তাঁর লোকেরা নিজেদের বাহনের লাগাম টেনে ধরতে আর নিজ নিজ অস্ত্রের উদ্দেশ্যে হাত বাড়াতে, খুররম নদীর দিকে আবার তাকায় কিন্তু কিছু দেখতে পায় না। আক্রমণকারীরা হয়ত ইতিমধ্যে সরে পড়েছে… কিন্তু ঠিক তখনই বাতাসে শীষ তুলে আরো তীর উড়ে আসে যেন তার এমন ধারণাকে তাচ্ছিল্য করতে। খুররমের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ কর্চির শ্বাসনালীতে এসে একটা তীর বিদ্ধ হয় এবং সে নিজের গলা আঁকড়ে ধরলে তার আঙুলের ফাঁক গলে বন্ধুদ্বের মত রক্ত গড়িয়ে আসে। আরেকটা তীর মালবাহী একটা খচ্চরের গলায় বিদ্ধ হয় এবং জন্তুটা পুরু কাদায় হাঁটু ভেঙে পড়ে যাবার আগে বিকট স্বরে মর্মস্পর্শী ভঙ্গিতে ডাকতে থাকে।
খুররমের প্রথমেই মনে হয় আরজুমান্দ আর বাচ্চাদের কাছে ছুটে যায়। তারা যে গরুর গাড়িতে রয়েছে তার চারপাশের পুরু চামড়ার আবরণ অন্ত তপক্ষে তীরের হাত থেকে তাদের খানিকটা হলেও সুরক্ষা দেবে। একটা শস্যবাহী শকটের পেছনে নিচু হয়ে এবং কাদার ভিতরে খানিকটা দৌড়ে, খানিকটা হামাগুড়ি দিয়ে সে আরজুমান্দ আর তাদের মেয়েরা যে গাড়িতে রয়েছে সে সেটার কাছে পৌঁছে। সে কাছে গিয়ে উঁচু হয়ে ভারি পর্দাটা একপাশে সরিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়। জাহানারা আর রোসন্নারাকে দু’হাতে আগলে রেখে আরজুমান্দ এক কোণে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে রয়েছে, তাঁর খোলা মুখে ইতিমধ্যেই আর্তনাদ দানা বাঁধতে আরম্ভ করেছে যতক্ষণ না সে দেখছে কে উঁকি দিয়েছে।
‘আমরা হামলার মুখে পড়েছি, আমি জানি না কারা বা কেন আক্রমণ করেছে, খুররম জোরে শ্বাস নিতে নিতে অতিকষ্টে বলে। গাড়ির পাটাতনে শুয়ে থাকো, এবং আমি আবার ফিরে আসা পর্যন্ত সেখানেই শুয়ে থাকবে। যাই ঘটুক না কেন বাইরে বের হবে না। আরজুমান্দ মাথা নাড়ে। পর্দা ছেড়ে দিয়ে, খুররম উবু হয়ে দেহের মাঝ বরাবর বেঁকে দৌড়ে আরেকটা গাড়ির কাছে যায় যেখানে তাঁর ছেলেরা আর তাদের আয়ারা রয়েছে। আরজুমান্দকে সে একটু আগে যে নির্দেশ দিয়ে এসেছে সেই একই নির্দেশ শুনে তার ছেলেরা গোল গোল চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে যখন এসব করছে তখনই আরেকটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠের আর্তনাদ শুনে সে বুঝতে পারে আরেকটা তীর লক্ষ্যভেদ করেছে।
কাদায় মাখামাখি অবস্থায়, সে আবারও শস্যবাহী শকটের নিরাপত্তায় ফিরে আসে এবং, দ্রুত স্পন্দিত হৃৎপিণ্ডে, নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে। চটচটে আঠালো কাদায় মুখ নিচের দিকে দিয়ে তার আরও দু’জন লোক হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। আরেকজন–নিকোলাস ব্যালেনটাইন, দ্রুত হাতে কাজ করতে থাকায় ফ্যাকাশে হাত তার নিজের রক্তে লাল হয়ে আছে–নিজের পায়ের গুলে হাতের খঞ্জর দিয়ে সজোরে খোঁচা দিচ্ছে চেষ্টা করছে তীরের অগ্রভাগ কেটে ফেলতে। তাঁর কাছেই আরেকটা খচ্চর একপাশে কাত হয়ে মাটিতে পড়ে রয়েছে, পাগুলো উন্মত্তের ন্যায় মাটিতে আছড়াচ্ছে। সে কিছু ভাববার আগেই আরো তীর তাদের ওপরে উড়ে এসে, একজন সৈন্যের পিঠে আঘাত করে, আরেকটা আরজুমান্দের গাড়ির একটা চাকার কেন্দ্রস্থলে ভোঁতা শব্দ করে গেঁথে যায়। তারপরে, সহসাই তীর নিক্ষেপ বন্ধ হয়। আক্রমণের পুরোটা সময় বৃষ্টির বেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ছোট ছোট জল ভর্তি ডোবা থেকে ছিটকে উঠা পানি সবকিছু ভিজিয়ে দিচ্ছে। তীরন্দাজদের জন্য, তাদের ইতিমধ্যে ভেজা আঙুলের পক্ষে ভেজা ধনুকের ছিলায় তীর সংযোগ করা, এর ফলে কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
কি ঘটছে? ক্লান্ত ভঙ্গিতে সে মাথা তুলে, অঝোর বর্ষণের মাঝে সে নদীর দিক থেকে ধীর গতিতে দুলকি চালের চেয়ে বেশি জোরে নয় অশ্বারোহীর একটা দলকে এগিয়ে আসতে দেখে। বৃষ্টির ইস্পাতের ন্যায় আবরণের কারণে তাঁর পক্ষে ধারণা করা কঠিন হয় ঠিক কতজন লোক রয়েছে দলটায়। তার বাহিনীর শক্তি যাচাই করতে সম্ভবত তাঁদেরও একই ধরনের মুশকিলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। খুররম দাঁতে দাঁত চেপে ভাবে, বেশ, তাঁরা শীঘ্রই সেটা বুঝতে পারবে।
‘ঘোড়ায় ওঠো এবং আমায় অনুসরণ করো, সে তার ঘোড়ার দিকে দৌড়ে যাবার অবসরে দেহরক্ষীদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলে এবং হাচড়পাঁচড় করে ভেজা পর্যাণে পুনরায় আরোহণ করে। তোমরা বাকিরা, পণ্যবাহী শকটগুলো পাহারা দাও আর আহতদের শুশ্রূষা করো।’ খুররম আর তার দেহরক্ষীর দল কয়েক মুহূর্তের ভিতরে তাঁদের অচেনা শত্রুর দিকে ধেয়ে যেতে থাকে, তাদের ঘোড়ার খুরের আঘাতে ছিটকে উঠা পানি আর কাদা তাঁদের চারপাশে উড়তে থাকে। নিচু হয়ে থাকো, সে তার ঘোড়ার গলার কাছে ঝুঁকে এসে চিৎকার করে, তরবারি কোষমুক্ত এবং উষ্ণ বৃষ্টির ফোঁটা তার মুখে গড়িয়ে যায়। নরম কাদায় তার ঘোড়া যদি কোনো কারণে হোঁচট খায় সেজন্য হাঁটু দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে রেখে সে চোখ সরু করে তাঁর আক্রমণের নিশানা খুঁজতে থাকে।
বৃষ্টির ভিতর দিয়ে খুররম আর তার লোকেরা বের হয়ে আসলে, তাঁরা তাঁদের আক্রমণকারীদের দিক থেকে বিস্মিত আর আতঙ্কিত চিৎকার শুনতে পায়। তাঁদের আক্রমণকারীরা সাথে সাথে উন্মত্তের ন্যায় নিজেদের ঘোড়ার লাগাম টানতে শুরু করে, নিজেদের ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাঁদের দিক থেকে পুনরায় নদীর দিকে পালাতে শুরু করে। খুররম নিজের ঘোড়াকে দ্রুত ছোটার জন্য তাড়া দিয়ে সে একটা কাঁটা ঝোঁপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যার গায়ে একটা ময়লা গাগড়ির কাপড় আটকে রয়েছে। সে একটা বাঁক ঘুরে পুরো দলটাকে প্রথমবারের মত ঠিকমত দেখতে পায়: শিরোস্ত্রাণবিহীন ত্রিশ কি চল্লিশজন মানুষ, ধনুক আর তীরের তূণ এখন তাঁদের পিঠে ঝুলছে, হাত আর পা ব্যস্ত কাদার মাঝে যতটা দ্রুত ছোটা যায় নিজেদের ঘোড়াগুলোকে ছোটাবার চেষ্টায়–কিন্তু নিজেদের মোগলদের ভালোজাতের ঘোড়ার কাছ থেকে নিজেদের মাঝে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সেটা যথেষ্ট নয়। খুররম আর তার লোকেরা তাঁদের দিকে ধেয়ে যাবার সময় নির্মম সন্তুষ্টির সাথে সে ভাবে তারা তার শিকার। একটা লোক ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যায় এবং খুররমের দেহরক্ষীদের একজনের ঘোড়ার খুরের নিচে তার খুলি ফাটার শব্দ সে শুনতে পায়। দ্রুত অন্য আরেকজন যার বাদামি রঙের ছোট টাটু ঘোড়াটা প্রাণপণে ছোটার চেষ্টা করছে এগিয়ে গিয়ে খুররম গায়ের জোরে আঘাত করতে লোকটার পিঠে একটা বিকট ক্ষতের সৃষ্টি হয়। সে তার তরবারির এক ঝটকায় দ্বিতীয় আরেকজনকে কবন্ধ করে দেয়–বাদামি রঙের একটা রুক্ষ চোব্বা পরিহিত হাড্ডিসার একটা লোক যার পালাবার সময় গতি শ্লথ করে তাদের পিছু ধাওয়াকারীরা কত দূরে রয়েছে দেখার দুর্মতি হয়েছিল। তাঁর ছিন্ন মাথাটা একটা ডোবায় গিয়ে পড়ে এবং মস্তকহীন দেহটা ধীরে ধীরে পর্যাণ থেকে পিছলে যেতে শুরু করে এবং কয়েক মুহূর্ত পরে সেটাও কাদার মাঝেই উল্টে পড়ে। খুররম নিজের চারপাশে তার লোকদের নিজেদের শান দেয়া ধারালো ইস্পাতের আয়ুধের সাহায্যে আক্রমণকারীদের স্রেফ কচুকাটা করতে দেখে যার বিরুদ্ধে পাল্লা দেয়ার মত প্রতিপক্ষের কাছে কিছুই নেই। চারপাশের মাটিতে কর্দমাক্ত বৃষ্টির পানির ছোট ছোট নহরে উজ্জ্বল, তাজা টকটকে লাল রক্ত এসে মিশছে।
