জাহাঙ্গীর দম নেয়ার জন্য থামে। দরবারে পাথরের মত ভারি নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। তার চোখ গিয়াস বেগের উপরে পড়ে, যার মাথা নত করা রয়েছে। তিনি এই মাত্র যা বলতে যাচ্ছেন মেহেরুন্নিসার বাবা সেটা মোটেই পছন্দ করবে না কিন্তু তাঁর নিজের এবং সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার বিষয়টা অবশ্যই প্রথমে বিবেচ্য হওয়া উচিত। জাহাঙ্গীর মুহূর্তটার গুরুত্ব বোঝাবার জন্য উচ্চস্বরে এবং দৃঢ়তার সাথে আদেশ করে, ‘রাজকীয় খতিয়ান যেখানে আমি বা-দৌলত, খুররম নামের বদমাশটার নামটা, তার জন্মের অশুভ-তিথিতে উত্তীর্ণ করেছিলাম আমার কাছে নিয়ে এসো।
একজন পরিচারক যার হাতে সবুজ চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা একটা বিশাল খণ্ড রয়েছে সামনে এগিয়ে আসে এবং সেটা বেদীর উপরে ইতিমধ্যে আরেকজন পরিচারকের রাখা তুতকাঠের রেহেলের উপরে স্থাপন করে। জাহাঙ্গীর খতিয়ানের খণ্ডটা খুলে এবং ধীরে ধীরে পাতা উল্টাতে থাকে যতক্ষণ না সে যা খুঁজছিল সেটা খুঁজে পায়। তারপরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচারকের হাত থেকে লেখনী নিয়ে সেটা সে কালো অনিক্সের দোয়াতদানিতে চোবায় এবং একটা নিশ্চায়ক আচড়ে পাতার উপরে একটা দাগ টেনে দেয়। আপনাদের সবার সামনে আমি ঘোষণা করছি যে আমি বা-দৌলত, খুররমকে ত্যাজ্য করছি। আপনারা এইমাত্র আমাকে তাঁর নামটা আমার সন্তানদের নামের তালিকা থেকে কেটে বাদ দিতে দেখেছেন তেমনি আমার হৃদয় থেকেও আমি চিরতরে তাকে মুছে ফেলছি। আজকের এই দিন থেকে আগামীতে খুররম আর আমার সন্তান নয়।
জাহাঙ্গীর যখন কথা বলছিল, সে তখনই তাঁর কানে অমাত্যদের মাঝ থেকে বিস্মিত গুঞ্জণ ধ্বনি ভেসে আসতে শুনে। আসফ খান আর গিয়াস বেগ কয়েক ফিট দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদের মুখাবয়বে আতঙ্ক ফুটে উঠে আর তার উজির মাজিদ খান, চোখ বন্ধ অবস্থায়, তসবি জপছিলেন আর সামনে পিছনে দুলছিলেন। কিন্তু সে এখনও তাঁর বক্তব্য শেষ করে নি।
‘আমার সাম্রাজ্যে আমি কোনোভাবেই বিদ্রোহ বরদাশত করবো না–সে চেষ্টা যেই করুক। আমি আজ সকালেই খুররমকে কলঙ্কিত অপরাধী ঘোষণা করে একটা ফরমানে স্বাক্ষর আর সীলমোহর করেছি এবং তাঁর মাথার জন্য একটা পুরষ্কার ধার্য করেছি–পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা যে তাকে বন্দি করতে সক্ষম হবে। আমি, তাছাড়ও আমার বিশ্বস্ত সেনাপতি মহবত খানের নেতৃত্বে তাঁর বিরুদ্ধে একটা মোগল বাহিনী প্রেরণ করছি। আগামী এক সপ্তাহের ভিতরে তাঁরা যাত্রা শুরু করবে।
জাহাঙ্গীর ঘুরে দাঁড়ায় এবং তাকে আবারও যন্ত্রণা দিতে থাকা পিতা জীবনের, সম্রাটের জীবনের রূঢ় বাস্তবতার তীব্রতা অসাড় করতে মেহেরুন্নিসার আফিম মিশ্রিত সুরার জন্য ব্যাকুল হয়ে দ্রুত দরবার থেকে হেঁটে বের হয়ে যায়।
২.০২ কলঙ্কিত যুবরাজ
উষ্ণ পৃথিবীর বুকে বৃষ্টি পড়ার সোঁদা ঘ্রাণ-বর্ষার অভ্রান্ত গন্ধ–প্রতিমুহূর্তে মনে হয় তীব্র হচ্ছে তারা যতই বাংলার পূতিগন্ধময় ভূমির উপর দিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে চলেছে, খুররম তার সৈন্যসারির সামনে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যাবার সময়, কাঁধের উপর দিয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে তার বাহিনীকে সেখানে কষ্ট করতে দেখে, মনে মনে ভাবে। গত কয়েক মাসে তাঁর বাহিনীর লোক সংখ্যা কমে পাঁচশ কি ছয়শ হয়েছে। মহবত খান আগ্রা থেকে বিশাল এবং সুসজ্জিত একটা বাহিনী–কারো কারো সংবাদ অনুযায়ী বিশ হাজার সৈন্য আর তিনশ রণহস্তী–নিয়ে তাকে পশ্চাদ্ধাবন করে বন্দি করার জন্য রওয়ানা হয়েছেন এই সংবাদটা তার বাহিনীর অনেক সৈন্যকে পক্ষত্যাগ করতে প্ররোচিত করেছে।
মহতাব খানের সাথে খুররমের একবারই দরবারে দেখা হয়েছিল কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সে তাঁর সাহসিকতার কথা শুনেছে। লোকটা একজন পার্সী যে শাহের অনুগ্রহ বঞ্চিত যতক্ষণ না হয়েছিল, গিয়াস বেগের মত, সে তার অধীনে কর্মরত ছিল এবং পরে মোগল দরবারে চলে এসেছে। লোকটা সব বিচারেই ঝুঁকি গ্রহণ করতে ভালোবাসে, আবেগপ্রবণ মাঝে মাঝে যা হঠকারিতার পর্যায়ে পড়ে, কিন্তু সবসময়ে সাফল্য লাভ করেছে–অন্তত এখন পর্যন্ত তাই বাস্তবতা। তাঁর দুই হাজার রাজপুত যোদ্ধার চৌকষ অভিজাত বাহিনী বলা হয়ে থাকে তার প্রতি নিবেদিত প্রাণ। একজন বহিরাগত এবং মুসলমান হিসাবে তিনি যদি জাফরান রঙের পোষাক পরিহিত এসব অকুতোভয় হিন্দু যোদ্ধাদের মুগ্ধ করতে পারেন যাঁরা নিজেদের সূর্য আর চন্দ্রের সন্তান বলে বিশ্বাস করে, তাহলে বাস্তবিকই তিনি একজন প্রেরণা সঞ্চারী নেতা। খুররম ভাবে, অবাক হবার কিছু নেই, যে তার নিজের লোকদের অনেকেই মানে মানে সটকে পড়েছে। কিন্তু সত্যিকারের সমর্থকদের একটা ক্ষুদে বাহিনী লড়াইয়ে অনিচ্ছুক একটা বিশাল বাহিনীর চেয়ে অনেক ভালো।
সে গলার পাশে একটা কীট দংশন অনুভব করতে, সে হাত দিয়ে সেটাকে আঘাত করে এবং নিজের আঙুলের দিকে তাকিয়ে দেখে সেখানে রক্ত লেগে রয়েছে। সে কখনও এমন ক্লান্ত বা এতটা হতাশ বোধ করে নি। তার আব্বাজান তাকে কলঙ্কিত অপরাধী হিসাবে ঘোষণা করে সাম্রাজ্যের প্রতিটা লোককে তাঁর প্রতিপক্ষে পরিণত করেছেন। তার মাঝে অসহায়তার সাথে মিশে থাকা ক্রোধের একটা অনুভূতি বাড়তে থাকে। তাঁর আব্বাজান কীভাবে তাকে, নিজের পক্ষে সাফাই দেয়ার কোনো সুযোগ না দিয়ে, এতটা নিষ্ঠুরভাবে, এতটা প্রকাশ্যে অবমানিত আর ত্যাজ্য করেন? আব্বাজানকে নিয়ে, তার সাফল্য সে একটা সময় গর্ব অনুভব করতে সেসব আর মাঙ্গলিক জন্ম কীভাবে এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ তিক্ততায় রূপান্ত রিত হলো? তার আব্বাজান যাই বিশ্বাস করতে চান না কেন, তিনি মেহেরুন্নিসার ক্রীড়ানক বই আর কিছু নন। সে জাহাঙ্গীরকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আফিম আর সুরার জন্য তার দুর্বলতাকে শান্ত রেখে, সে তার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। আর তিনি যা কিছু চান সবই ঘটে চলেছে। আসফ খানের কাছ থেকে প্রাপ্ত একটা চিঠি অনুযায়ী, আসিরগড় থেকে যার বার্তাবাহক খুররমের পশ্চাদপসারনকারী বাহিনীকে অনুসরণ করেছিল, দুই মাস পূর্বে, জাহাঙ্গীর শাহরিয়ারকে ডেকে এনে তাঁর মস্তকে রাজকীয় উষ্ণীষ স্থাপন করে তাকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা করেছে। আর এখানেই বিষয়টা শেষ হয় নি। শাহরিয়ারের সাথে মেহেরুন্নিসার মেয়ে লাডলীর বিয়ের দিন দরবারের জ্যোতিষীরা নির্ধারণ করেছে এবং নববর্ষের উৎসব উদ্যাপনের মাঝে যা অনুষ্ঠিত হবে।
