হতাশার মাঝে নিজেকে আটকে রেখে, খুররম প্রতিটা গাছ থেকে ঝুলে থাকা সবুজ মসের সেঁতসেতে, রুক্ষ একটা জট ধাক্কা দিয়ে একপাশে সরিয়ে দেয়। আরজুমান্দ পুনরায় গর্ভবতী হওয়ায় তাকে, আর তাঁর সন্তানদের নিয়ে তাঁর সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা। বাচ্চাদের সবাইকে অসুস্থ আর প্যাকাটে দেখায় এবং আরজুমান্দের নিজেরও চোখমুখ দুশ্চিন্তায় বসে গেছে, তাঁর চোখের নিচে কালি পড়েছে। মহানন্দা অতিক্রমের সময় তাঁর উৰ্দ্ধবাহুতে যে ক্ষত হয়েছিল সেটা পুরোপুরি কখনও নিরাময় হয়নি। ক্ষতস্থানটা এখনও তাজা আর ফোলা দেখায় এবং প্রায়ই সেখানে হলুদ পুঁজ জমে। তার কি করা উচিত? তার মাঝে মাঝে মনে হয় মহবত খানের বাহিনীর অবস্থানের ব্যাপারে সে যদি জানতে পারতো… এখন যখন শুষ্ক মওসুম এসে গিয়েছে, তারা কি তার পিছু পিছু আসছে নাকি বর্ষার সময়েই তারা ফিরে গিয়েছে। কোনো তথ্য জানা না থাকলে পরিকল্পনা করা অসম্ভব। দশদিন আগে সে গুপ্তদূতের দায়িত্ব দিয়ে যাদের পাঠিয়েছিল তাঁদেরও এখন পর্যন্ত ফিরে আসবার কোনো লক্ষণ নেই এবং তারা সম্ভবত আসছেও না–স্বপক্ষত্যাগের প্ররোচনা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেকবেশি প্রলুব্ধকারী।
তাঁর মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয় এবং চোখ নামিয়ে সে ছেঁড়া, কাদার দাগ যুক্ত পোষাকের দিকে তাকায়, অনেকটাই তাঁর একসময়ের চৌকষ ঘোড়ার মলিন চামড়ার মত লাগে বেচারার পাঁজরের হাড় এখন স্পষ্ট বোঝা যায়। সে চোখ তুলে সামনের দিকে তাকিয়ে নিজেকে প্রবোধ দিতে চায় জনবসতি ক্রমশ বিরল হয়ে আসছে। উপকূল থেকে তারা এখন নিশ্চয়ই খুব একটা দূরে নেই বা অন্ততপক্ষে গঙ্গার মোহনা থেকে যা নদীপথের একটা সম্পূর্ণ ব্যবস্থা। তারা যদি কোনোমতে একবার নদীগুলোর একটাকে খুঁজে বের করতে পারতো তাহলে সেটাকে ভাটিতে অনুসরণ করে সমুদ্রে… তাঁর ভাবনা যেন ভোজবাজির মত নিজেদের মূর্ত করে তুলে, নিকোলাস ব্যালেনটাইন আর তাঁর আরেকজন দেহরক্ষী সামনের সবুজ ছায়ার মাঝ থেকে আবির্ভূত হয়। সে তাঁদের সকালে পাঠিয়েছিল, নদীর তীরে ডাকাতদের সাথের তিক্ত অভিজ্ঞতা হবার পরে থেকে সে সবসময়েই সামনের পথটা এখন আগেই পর্যবেক্ষণ করে নেয়। কি অবস্থা? তাঁরা শ্রবণ সীমার ভেতর পৌঁছাতেই সে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে।
তার জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছিল যখন সে দেখে তারা একা ফিরে আসেনি। তাঁদের বিশ গজ পেছনে একটা সুন্দর দেখতে সাদা খচ্চরের পিঠে উপবিষ্ট খয়েরী রঙের মোটা কাপড়ের তৈরি লম্বা একটা আলখাল্লা পরিহিত একজন মানুষ যার মুখটা একটা বিচিত্র, চওড়া কিনারাযুক্ত, একটা টুপির আড়ালে ঢাকা।
যুবরাজ, নিকোলাস দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসে, তাঁর অল্পবয়সী মুখটা ঘামে গোলাপি হয়ে রয়েছে। এই লোকটা একজন পর্তুগীজ পুরোহিত। আমরা এখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে জ্বালানী কাঠ কাটতে থাকা একদল লোককে তত্ত্বাবধায়ন করা অবস্থায় তাকে আবিষ্কার করেছি। তার ভাষ্য অনুযায়ী আমরা হুগলীর পর্তুগীজ কুঠির খুব কাছেই অবস্থান করছি।’
হুগলী? খুররম ভ্রুকুটি করে। বাণিজ্য কুঠির বিষয়ে সে তাঁর আব্বাজানকে কথা বলতে শুনেছে। দরবারে গুজব রয়েছে যে সেখানের পর্তুগীজ পুরোহিতেরা স্থানীয় লোকজনকে জোর করে তাঁদের নিজেদের ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করছে আর তারচেয়েও বড় কথা পর্তুগীজ ব্যবসায়ীরা তাঁদের দাস ব্যবসায়ে যাদের জাহাজ সেখানে রয়েছে যারা সম্মতি না দেয় তাদের বিক্রিও করে দিচ্ছে… এই পুরোহিত কি জানে আমি কে?
না, যুবরাজ। তাকে কেবল জানানো হয়েছে যে আপনি একজন মোগল অভিজাত ব্যক্তি।
‘তাকে আমার কাছে আসতে বলো।
পুরোহিত যখন সামনের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে, তখন সে অভিবাদন জানাতে নিজের মাথা নত করে। খুররম পুরোহিতের চওড়া কিনারাযুক্ত টুপির নিচে ছোট করে ছাঁটা দাড়িযুক্ত লম্বা পাতলা বাঁশির মত নাক বিশিষ্ট একটা মুখে হলুদাভ চোখ দেখে। আমি বুঝতে পারছি আপনি হুগলীর একজন পর্তুগীজ পুরোহিত।
হ্যাঁ, জাঁহাপনা, লোকটা ফার্সীতে উত্তর দেয়।
আপনি আমাকে চেনেন?
‘আমার নাম ফাদার রোনাল্ডো। আমি কয়েক বছর পূর্বে আপনার আব্বাজানের দরবারে গিয়েছিলাম। আপনার আব্বাজান সেই সময়ে আমাদের ধর্মের–একমাত্র ধর্মবিশ্বাস–বিষয়ে বেশ আগ্রহ প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি সেই সময়ে আমার মত একজন জেসুইট পুরোহিতকে আপনার ছোট ভাইয়ের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পর্যন্ত করতে চেয়েছিলেন।
খুররম মাথা নাড়ে। তার এখন মনে পড়েছে তার পিতামহ আকবরের ন্যায়–তাঁর আব্বাজানও এই জেসুইটদের বিষয়ে ঠিক কতটা আগ্রহী ছিলেন। একটা সময় ছিল যখন দরবাবে ঝাঁকে ঝাঁকে পুরোহিত দেখা যেত এবং যেনতেনভাবে প্রস্তুত কাঠের তৈরি বিশাল একটা ক্রুশ নিয়ে আগ্রার সড়কে তাঁদের মিছিলের ব্যাপারে আর গির্জা নির্মাণের জন্য তাদের নিরন্তর অনুরোধের বিষয়ে মোল্লারা ভীষণ আপত্তি জানিয়েছিল।
ফাদার রোনাল্ডো তাঁর পাতলা ঠোঁট কুঞ্চিত করে। সম্রাট তাঁর নিজের ধর্মমতের পুরোহিতদের গোড়া বিশ্বাসের কাছে, যারা আমাদের প্রভাবের কারণে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিল আর ঈশ্বরের সত্যিকারের পথ প্রদর্শক হিসাবে আমাদের ভয় করতো, নিজেকে প্রভাবিত হতে দিয়েছেন।
