সে আর তার পরিবার, ইত্যবসরে, নিজেদের জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে সম্ভবত এমনকি তাঁদের যেতে হতে পারে। মেহেরুন্নিসা তাকে ঠিক তার প্রপিতামহ হুমায়ুন এবং তার আগে বাবরের মত ভূমিহীন যাযাবরে পর্যবসিত করেছে। কিন্তু তিনি জয়ী হবেন না। হুমায়ুন আর বাবরের মত একদিন সে ঠিকই রাজত্ব করবে। জাহাঙ্গীর তার যা ইচ্ছা বলতে বা করতে পারেন কিন্তু সে, খুররম, একমাত্র কেবল তাঁর চার ছেলের ভিতরে সম্রাট হবার জন্য উপযুক্ত এবং তার আব্বাজান তার আনুগত্য সত্ত্বেও সেই অধিকার বাতিল করেছেন।
খুররম সহসা পেছন থেকে একটা গুঞ্জন শুনতে পেয়ে ঘুরে তাকায়। মালপত্র বোঝাই একটা মালবাহী শকটের একটা চাকা কাদায় আঁটকে গিয়েছে। তার লোকজন যদি দ্রুত সেটা কাদা থেকে তুলতে না পারে তারা তাহলে সেটাকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে। তাঁর আব্বাজানের পিছু ধাওয়াকারী সেনাবাহিনীর সাথে নিজেদের দূরত্ব বাড়িয়ে তোলাটা এই মুহূর্তে খাদ্য কিংবা অন্য কোনো অনুষঙ্গের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ছোট বাহিনী অন্ততপক্ষে কামানবাহী শকট টেনে নিয়ে অগ্রসরমান বড় বাহিনীর তুলনায় দ্রুত এমন একটা ভূখণ্ডের উপর দিয়ে অগ্রসর হতে পারে যা বর্ষার বৃষ্টির ফলে যা গত দুই মাস ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে হবার কারণে আরও বেশি মাত্রায় বন্ধুর হয়ে উঠে, বিল আর জলাভূমি বিশাল বাহিনীর জন্য প্রায় দুর্গম একটা এলাকা হয়ে উঠেছে। সে পূর্বদিকে এই একটা কারণেই আসবার সিদ্ধান্ত নেয়। মহবত খানের বাহিনী যদি তাকে অনুসরণ করে বাংলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়ও সে নৌকার আশ্রয় নিতে পারবে এবং উপকূলের আরও দক্ষিণে আশ্রয় খুঁজে দেখবে। সে মাত্র দুই সপ্তাহ পূর্বে একটা বিস্ময় উদ্রেককারী একটা চিঠি পেয়েছে–মালিক আম্বারের কাছ থেকে মৈত্রীর প্রস্তাব। যুদ্ধক্ষেত্রে আপনি আর আমি ছিলাম যোগ্য প্রতিপক্ষ,’ আবিসিনিয়ার অধিবাসী সেনাপতি চিঠিতে লিখেছে। আমরা এখন কেন তাহলে সহযোদ্ধা হতে পারবো না?’ খুররম চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি কিন্তু সে আবার প্রস্তাবটা বাতিলও করে নি। মালিক আম্বার আর তাঁর পৃষ্টপোষকেরা, দাক্ষিণাত্যের শাসকবৃন্দ, তাঁদের সমর্থনের জন্য বেশ ভালো রকমের সুবিধা দাবি করবেন বলাই বাহুল্য কিন্তু তাদের সমর্থনের সাহায্যে সে তাঁর আব্বাজানের বিরোধিতা করার শক্তি অর্জন করতে পারবে। কিন্তু নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারে যা ন্যায্যত তাঁর আপাত দৃষ্টিতে সেটা যদিও তাঁর একমাত্র পথ বলে প্রতিয়মান হলেও, সে কি আসলেই মোগল সাম্রাজ্যের বহিশত্রুর সাথে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একত্রিত হতে পারে।
তার লোকেরা যখন মালবাহী শকটটা কাদা থেকে তোলার জন্য সবলে টানছে খুররম অনুভব করে সে হতাশায় রীতিমত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে। সে তাঁর দেহরক্ষীদের এমনকি অনুসরণ করতে না বলেই নিজের ঘোড়ার পাঁজরে গুঁতো দেয় এবং সামনে কাদার কারণে প্যাঁচপেচে ধ্বনির সৃষ্টিকারী ভূখণ্ডের উপর দিয়ে অর্ধবল্পিত বেগে ছুটে যায়। গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টির মাঝে মাত্র আধমাইল যাবার পরেই সে পানির একটা স্রোত দেখতে পায়। মুখের উপর থেকে বৃষ্টির পানি সরিয়ে সে আরও ভালো করে তাকিয়ে দেখে। অবশেষে এটা নিশ্চয়ই মহানন্দা নদী… সে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সুসংবাদটা দেয়ার জন্য ফিরে আসতে যাবে এমন সময় বাতাসের মাঝে দিয়ে একটা তীর উড়ে আসে, অল্পের জন্য তাঁর মাথায় আঘাত করা থেকে তীরটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় কিন্তু তার মনের শান্তির বারোটা বাজিয়ে দেয়। তারপরে আরেকটা–কালো শরযষ্টি আর কালো পালকযুক্ত–তার পর্যাণের থলেতে ভোতা একটা শব্দ করে গেঁথে যায় আবহাওয়ার কারণে যার গিল্টি করা চামড়ায় ছত্রাক জন্মেছে এবং কয়েক ইঞ্চির জন্য তাঁর উরু বেঁচে যায় যখন তৃতীয় আরেকটা তীর তাঁর বাহনের সামনের পায়ের ঠিক সামনেই কাদাতে এসে আছড়ে পড়ে। সে তার ঘোড়ার গলার কাছে নিচু হয়ে এসে জন্তুটাকে ঘুরিয়ে নেয়ার জন্য লাগাম শক্ত করে টেনে ধরে, প্রাণীটাকে সৈন্যসারির দিকে বল্পিতবেগে ফিরিয়ে নিয়ে চলে, পুরোটা সময় ভয়ে প্রতিটা স্নায়ু টানটান হয়ে থাকে যে আরেকটা তীর পেছন থেকে তাকে আঘাত করবে এবং তাঁর স্বপ্নের অকাল সমাপ্তি ঘটাবে। সে ঘোড়া দাবড়ে ফিরে আসার সময় পুরোটা পথ নিজেকে নিজের আহাম্মকির জন্য অভিশাপ দিতে থাকে। তার উচিত ছিল গুপ্তদূতদের আগে পাঠান।
আক্রমণকারী সে হতে পারে? তার আব্বাজানের কোনো হুকুমবরদার, তাকে বন্দি করার জন্য ঘোষিত পুরষ্কার দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে হালকা অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দ্রুত ঘোড়া হাকিয়ে এসে তাদের দলটাকে পেছন থেকে ধরে ফেলেছে। মহবত খান আর তার বাহিনীও হতে পারে, বিচিত্র নয়? যদি তাই হয়ে থাকে, সে চড়া মূল্যে তার বিসর্জন দেবে। প্রায় এক যুগ পরে যেন মনে হয় আসলে এক মিনিটেরও কম সময় অতিক্রান্ত হয়েছে সে তার সৈন্যসারির দিকে এগিয়ে যায়। সে শুনতে পাবার মত দূরত্বে পৌঁছানো মাত্র চিৎকার করে উঠে, ‘সামনে তীরন্দাজ রয়েছে। আমরা হামলার সম্মুখীন হয়েছি। সৈন্যবহরের অগ্রযাত্রা বন্ধ রাখো। বৃষ্টির মাঝে আমাদের গাদাবন্দুক কোনো কাজে আসবে না। নিজেদের তীর আর ধনুক প্রস্তুত রাখো।’ নিজের লোকদের মাঝে পৌঁছে, সে তীর নিক্ষিপ্ত হবার দিক আর নিজের মাঝে ঘোড়াটা রেখে পর্যাণের উপর থেকে সে নিজেকে নামিয়ে আনে।
