খুররম কোনো উত্তর দেয় না। এটা ধর্মীয় আলাপের উপযুক্ত সময় না। তার আর তার পরিবারের সাহায্য প্রয়োজন এবং সেটা হয়ত এই লোকটার কাছে পাওয়া যেতে পারে। আপনি কি জানেন কি কারণে আমাকে বাংলায় আসতে হয়েছে? সে পুরোহিতের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করে। হলুদাভ চোখের মণি চঞ্চল হয়ে উঠে।
‘আপনার আর আপনার আব্বাজানের ভিতরে কোনো কারণে একটা মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা শুনেছি, কিছুক্ষণ পরে ফাদার রোনাল্ডো উত্তর দেয়।
ব্যাপারটা মতানৈক্যের চেয়েও বড়। আমাদের ভিতরে প্রায় যুধ্যমান একটা অবস্থা বিরাজ করছে। আমি আমার পরিবার নিয়ে এখানে এসেছি কেবল একটা আশা নিয়ে যে আমি আমার বাহিনী পুনর্গঠিত করার সময় তাঁদের জন্য এখানে একটা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাব। আমার সাথে এখনও অনেকের মৈত্রীর সম্পর্ক রয়েছে।
‘আপনি আসলেই বিশ্বাস করেন যে বিষয়টা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াতে পারে? পুরোহিতকে কেমন বিভ্রান্ত দেখায়।
‘আমি সেটা চাই না কিন্তু সেটাই হতে পারে। আমার আব্বাজান এখন আর কোনোমতেই স্বাধীন নন। তিনি আফিম আর সুরার কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছেন এবং নিজের সাম্রাজ্যের শাসন ক্ষমতা নিজের স্ত্রীর হাতে অর্পন করেছেন।’
‘সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নিসা? আমাদের বণিকদের সম্প্রতি নীল বাণিজ্যের অধিকার দিয়ে জারি করা একটা হুকুমনামায় তার সীলমোহর ছিল। আমরা তখন বিস্মিত হয়েছিলাম, কিন্তু ধারণা করেছিলাম যে সম্রাট অসুস্থ বলেই এমনটা হয়েছে।
‘না। তিনি নন এখন সম্রাজ্ঞীই শাসন পরিচালনা করছেন। আমি পরে আপনাকে সবকিছু খুলে বলবো কিন্তু তার আগে আমায় জানতে হবে যে হুগলীতে আপনি আর আপনার সাথী অন্যান্য পর্তুগীজরা কি আমার পরিবারকে শরণস্থল দান করবেন? আমরা কয়েকশ মাইল পথ অতিক্রম করে এসেছি, অধিকাংশ সময়েই যা ছিল বিপদসঙ্কুল। আমার সন্তানদের বয়স অল্প আর আমার স্ত্রী অসুস্থ এবং সন্তানসম্ভবা। তাঁর বিশ্রাম প্রয়োজন।’
পুরোহিতকে এই প্রথমবার হাসতে দেখা যায়। যুবরাজ, আপনাকে সাহায্য করা খ্রিস্টান হিসাবে এটা আমাদের দায়িত্ব। আপনি যদি আপনার ইংরেজ পরিচারককে আমার সাথে আগে যাবার অনুমতি দেন, আমি তাহলে আমার পুরোহিত ভাইদের সাথে কথা বলতে এবং আপনার বসবাসের জন্য আমরা আবাসস্থল প্রস্তুত করতে পারি।
*
হুগলী নদীর তীরে উঁচু খুটির উপরে অবস্থিত একটা সাধারণ একতলা, তালপাতার বাসার চুনকাম করা একটা কক্ষের মসলিনের পর্দা মৃদু বাতাসে আন্দোলিত হয় যেখানে আরজুমান্দ একটা নিচু নরম ডিভানে শুয়ে রয়েছে। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর দৃষ্টি উল্টো দিকের দেয়ালে ঝুলন্ত রহস্যময় একটা চিত্রকর্মের উপরে স্থির থাকে যেখানে একটা কাঠের ক্রুশে একটা মানুষকে পেরেক দিয়ে আটকানো রয়েছে। লোকটা এতই কৃশকায় যে তার পাজরের সবগুলো হাড় বাইরের দিকে বের হয়ে আছে এবং একটা কাঁটাযুক্ত মুকুটের নিচে থেকে তাঁর মোমের মত ফ্যাকাশে মুখে যা যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে রয়েছে, রক্ত গড়িয়ে নামছে যা এতই গাঢ় দেখতে যে প্রায় কালচে মনে হয়। তার দু’চোখ হতাশভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখের মণি দেখা প্রায় যায়ই না, কেবল শিরাযুক্ত সাদা অংশ চোখে পড়ে। একটা ভয়ঙ্কর চিত্রকর্ম এবং রাতের বেলা সে একটা সাদা কাপড় দিয়ে ছবিটা ঢেকে রাখে কিন্তু দিনের বেলা সে তার পর্তুগীজ পরিচারিকাদের মনে আঘাত দিতে চায় না বলে যারা ভীষণ মমতা নিয়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত। পুরোহিতদের জন্য তাঁরাই খাবার রান্না করে আর সবকিছু ঝেড়েমুছে পরিষ্কার রাখে, এবং সেই সাথে এখানে পুরোহিতদের দেয়াল ঘেরা আঙ্গিণায় তাদের ছোট পরিবারের সব দায়িত্ব আর তাঁর এবং খুররমের সেবা শুশ্রূষার দায়িত্বও তারা নিয়েছে। তাঁরা প্রায়ই অবশ্য পর্তুগীজদের ভীষণ পছন্দের নোনতা মাছ যা এখানে শুঁটকি নামে পরিচিত তাঁদেরও খেতে দেয়। খুররমের সৈন্যরা হুগলীর তীরে বেশ আরামদায়কভাবেই শিবির স্থাপন করে অবস্থান করেছে যেখান থেকে প্রায় আধমাইল দূরে পর্তুগীজদের বাণিজ্য বহরগুলো নোঙর করে রাখা।
আগ্রার স্মৃতি এবং বিশেষ করে তার দাদাজান গিয়াস বেগের কথা, যাকে সে আর কোনোদিনই দেখতে পাবে না, প্রায়ই তার মনে এসে ভীড় জমায়। সে আর খুররম হুগলীতে পৌঁছাবার কিছুদিন আগেই একজন পর্তুগীজ বণিক এখানে এসেছিলেন যিনি পাদ্রীদের বলেছেন যে রাজকীয় কোষাধ্যক্ষ মারা গিয়েছেন এবং মোগল দরবার শোক পালন করছে। সে কথাটা একেবারেই বিশ্বাস করতে পারছে না। তাঁর জীবনে দাদাজানের উপস্থিতি–তাঁদের পুরো পরিবারের সবার কাছে–এতই ব্যাপক ছিল। সংবাদটা অনিবার্যভাবেই তার ভাবনাগুলোকে তাঁর ফুপুজান মেহেরুন্নিসার দিকে ধাবিত করে। মেহেরুন্নিসা নিশ্চিতভাবেই এখন শোকগ্রস্থ… নাকি তিনি? মেহেরুন্নিসার কারণেই, মোগল রাজপরিবার অতীতে বহুবার যেমন হয়েছে, পিতার বিরুদ্ধে পুত্র, সৎ-ভাইয়ের বিরুদ্ধে সৎ-ভাইয়ের মত, আবারও টুকরো হয়েছে। তার মাঝে মাঝে মনে হয় যে তাঁদের এই পারিবারিক সমস্যা অনেকটা ফুলের ভেতরের কীটের মত, অলক্ষ্যে থেকে কুড়ে কুড়ে সবকিছু খায় যতক্ষণ না অনেক দেরি হয়ে যায়।
