ফাদার রোনাল্ডোকে এক মুহূর্তের জন্য বিব্রত দেখায় কিন্তু তারপরে তিনি নিজের কৃশকায় কাঠামোটা নিয়ে উঠে দাঁড়ান। মহামান্য সম্রাট আপনার আব্বাজান জানেন যে আপনি হুগলীতে আমাদের এখানে রয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে আমাদের একটা জাহাজ দরবারের একটা বার্তা নিয়ে ফিরে এসেছে। আমাদের বলা হয়েছে যে আমরা যদি আপনাকে বহিষ্কার না করি তাহলে সম্রাট আমাদের বিরুদ্ধে তাঁর বাহিনী প্রেরণ করবেন আর এই কুঠি জ্বালিয়ে দেবেন। আমরা এটা ঘটতে দিতে পারি না। আমাদের ঈশ্বরের কাজ করতে হবে–অন্ধকারাচ্ছন্নতা থেকে মানবাত্মাকে মুক্তির আলোয় নিয়ে আসতে…’
‘আর মুনাফা করতে হবে, খুররম ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠে। আমার আব্বাজানের যত দোষই থাক আপনাদের ভণ্ড আর স্বার্থান্বেষী বাক্য চয়নের অসারতা বোঝার মত মানসিক স্থিরতা তার এখনও রয়েছে। আপনারা সবসময়ে যে প্রেমময় করুণার বিষয়ে কথা বলেন সেই খ্রিস্টান পরহিত এখন কোথায়? তিন দিন আগে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা একজন অসুস্থ মহিলাকে নিয়ে আপনারা আমায় অনিশ্চিতের পথে রওয়ানা হতে বলছেন।’
‘আমি দুঃখিত। বিষয়টা এখন আর আমার হাতে নেই। আমাদের সম্প্রদায়ের প্রধান আর আমাদের বণিকমণ্ডলীর সভাপতি সম্মিলিতভাবে আমাদের পরামর্শদাতাদের একটা বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
খুররম কোনো কিছু বোঝার আগেই সে টের পায় তার হাত কোমরে থাকা খঞ্জরের বাটে চেপে বসেছে। এই তোষামুদে, আত্ম-প্রবঞ্চক কণ্ঠস্বরটা থামিয়ে দিতে তার ভীষণ ইচ্ছে হয়। আপনি যে বার্তাটার কথা উল্লেখ করছেন–আমার আব্বাজানের স্বাক্ষর কি সেখানে রয়েছে?
না। পাদ্রী নিজের ধুলিধুসরিত স্যান্ডেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। সম্রাজ্ঞীর স্বাক্ষর রয়েছে এবং তাঁর নিজস্ব সীলমোহর যেখানে তাঁর উপাধি নূর জাহান, দুনিয়ার আলো, উৎত্তীর্ণ রয়েছে।
‘আমি আপনাকে একটা কথা বলছি আর আপনার উচিত সেটা মনে রাখা। সম্রাজ্ঞী মোটেই আপনাদের বন্ধু নন। মোগল রসুইঘরের উচ্ছিষ্ট নিয়ে রাস্তার কুকুর যেমন নিজেদের ভিতরে কাড়াকাড়ি করে তিনি ঠিক সেইরকম ঘৃণা করেন প্রতিটা ইউরোপীয়কে। আপনি তার আদেশ পালন করে হয়ত তাঁর রোষের হাত থেকে বাঁচতে পারবেন কিন্তু কোনো পুরষ্কার পাবেন না। আর আমি একদিন যখন মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হব–আমি হবোই–আপনার আজকের এই নিশ্চেতন উদাসীনতার কথা তখন আমার স্মরণ থাকবে।
পাদ্রী বেত্রাহত কুকুরের মত কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়া মাত্র, নিজের জাত ভাইদের কাছে তাদের এই আলোচনার বিষয়টা জানাতে গিয়েছে সেটা নিয়ে খুররম নিঃসন্দেহ, সে দ্রুত চিন্তা করতে করতে সরাসরি নিজের শিবিরে ফিরে যায়। পর্তুগীজদের মাথায় যদি কোনো দুর্মতির উদয় হয়–যেমন তারা যদি তাকে বন্দি করার চেষ্টা করে যাতে তারা তাকে তাঁর আব্বাজানের কাছে সোপর্দ করতে পারবে, তাহলে কুঠি পাহারায় নিযুক্ত পর্তুগীজ সৈন্যদের যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবেলায় তাঁর সঙ্গের তিনশ সৈন্য যথেষ্ট। সে সিদ্ধান্ত নেয়, শিবিরের চারপাশে দুই সারির প্রহরী মোতায়েন করবে এবং আজ রাতে সে নিজে, আরজুমান্দ আর তাদের সন্তানদের নিয়ে পাদ্রীদের সাথে না থেকে শিবিরেই রাত্রিযাপন করবে। সে তার কাছে পরে গিয়ে সবকিছু খুলে বলে তাকে বোঝাবে আসলেই এখানে কি ঘটেছে কিন্তু তার আগে সে অন্য যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা তাকে অবশ্যই করতে হবে।
খুররম প্রয়োজনীয় আদেশ দিয়ে নিজের আবাসিক কক্ষে ফিরে আসে এবং তাঁর নিচু লেখার টেবিলের সামনে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে। সে কিছুক্ষণ নিবিষ্ট মনে চিন্তা করার পরে একটা কাগজ নিয়ে গজদন্তের অগ্রভাগযুক্ত লেখনী তাঁর জেড পাথরের দোয়াতদানিতে ডুবিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করে, প্রতিটা শব্দ কাগজে লেখার আগে তাঁদের গুরুত্ব খুব যত্ন নিয়ে যাচাই করে। সে চিঠিটা মুসাবিদা শেষ করার পরে যা লিখেছে বেশ কয়েকবার পড়ে দেখে। সে তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে প্রহরীদের একজনকে আদেশ দেয় নিকোলাস ব্যালেনটাইনকে ডেকে আনতে। ভিনদেশী কর্চি পাঁচ মিনিট পরে এসে উপস্থিত হয়, তাঁর মাথার উজ্জ্বল সোনালী চুল শক্ত করে বাঁধা একটা কালো পাগড়ির নিচে ঢাকা যা সে সম্প্রতি পরিধান করতে শুরু করেছে।
খুররম শক্ত করে তাঁর কাঁধ আঁকড়ে ধরে। তোমার প্রভু স্যার টমাস রো, হিন্দুস্তান ত্যাগ করার পূর্বে আমায় বলেছিল আমি যদি তোমায় আমার অধীনে নিয়োগ করি তুমি আন্তরিকতা আর আনুগত্যের সাথে আমার সেবা করবে। তিনি কি সত্যি কথা বলেছিলেন?
নিকোলাসের নীল চোখে তার বিস্ময় স্পষ্ট ফুটে উঠে। হ্যাঁ, যুবরাজ।
‘আমার কথা মন দিয়ে শোন–আমি তোমায় সবকিছু খোলাখুলি বলছি। আমাদের পক্ষে হুগলীতে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পর্তুগীজরা ভয় করছে যদি আমাদের আর বেশি দিন এখানে আশ্রয় দেয় তাহলে তারা হয়ত আমার আব্বাজানের কোপের সম্মুখীন হবে আর আমাদের এখান থেকে চলে যেতে বলেছে। আমি ভালো করেই জানি আমাদের পক্ষে ভবঘুরের মত বিচরণ করা সম্ভব না। আমার আব্বাজানের সৈন্যবাহিনী তাহলে অচিরেই আমাদের নাগাল পাবে আর কচুকাটা করবে। আমরা উপকূল থেকে জাহাজে চেপে পারস্যে বা অন্য কোথায় চলে যেতে পারি। কিন্তু আমি আমার মাতৃভূমি থেকে এভাবে বিতাড়িত হতে চাই না। আর তাছাড়া আমার স্ত্রীর শরীরও নাজুক। আমাকে অবশ্যই তাঁর কথা চিন্তা করতে হবে। আমি তাই বিরোধের মীমাংসা করতে আমার আব্বাজানকে একটা চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি জানি না তিনি আমার কথায় কর্ণপাত করবেন কিনা কিন্তু আমাকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে। তোমার কাছে আমার প্রশ্ন হল তুমি কি আমার বার্তাবাহক হতে রাজি হবে? একজন ভিনদেশী হবার কারণে আর সেই সাথে স্যার টমাস রো’র অধীনে কাজ করার কারণে যিনি আমার আব্বাজানের বন্ধুস্থানীয় ছিলেন, অন্য যেকোনো মোগল অমাত্যের চেয়ে আমার আব্বাজানের প্রতিহিংসার সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা তোমার প্রায় নেই বললেই চলে। তুমি সেই সাথে দরবারের আচার আচরণের সাথে পরিচিত এবং জানো কীভাবে সেখানে সবকিছু সম্পন্ন করা হয়। তোমার পক্ষে তাই আমার আব্বাজানের হাতে চিঠিটা পৌঁছে দেয়ার একটা ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
২.০৪ এক ভিনদেশী খবরগির
কাশ্মীরের নৈসর্গিক ভূস্বর্গে সবকিছুরই রং বেগুনী–ডাল হ্রদের দিকে নেমে যাওয়া প্রথম বসন্তে ফোঁটা কুঙ্কুমে ছেয়ে থাকা মাঠ, সূর্যের আলোয় হ্রদের পানির মাঝ থেকে ঝিলিক দেয়া নীলা, বৃত্তাকারে চারপাশ ঘিরে থাকা পাহাড়ের চূড়া… জাহাঙ্গীর প্রথম বসন্তে ফোঁটা ফুলের মাঠে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকে, প্রাণ ভরে তাঁদের তীব্র মিষ্টি সুগন্ধ নেয় আর মাঝে মাঝেই ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে উপরের দিকে ছুঁড়ে দেয় যাতে তাঁর চারপাশে তুষারকণার মত তাঁরা ঝরে পড়ে। নিজেকে তার ভীষণ পরিতৃপ্ত মনে হয়… সত্যিকারের তুষারপাত শুরু না হওয়া পর্যন্ত সে এখানে শুয়ে থাকতে পারবে, তাঁর সমস্ত শরীর ঝুলের মত পড়তে থাকা তুষারের পাতলা কণায় পুরোপুরি ঢেকে যাবে…
