খুররম খুব শীঘ্রই নদীর অপর তীরে জ্বলন্ত মশাল দেখতে পায়–এটা আসলে সংকেত যে মূল পারাপার শুরু করার জন্য ওপাশটা নিরাপদ। বৃষ্টিও থেমে গিয়েছে এবং আকাশে এমনকি এক টুকরো নীল আকাশও দেখা যায় গাড়োয়ানরা যখন মালবাহী শকটগুলো টেনে আনা ষাড়ের প্রথম দলটাকে পানিতে নামার জন্য তাড়া দিতে শুরু করে। প্রতিবাদমুখর জন্তুগুলো কষ্টকর মন্থরতার সাথে নড়া শুরু করে কিন্তু কোনো অঘটন ছাড়াই অপর পাড়ে পৌঁছে যায়। খুররম এরপর মালবাহী খচ্চরের একটা দলকে পাঠায়, কেবল হালকা বোঝা পিঠে চাপানো রয়েছে যেহেতু ভারি মালপত্র আগেই কেরাঞ্চিতে করে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। পানির স্তর যদিও তাদের পেটের ওপরে ওঠে আসে নদীর একটা জায়গায় জম্ভগুলোর কয়েকটা বর্শার অগ্রভাগ দিয়ে খোঁচা দিতে হয় অগ্রসর করতে কিন্তু এই দলটাও অপর তীরে পৌঁছে যায় যেখানে তাঁরা কুকুরের মত নিজেদের গা থেকে পানি ঝরতে শুরু করলে তাঁদের গলায় ঝোলান ঘন্টাগুলো ঝনঝন শব্দে বাজতে থাকে।
খুররম একটু স্বস্তি পায়। অবশিষ্ট শকটগুলোয় কেবল মানুষ রয়েছে এবং মালবাহী শকটের চেয়ে অনেক হালকা। ভাগ্য ভালো হলে দিনের মত বিপদ কেটে গিয়েছে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে এখনও দিনের আলো বেশ ভালোই আছে। রাত নামার পূবেই তারা নদীর তীর আর নিজেদের মাঝে দুই কি তিনমাইলের একটা ব্যবধান তৈরি করতে পারবে এবং সে একটা নিরাপদ স্থানে শিবির স্থাপণ করবে আর রাতে প্রহরী মোতায়েন রাখবে। আহত লোক নিয়ে প্রথমে দুটো শকট নদী অতিক্রম করে। নিকোলাস ব্যালেনটাইন, তার পরনের চোগায় সে যেখানটা কেটেছে তার ভিতর দিয়ে তার পায়ের গুলে বাধা রক্তাক্ত পট্টিটা দেখা যায়, প্রথম কেরাঞ্চির গাড়োয়ানের পাশে বসে রয়েছে, পানির নিচে লুকিয়ে থাকা পাথর আর ভেসে আসা কাঠের টুকরো যা পানিতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে আগেই লক্ষ্য করার জন্য সে সতর্ক চোখে তাকিয়ে রয়েছে। খুররমের তিন পুত্র আর তাদের আয়াদের বহনকারী কেরাঞ্চি এরপরে নদী অতিক্রম করে। তারা যখন নদীর অপর তীরে পৌঁছে তখন অবশেষে আরজুমান্দের শকটের পালা আসে।
শকটটাকে বহনকারী চারটা বিশালদেহী সাদা ষাড় পানিতে নামলে খুররম তাঁর ঘোড়াকে সেটার পেছনে নদীতে নামতে তাড়া দেয়, কোনো ধরনের বিপদ হলে সে কাছাকাছি থাকতে চায়। ধাতু দিয়ে বাধান বিশাল চাকাগুলোর যখন ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করে তাঁদের ভিতর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। গাড়োয়ান ধারালো পাথরের খণ্ড এড়িয়ে যাবার জন্য বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করে। কিন্তু কেরাঞ্চিটা যখন প্রায় মাঝ নদীতে একেবারে সামনের দুটো ষাড়ের একটা পিছলে পড়ে এবং জন্তুটার হাঁটু আধা বেঁকে যায়। গম্ভীর ডাক ছেড়ে ষাড়টা নিজেকে সামলে নেয় এবং একগুঁয়ে ভঙ্গিতে টানতে থাকে। খুররম পর মুহূর্তেই নদীর অপর তীর থেকে আতঙ্কিত চিৎকার শুনতে পায় এবং লোকজনকে দৌড়ে পানির দিকে আসতে দেখে। তাঁরা যেদিকে ইশারা করছে উজানে সেদিকে তাকিয়ে ফেনায়িত পানিতে ভেসে প্রচণ্ড গতিতে তাঁদের দিকে পানিতে উপড়ে আসা বিশাল একটা ডালপালাযুক্ত পাতাবহুল গাছ সে ভেসে আসছে দেখতে পায়। সে দৃশ্যটা ঠিকমত অনুধাবন করার আগেই গাছটা আরজুমান্দের কেরাঞ্চির বাম দিকে একটা রাম ধাক্কা দেয়। কেরাঞ্চির পেছনের চাকার স্পোক টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং পানির ভিতরে শকটা আস্তে আস্তে কাত হয়ে পড়ে, বিশাল গাছটা সামান্য কিছুক্ষণ এর উপরে আটকে থাকে কিন্তু তারপরেই স্রোতের বেগ তাঁর প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে সেটাকে ভাটির দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
খুররম নিজের আতঙ্কিত ঘোড়ার পাঁজরে পাগলের মত গুতো দিয়ে উল্টে পড়া শকটের কাছে গিয়ে দেখে যে উন্মত্তের ন্যায় হাচড়পাঁচড় করতে থাকা ষাড়গুলো পানির নিচে আটকা পড়েছে। ষাড়গুলোর জোয়ালের বাঁধন কেটে দাও, সে চিৎকার করে গাড়োয়ানকে বলে। নিজের ঘোড়া থেকে তারপরে লাফিয়ে নেমে, সে ভাঙা স্পোকের একটা ধরতে সক্ষম হয় এবং কেরাঞ্চির বামপাশের যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে সেটাই সবলে নিজে টেনে তুলে কিন্তু পানির নিচে থেকে যেটা উঠে আসে সেটা কেরাঞ্চির উপরিভাগ। সে খাপ থেকে খঞ্জর বের করে মোটা চামড়ার আচ্ছাদনে একটা আঁকাবাঁকা পোচ দিয়ে ভিতরে উঁকি দেয়। প্রবল বেগে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকা পানি আরজুমান্দের চিবুক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে এবং তাঁর লম্বা চুল তাঁর চারপাশে স্রোতের মত ভাসছে, সে কেরাঞ্চির মূল কাঠামোর একটা কাঠের পোলিন্দ ডান হাত দিয়ে ধরে রয়েছে এবং বাম হাতে পানির উপরে রোসন্নারাকে ধরে রেখেছে। জাহানারা আরেকটা কাঠের পোলিন্দ দু’হাতে আঁকড়ে ধরে ঝুলছে।
খুররম তার পেছন থেকে অনেকগুলো কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে শুনে–তাকে সাহায্য করার জন্য অন্যেরা আসছে। জাহানারা তাঁর কাছেই রয়েছে সে নিজের ডানহাত মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দেয়। কেরাঞ্চি ছেড়ে দিয়ে তুমি বরং আমায় ধর,’ সে আতঙ্কিত মেয়েকে বলে যে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে তারপরে তাকে আঁকড়ে ধরে। সে তাকে তুলে বাইরে বের করে আনে এবং কেরাঞ্চির পাশে ঘোড়া নিয়ে উপস্থিত এক সৈন্যের হাতে তাকে তুলে দেয়। সে এরপর আবার কেরাঞ্চির অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। আরজুমান্দ চেষ্টা করো একটু কাছে আসতে যাতে করে আমি তোমার কাছ থেকে রোসন্নারাকে নিতে পারি। সে আধো আলোয় আরজুমাদের চোখ দেখতে পায় এবং তার কষ্ট করে শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনতে পায় যখন সে হাত পুরোপুরি না ছেড়ে দিয়ে ডান হাতটা কড়ি কাঠের উপর দিয়ে পিছলে নিয়ে এসে রোসন্নারাকে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। খুররম নিচু হয়ে নিজের মেয়ের বাহু ধরতে পারে এবং মেয়েটা যদিও ব্যাথা পেয়ে কেঁদে উঠে সে তাকে কেরাঞ্চির বাইরে টেনে বের করে আনে।
