামনে এগিয়ে আসবার সময় তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। বার্তবাহক প্রহরীদের পেছনে, অর্ধেক আড়াল হয়ে থাকায় জাহাঙ্গীর তার মুখটা ঠিকমত দেখতে পান না, যারা সিংহাসন থেকে বিশ ফিট দূরে পৌঁছে চৌকষ ভঙ্গিতে দুপাশে সরে যায়। বার্তাবাহক এবার খানিকটা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে, মনে হয় যেন সে এসবের সাথে খুব একটা অভ্যস্থ নয়, মুখ নিচের দিকে রেখে নিজেকে ভূমিতে শায়িত করে, প্রথাগত অভিবাদনের রীতি কুর্ণিশের অনুসারে দুই হাত দুপাশে ছড়ানো। কালো পাগড়ির নিচে, জাহাঙ্গীর দগদগে-লাল ত্বক দেখতে পায়। বার্তাবাহক একজন ইউরোপীয়।
‘আপনি এবার উঠে দাঁড়াতে পারেন, ভালোভাবে দেখার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকে এসে, তিনি বলেন। লোকটা নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে এবং নিজের মাথা তুলতে জাহাঙ্গীর রোদে পোড়া একটা তরুণ মুখাবয়বের মাঝে একজোড়া নীল চোখ দেখতে পান। এই চোখ তার পরিচিত কিন্তু তাঁর মন তখনও মাদকের নেশায় আংশিকভাবে আচ্ছন্ন থাকায় তিনি বার্তাবাহকের দিকে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কে তুমি?
‘অধমের নাম নিকোলাস ব্যালানটাইন। আমি একসময় মোগল দরবারে ইংল্যান্ডের রাজার প্রেরিত রাজদূত স্যার টমাস রো’র ব্যক্তিগত সহচর ছিলাম। নিকোলাস তাঁর কথা শেষ করার মাঝেই সে নিজের ডান পা সামনের দিকে প্রসারিত করে সামান্য নতজানু হলে জাহাঙ্গীরের মনে পড়ে যে স্যার টমাস প্রায়ই এমন ভঙ্গি করতেন। সেসব এখন যেন কয়েক যুগ আগের কথা মনে হয়… রো’র সাথে অতিবাহিত সন্ধ্যাবেলার কথা ভেবে জাহাঙ্গীরের মনটা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।
