কিন্তু খুররম যখন ঘুরে দাঁড়িয়ে রোসন্নারাকে তার আরেকজন লোকের হাতে তুলে দিতে যাবে কেরাঞ্চির কাঠামো পুনরায় ভীষণভাবে দুলতে শুরু করে। তাঁর পা পিছলে যায় এবং সে টের পায় স্রোতের শক্তি রোসন্নারাকে তাঁর কাছ থেকে ছিটকে সরিয়ে নিচ্ছে। সে কোনোমতে আবারও দু’পায়ের উপরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উন্মত্তের মত চারপাশে তাকায়। রোসন্নারা! সে চোখের উপর থেকে পানি মুছতে মুছতে চিৎকার করে। রোসন্নারা! সে প্রথমে তাকে দেখতে পায় না কিন্তু পানির ভিতরে সে লাল কিছু একটা দেখে–তার পরনের কোট–এবং তারপরেই তাকে দেখে স্রোতের টানে ভেসে যেতে।
আরজুমান্দ তাঁর ক্ষিপ্ত আর্তনাদ শুনতে পায় এবং নিজেকে কেরাঞ্চির ভিতর থেকে টেনে বাইরে বের করে আনে, তাঁর গালের একটা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত পড়ছে। রোসন্নারা–আমার মেয়ে কোথায়? সে হাহাকার করে উঠে। খুররম ভাটির দিকে ইশারা করে। এখানেই থাকো। আমি তাকে উদ্ধার করছি। কিন্তু খুররম তার কথা শেষ করার আগেই আরজুমান্দ উত্তাল নদীর স্রোতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে যদিও একজন দক্ষ সাঁতারু–আগ্রায় তাঁর হাভেলীর হেরেমের সাঁতারকুণ্ডে সে সাঁতার কাটতে ভালোবাসতো–কিন্তু এখানের এই তীব্র স্রোতের বিরুদ্ধে সে কিছুই করতে পারবে না আর ইতিমধ্যে স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করেছে আর তাছাড়া পানির নিচে লুকিয়ে থাকা পাথর রয়েছে।
খুররম দ্রুত নিজের সিদ্ধান্ত নেয়। সে হাচড়পাঁচড় করে অপর পাড়ে গিয়ে পানি থেকে ওঠে আসে যেখানে ইতিমধ্যে তার বেশিরভাগ সৈন্য পৌঁছে গিয়েছে এবং চিৎকার করে তার জন্য একটা ঘোড়া নিয়ে আসতে বলে এবং তাঁর দেহরক্ষীদের আদেশ দেয় তাকে অনুসরণ করতে। ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠেই পুরু কাদার ভিতর দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে যেতে থাকে আর পুরোটা সময় মথিত হতে থাকা পানির দিকে তাকিয়ে থাকে। নদীটা আর মাত্র কয়েকশ গজ সামনে বাম দিকে গাছপালার ভিতরে তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিয়েছে। স্রোতের বেগ সেখানে কম থাকার কথা এবং সে দেখতে পায় মাঝনদীতেও পানির উপরে লম্বা লম্বা ডাল ঝুঁকে রয়েছে। আরজুমান্দকে এক টুকরো কাঠ আঁকড়ে ভাসতে দেখে তার হৃৎপিণ্ড ধক করে উঠে এবং তার থেকে একশ গজ দূরে একটা লাল কাঠামো–একটা পুতুলের চেয়ে কোনোমতেই বড় হবে না–সেটা রোসন্নারার। তারা বাকের কাছে পৌঁছাবার আগেই তাকে অবশ্যই সেখানে পৌঁছাতে হবে…
সে বাঁকের উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছোটালে গাছের ডালপালা তাঁর মুখে চাবুকের মত আঘাত করে। নিজের ঘোড়াকে চক্রাকারে ঘুরিয়ে নিয়ে বেমক্কা তাকে থামিয়ে সে লাফিয়ে তার পিঠ থেকে নেমে আসে এবং নদীর উপরে ঝুলে থাকা একটা গাছে প্রাণপণে উঠতে শুরু করে। একটা চওড়া, মসৃণ ডালে যা পানির তিন ফিট উপরে রয়েছে সে বহুকষ্টে আরোহণ করে তাঁর ভর যতক্ষণ বহন করতে পারবে বলে তাঁর মনে হয় সে একটু একটু করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। সে তারপরে ডালটা একহাতে তখন আঁকড়ে রেখে সে নিজের দেহ স্রোতের ভিতরে নামায় এবং ঘুরে উজানের দিকে তাকায়। সে একেবারে ঠিক সময়মত এসেছে। মেয়েটা এক পুটলি ভেজা লাল ত্যানার মত দেখায়। সে নিজের খালি হাতটা রোসন্নারা দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে প্রথমে রোসন্নারার পরনের লাল পোষাকটা ধরে এবং তারপরে তার এক হাত। এক হাতে মেয়েকে পানির ভিতর থেকে বাইরে আনতে তাঁর পুরো শক্তি প্রয়োজন হয় এবং পানি থেকে তুলে সে তাকে ডালের উপর বসায় এবং তারপরে সে নিজে উঠে বসে। মেয়ের কষ্ট করে শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনে সে স্বস্তি লাভ করে। মেয়ের দেহ নিস্তেজ হয়ে রয়েছে কিন্তু সে বেঁচে আছে। তার সৈন্যদের একজন পাশের আরেকটা ডালে উঠে আসতে সে তার কাছে মেয়েকে দেয়।
রোসন্নারাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবার সাথে সাথে খুররম আবার ডাল বরাবর সামনের দিকে এগিয়ে যেতে আরম্ভ করেছে। সে আরজুমান্দকে পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে, কাঠের টুকরোটা এখনও সে আঁকড়ে রয়েছে কিন্তু সে অনেক দূর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে তার পক্ষে তাকে ধরা সম্ভব হবে না। সে যখন ঠিক তার বরাবর পৌঁছে খুররম পানিতে লাফিয়ে নেমে তার দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। নদী এখানে বেশ গভীর কিন্তু সে যেমনটা আশা করেছিল বাঁকের কারণে এখানে স্রোত বেশ দুর্বল। দশবারে সে আরজুমাদের পাশে পৌঁছে যায়। বাম হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে, সে বলে, কাঠের টুকরোটা ছেড়ে দাও। আমি তোমায় ধরেছি।’ সে তাঁর কথামত কাজ করে এবং খুররম ডান হাত চালিয়ে আর দুই পায়ে যত জোরে সম্ভব লাথি মেরে তীরের দিকে এগিয়ে যেতে আরম্ভ করে। তার চোখে এতবেশি পানির ঝাপটা লাগে যে কেবল তীরের সবুজ অস্পষ্টতা আর আরজুমান্দকে কোনোভাবে ছুটতে না দেয়া ছাড়া সে পরিষ্কার করে কিছু চিন্তা করতে পারে না।
সে তারপরে কিছু একটা তাঁদের দিকে বাড়িয়ে রাখা হয়েছে দেখতে পায়। ‘জাহাঁপনা, বর্শার হাতলটা আঁকড়ে ধরেন, একটা কণ্ঠস্বর প্রাণপণে চিৎকার করে বলে। সে হাত বাড়াতে তার আঙুল কাঠের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। সে তারপরে বর্শার হাতল শক্ত করে আঁকড়ে ধরলে, টের পায় তাকে কেউ টানছে। সে আর আরজুমান্দ কিছুক্ষণ পরেই কাদার উপরে শুয়ে হাপরের মত শ্বাস নিতে থাকে। আরজুমান্দের ডান বাহুর উদ্ধাংশ ছড়ে গিয়েছে এবং বেশ রক্ত পড়ছে পানিতে কোনো পাথরের সাথে যেখানে সে আঘাত পেয়েছে এবং তাঁর গালেও জখম হয়েছে কিন্তু তার উচ্চারিত শব্দগুলো হলো, রোসন্নারা… আমার মেয়ে ঠিক আছে? খুররম কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। কর্দমাক্ত আর ভিজে জবজবে অবস্থায়, কাঁপতে কাঁপতে তারা যেমন রয়েছে সেভাবেই নিরব কৃতজ্ঞতায় একে অপরকে আঁকড়ে ধরে।
২.০৩ আগন্তুক মেহেরবান
খয়েরী অশুভ দুর্গন্ধযুক্ত, পিচ্ছিল কাদা এখনও তাদের কেরাঞ্চির চাকা আটকে ধরে ভাবটা এমন যেন তাদের অতিক্রম করতে দিতে অনিচ্ছুক। খুররম প্রায় হতাশ একটা অনুভূতি টের পায়। মহানন্দা নদী অতিক্রম করার পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে তারা যখন উত্তরপূর্বদিকে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অভিমুখে রওয়ানা হবার পরে তাঁদের অগ্রসর হবার গতি যন্ত্রণাদায়কভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে, এমনও দিন গিয়েছে যেদিন তারা দিনে তিন কি চার মাইলের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারেনি। বর্ষাকাল অতিক্রান্ত হয়েছে কিন্তু তার চিহ্ন এখনও এখানের, আর্দ্র বাতাস থেকে শুরু করে পচা পাতার পুরু গালিচায় এবং উপড়ে পড়া গাছপালার শাখাপ্রশাখায় এবং বৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হওয়া জলাভূমির এখন বদ্ধ কালো পানির দীপ্তির ভেতর রয়েছে। ডাকাতের দল যদিও আর কোনো সমস্যার জন্ম দেয়নি এবং মহবত খানের উপস্থিতির কোনো লক্ষণ দেখা যায় নি, তারপরেও চারপাশে বিপদ যেন ওঁত পেতে রয়েছে। গাছের নিচে জন্ম নেয়া ঝোঁপঝাড়ে বিষাক্ত সাপ ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যার সময় বোঁ-বোঁ শব্দ করে মশার ঝাঁক হুল ফোঁটাতে উড়ে আসে, উষ্ণ রক্তের জন্য ক্ষুধার্ত। আর তার লোকদের ভিতরে এখন শুরু হয়েছে রোগের প্রাদুর্ভাব–গত দুই সপ্তাহে তাঁর ছয়জন লোক মারা গিয়েছে যাদের ভিতরে রয়েছে তার সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ পরিচারক, শাহ্ গুল, যিনি আগ্রা থেকে তাঁর সাথে আনুগত্যের জন্য নির্বাসনে এসেছিলেন। প্রতিদিন সকালবেলা তার বাহিনীর লোকবল হ্রাস পায় কারণ লোকজন পালিয়ে যেতে শুরু করেছে, তারা নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করে দেখতে আগ্রহী।
