সে আর তাঁর লোকেরা পাঁচ মিনিটের কম সময়ের ভিতরে তাঁদের শত্রুদের প্রায় সবাইকে হত্যা করে সামান্য কয়েকজন কেবল প্রাণে বেঁচে যায় যারা নদীর তীর বরাবর অবস্থিত ঝোঁপের ভিতরে কোনোমতে পালিয়ে যেতে পেরেছে।
খুররম তাঁর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নিজের লোকদের মূল সৈন্যসারির কাছে ফিরে যাবার নির্দেশ দিতে যাবে এমন সময় সে প্রায় ত্রিশ ফিট দূরে মরা ডালপালার একটা স্তূপের নিচে মানুষের নড়াচড়া লক্ষ্য করে। আক্রমণকারীদের একজন নিশ্চয়ই ঘোড়া হারাবার পরে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। খুররম নিজের রক্তাক্ত তরবারিটা আরো একবার ময়ান থেকে বের করে এবং ঘোড়া থেকে দ্রুত নেমে এসে ডালপালার স্তূপের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে সবকিছু এখন আপাত স্থির হয়ে রয়েছে। সে যখন মাত্র দশ ফিট দূরে তখন সে মন্থর ভঙ্গিতে ডানদিকে বৃত্তাকারে ঘুরতে আরম্ভ করে। উবু হয়ে ডালপালার মাঝে উঁকি দিয়ে সে একজনকে তাঁর দিকে পিঠ দিয়ে গুঁড়ি মেরে শুয়ে থাকতে দেখে, তীর আর তৃণ পাশেই রাখা এবং ডানহাতে একটা খাঁজকাটা শিকারের ছুরি ধরে রয়েছে। খুররমের উপস্থিতি সম্বন্ধে তার মাঝে কোনো ধরনের সন্দেহের উদ্রেক ঘটে না যতক্ষণ না তাঁর তরবারির ইস্পাতের অগ্রভাগ তাঁর পিঠে গিয়ে গুতো দেয়।
‘ওঠে দাঁড়াও এবং বের হয়ে এসো, খুররম ফার্সী ভাষায় আদেশ দেয়। সে শীঘ্রই জানতে পারবে এরা তাঁর আব্বাজানের প্রেরিত সৈন্য নাকি অন্য কেউ। লোকটা যখন কোনো উত্তর দেয় না সে তখন প্রশ্নটা হিন্দিতে করে এবং তরবারি দিয়ে লোকটা মাংসে একটা খোঁচা দিলে বেচারার ইতিমধ্যে নোংরা জোব্বায় রক্তের দাগ ফুটে উঠে। তাঁর শত্রু এতক্ষণে হাউমাউ করে উঠে এবং ডালপালা একপাশে সরিয়ে দিয়ে দ্রুত হাচড়পাড় করে পায়ের উপর ভর দিয়ে ওঠে দাঁড়ায় এবং ঘুরে দাঁড়াবার আগে খঞ্জরটা হাতে ধরে রেখেই পাগলের মত পালাবার পথ খুঁজতে শুরু করে। লোকটা খর্বাকৃতি এবং তারের মত পাকানো শরীরের অধিকারী এবং বাম কানে একটা সোনার মাকড়ি রয়েছে। খঞ্জরটা ফেলে দাও, খুররম চিৎকার করে বলে। লোকটা আদেশ পালন করলে খুররম লাথি দিয়ে সেটাকে দূরে সরিয়ে দেয়। কে তুমি? আমায় আর আমার লোকদের কেন তোমরা আক্রমণ করেছো?
‘কেন করবো না? আমাদের এই জলাভূমির ভিতর দিয়ে এমন আহাম্মকের মত যদি কেউ ভ্রমণ করে আমরা কি করতে পারি।’
খুররম ভাবে, যাক এরা তাহলে কেবল স্থানীয় ডাকাতের দল, যদিও মারাত্মক বিপজ্জনক, পেছনে পথের উপরে পড়ে থাকা নিজের আহত আর মৃত সাথীদের কাদার উপরে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য স্মরণ করে। এই দুর্বিনীত দুবৃত্তকে তার অপরাধের মাশুল দিতে হবে কিন্তু সেটা এখনই নয়। তোমাদের নেতা কে? তোমাদের গ্রামই বা কোথায়?
‘আমাদের একটাও নেই। আমরা প্রত্যেকে স্বাধীন মানুষ। আমরা এই অঞ্চলে বিচরণ করি আর যখন এবং যেখানে আমাদের পছন্দ হয় সেখানে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করি।’
‘তোমাদের কতজন লোক এখানে রয়েছে?
‘আমরা একটা ক্ষুদ্র দল যারা রান্নার জন্য শিকার করতে বের হয়েছিলাম। আপনার দলের সাথে আমাদের ভাগ্যক্রমে দেখা হয়েছে। আমরা আপনাদের বণিকদের একটা কাফেলা ভেবে ভুল করেছিলাম। আমরা যদি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারতাম আপনারা সেখানে কতজন মানুষ রয়েছেন তাহলে আমরা কখনও এত অল্প সংখ্যক লোক নিয়ে আপনাদের আক্রমণ। করার নির্বুদ্ধিতা দেখাতাম না। কিন্তু শীঘ্রই আমাদের আরও ভাইয়েরা আসবে–আমাদের শত শত ভাই, আপনাদের উপর আমাদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে। আপনি বুঝতেও পারবেন না তারা ওঁত পেতে রয়েছে একেবারে শেষ মুহূর্তের আগ পর্যন্ত। তারা আপনাদের শিবিরে হানা দিয়ে আপনার সৈন্যদের হত্যা করবে, আপনার দ্রব্য লুট করবে–এবং আপনাদের মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করবে।
লোকটা কথা বলার মাঝেই হঠাৎ একপাশে লাফ দেয়, বেপরোয়া ভঙ্গিতে কাদায় আধা নিম্মজিত অবস্থায় পড়ে থাকা তার খঞ্জরটার কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। তাঁর আঙুল মাত্র বাট আঁকড়ে ধরতে যাবে যখন খুররম তার তরবারির ফলা সজোরে লোকটার পেটে ঢুকিয়ে দেয়। লোকটা পেছনের দিকে কাদার উপরে উল্টে পড়ে এবং কয়েক মুহূর্ত ধড়ফড় করে, রক্ত তাঁর জর্দার দাগ লাগা দাঁতের মাঝ দিয়ে বুদ্বুদ্ধের মত উঠে আসে, চোখ বিস্ফারিত, তারপরে নিথর হয়ে সেখানেই পড়ে থাকে।
খুররম ঘোড়ায় চেপে পথের দিকে ফিরে আসবার সময় ডাকাত লোকটা যা বলেছে সেসব নিয়ে চিন্তা করে। আসলেই কি এঁদের আরো লোক এখানে রয়েছে–কোনো এক ধরনের লুটেরা বাহিনী–নাকি পুরোটাই লোকটার অসার বাগাড়ম্বর? সে কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে পারে না। তারা আজ রাত নামার আগেই এগিয়ে গিয়ে নদী অতিক্রম করবে। সে কোনো নিরাপদ স্থানে পৌঁছাবার আগে আর কতবার তাকে ডাকাত দলের খেয়ালের শিকার হতে হবে–ভয়ঙ্কর অপরাধীর দল তার আব্বাজান ঠিক তাকে যেমনটা ঘোষণা করেছেন? তার আব্বাজান তাঁর সাথে কি আচরণ করেছেন সে বিষয়ে তিক্ততা এবং তার কতটা পতন হয়েছে এসব ভাবনা ঘোড়ায় চেপে যাবার সময় তার মনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রাখে।
*
দুই ঘন্টা পরে, মৃতদের সমাধিস্থ করার পরে এবং গুপ্তদূতেরা এসে ডাকাতদের আর কোনো উপস্থিতির লক্ষণ না দেখতে পাবার কথা জানালে, সৈন্যসারি নদীর দিকে সংক্ষিপ্ত পথ অতিক্রম করে। বেশ চওড়া নদী–কিন্তু বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও খুব একটা গভীর না, গুপ্তদূতেরা নদীর যে অগভীর অংশ খুঁজে বের করেছে সেটা চার ফিটের বেশি গভীর নয়। অগম্ভীর হলেও, পানিতে বেশ স্রোত রয়েছে এবং মাঝ নদীতে অমসৃণ পাথরের খণ্ড মাথা উঁচু করে রয়েছে। খুররম নিজের ঘোড়ার সামর্থ্য পরীক্ষা করার জন্য দ্রুত বহমান পানির দিকে এগিয়ে যাবার জন্য তাকে তাড়া দেয়। সে স্বস্তির সাথে লক্ষ্য করে জটা পানির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে–তারা যদি সতর্ক থাকে তাহলে তাঁরা নদী অতিক্রম করতে পারবে। প্রথমে একদল সৈন্য পাঠাও অন্য পাড়টা সুরক্ষিত করতে, সে তাঁর দেহরক্ষী বাহিনীর প্রধানকে আদেশ দেয়। আমরা তারপরে কেরাঞ্চিগুলো–গরু টানা মালবাহী গাড়ি-পাঠাতে আরম্ভ করবো।’
