কক্ষের বাইরে থেকে নিজের সন্তানদের চিৎকারের শব্দ শুনে, সে ভাবে, তার নিজের সন্তানদের ভিতরে একতার এমন অভাব যেন কখনও দেখা না যায়। খুররম তার তিন পুত্রকেই ভীষণ ভালোবাসে এবং তারাও তাকে ভালোবাসে। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর ছেলেরা সবাই আপন ভাই, আলাদা আলাদা মায়ের সন্তান না যারা বিভিন্ন স্থানে বড় হবার কারণে তাদের ভিতরে ভ্রাতৃত্ববোধ কখনও পুরোপুরি বিকশিত হতে পারে না, যাদের দেখাশোনা করার জন্য স্নেহময়ী এক মা আছেন। আর সেই সাথে যে বিপদ আর কষ্ট তারা সহ্য করেছে–সম্ভবত এখনও করছে–তাঁদের ভিতরে আরো গভীর বন্ধনের জন্ম দেবে।
নিজের ভিতরে একটা লাথি অনুভব করতে, সে নড়ে ওঠে। এই সন্তানটা কেমন হবে? আরেকটা ছেলে? এই সন্তানটা অনেক বড়–তার উদর আগে কখনও এত বিশাল হয়নি। সে গর্ভাবস্থায় সাধারণত ভালোই বোধ করে আর প্রতিটা সন্তান জন্ম নেয়ার সাথে সাথে সন্তান জন্ম দেয়াটা তার জন্য অনেকটাই সহজ হয়ে এসেছে। কিন্তু এইবার গর্ভাবস্থার সময় সে অসুস্থবোধ করেছে এবং খানিকটা ভয়ও পেয়েছে। সে যতকিছু সহ্য করেছে এবং তার বাহুর ক্ষতটা যা এখনও পুরোপুরি সারেনি, তাঁর মাঝে ভীষণ দূর্বল একটা অনুভূতি জন্ম দেয়… সহসা একটা তীক্ষ্ণ ব্যাথা ঢেউয়ের মত ছড়িয়ে পড়তে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
*
হুগলী নদীর তীর বরাবর কয়েক ঘন্টা শিকার করে ফুরফুরে মেজাজে খুররম যখন জেসুইট পাদ্রীদের আবাসিক এলাকার দিকে ঘোড়ায় চেপে ফিরে আসে সে একটা যুবককে তার দিকে দৌড়ে আসতে দেখে যাকে সে পাদ্রীদের পরিচারকদের একজন হিসাবে চিনতে পারে। সে একজন ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান এবং সুতি কাপড়ের ধুতির পরিবর্তে তাঁর পরনে ইউরোপীয় রীতির কোট আর পাতলুন।
‘আপনার স্ত্রীর গর্ভযন্ত্রণা শুরু হয়েছে, খুররম শুনতে পাবে এমন দূরত্বে পৌঁছান মাত্রই সে চিৎকার করে বলে।
খুররম তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে, তাঁর মনে কেবল একটা ভাবনাই আকৃতি লাভ করে–অনেক তাড়াতাড়ি… অনেকবেশি আগে… সে ঘোড়া নিয়ে দ্রুত আবাসিক এলাকার দিকে এগিয়ে যায়, ঘোড়া থেকে নামে এবং কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আরজুমান্দের কক্ষের দিকে দৌড়ে যায়। সে বন্ধ দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায়, গর্ভযন্ত্রণার স্বাভাবিক কান্নাকাটি শুনতে চেষ্টা করে, কিন্তু সে সবের পরিবর্তে সেখানে নিরবতা বিরাজ করছে এবং বিষয়টা তার হাত পা ঠাণ্ডা করে দেয়। তারপরেই দরজা খুলে যায় এবং পর্তুগীজ পরিচারিকাদের একজন বাইরে আসে। কি হয়েছে? সে জানতে চায় কিন্তু পরিচারিকা মেয়েটা দুর্বোধ্য ভঙ্গিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। সে তাকে ধাক্কা দিয়ে একপাশে সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। আরজুমান্দ রক্তে মাখামাখি অবস্থায় শুয়ে রয়েছে এবং ধাত্রী বসে ছোট আর নিথর কিছু একটা একটুকরো কাপড়ে জড়াচ্ছে।
সে মন্থর পায়ে শয্যার দিকে এগিয়ে যায়, তাকে কি দেখতে হতে পারে ভেবে ভীত। সে তারপরে আরজুমালের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।
‘খুররম–আমি দুঃখিত। আমরা আমাদের সন্তানকে হারিয়েছি…’।
তাঁর কথা বলতে এক মুহূর্ত দেরি হয় এবং তখনও তার গলার স্বর কাঁপছে। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তুমি বেঁচে রয়েছে… পুরোটাই আমার দোষ। তোমায় এত কষ্টের ভিতরে ফেলাটা আমার উচিত হয়নি। আমার উচিত ছিল আগ্রায় আমাকে গ্রেফতার করার সুযোগ আব্বাজানকে দেয়া সেটা না করে তোমায় আর আমাদের সন্তানদের হিন্দুস্তানের প্রান্তরে টেনে নিয়ে এসেছি যতক্ষণ না আমরা পেছনে শিকারী কুকুরের ধাওয়া খাওয়া শিকারে পরিণত হয়েছি।’
না, সে ক্লান্ত স্বরে ফিসফিস করে বলে। এসব কথা বলবেন না। আমরা অন্তত একসঙ্গে রয়েছি, এবং আমরা যতক্ষণ একসঙ্গে আছি ততক্ষণ আমরা আশাবাদী।’
খুররম তাকে আলিঙ্গণ করে এবং আর কোনো কথা বলে না, কিন্তু তাঁর ভিতরে তিক্ততা বাড়তে থাকে। তাঁর সন্তানের এই অপমৃত্যুর জন্য একমাত্র তাঁর আব্বাজান এতটাই দায়ী যে তিনি যেন নিজ হাতে তাকে গলা টিপে হত্যা করেছেন। তাকে আর তার পরিবারকে জাহাঙ্গীরের জন্য যদি এতটা যন্ত্রণা ভোগ না করতে হতো তাহলে আরজুমান্দকে কখনও পালিয়ে বেড়াতে হতো না, নদীতে দুর্ঘটনার শিকার হতে হতো না যা তাদের সন্তানকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত গর্ভে ধারণ করার পক্ষে তাকে ভীষণ দুর্বল করে ফেলেছিল।
*
‘এটা কোনোভাবেই আপনার অভিপ্রায় হতে পারে না।’ খুররম ফাদার রোনাল্ডোর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলার সময় তাঁর কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাস স্পষ্ট বোঝা যায়।
‘আমি দুঃখিত। আমরা আমাদের পক্ষে যতটা সম্ভব করেছি। আমরা তিনমাসের অধিক সময় আপনাদের আতিথিয়তা দান করেছি এবং আপনার এখন অবশ্যই চলে যাওয়া উচিত।’
‘আমার স্ত্রীর মাত্র গর্ভপাত হয়েছে। সে এখনও ভালো করে দাঁড়াতেই পারে না… এই শারীরিক অবস্থায় তাঁর পক্ষে ভ্রমণের ধকল সামলানো সম্ভব না।
‘আপনার স্ত্রীর গর্ভধারণের একটা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সহানুভূতি আর পরহিব্রত আমাদের হাত বেঁধে রেখেছিল… আমরা আমাদের যতটা করা উচিত তার চেয়ে অনেক বেশি ইতিমধ্যেই আপনার জন্য করেছি।’
‘আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না। কি এমন ঘটেছে যা আপনাকে আমাদের প্রতি বিরূপ করে তুলেছে?’ খুররম অকপটে জানতে চায়।
