*
অন্ধকারে খোলা জানালার পাশে জাহাঙ্গীর বসে আছে, মেহেরুন্নিসার আফিম মিশ্রিত সুরার একটা পাত্র তাঁর পাশে রাখা। তিনি পাত্রে চুমুক দিতে থাকলে তার মাথার যন্ত্রণাটা প্রশমিত হতে থাকে, কিন্তু এখনও নিজের ভাবনাগুলোকে ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করতে তার বেশ বেগ পেতে হয়। তার মানসপটে মনোযোগ বিঘ্নিতকারী সব অবয়ব ভেসে উঠেই মিলিয়ে যাবার সময় তারা সবকিছু এলোমেলো বিকৃত করে দিয়ে যায়–তিনি নিজেকে বালক হিসাবে তার আব্বাজান আকবরের দিকে তাকিয়ে থাকতে এবং ভাবতে দেখেন কখনও কি তিনি তার অনুমোদন লাভ করবেন, গ্রীষ্মের গুমোট রাতের অন্ধকারে সুফি সাধক, সেলিম চিশতির বাড়ির দিকে দৌড়ে চলেছেন নিজের ভয় আর আকবরের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহের অনিশ্চয়তার কথা বৃদ্ধ লোকটিকে বলতে। জাহাঙ্গীরের জন্য না তাঁর সন্তানদের প্রতি ছিল আকবরের সব মমতাবোধ, এবং খসরুর ক্ষেত্রে সেটা কি পরিণতি নিয়ে এসেছিল? নিজের বড় ছেলের শূলবিদ্ধ সমর্থকদের আর্তনাদ, তাঁর মাথায় প্রতিধ্বনিত হয়, এবং খসরু তাঁর দিকে দৃষ্টিহীন চোখে তাকিয়ে থাকে।
জাহাঙ্গীর এইসব অশরীরি অবয়বদের উপস্থিতির কারণে আতঙ্কিত হয়ে জোর করে নিজেকে পুরোপুরি জাগিয়ে তোলে এবং ধাতব পানপাত্রটা কক্ষের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দিলে গালিচায় সুরার তলানি ছিটকে পড়ে। পরিষ্কার মন নিয়ে তাঁর চিন্তা করা দরকার। ভোলা বাতায়নের ভিতর দিয়ে বয়ে আসা শীতল বাতাস ধীরে ধীরে আফিম আর সুরার মাদকতাময় ধোয়া সরিয়ে দিচ্ছে বলে মনে হতে থাকে। আকবর যদি তার জন্য একজন ভালো পিতা হতেন এবং তিনি যদি তার সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতেন, খসরুর বিদ্রোহ আর খুররমের দ্রোহ হয়ত ঘটতো না। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন আকবরের ব্যর্থতাগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন তার মাঝে না ঘটে। যা ঘটেছে সেটা সম্ভবত অনিবার্য ছিল–এশিয়ার তৃণাঞ্চল থেকে সম্ভবত উত্তরাধিকার সূত্রে নিয়ে মোগলরা এটা নিয়ে এসেছিল যার কারণে এটা হয়েছে। সিংহাসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তাঁদের রক্তে রয়েছে, ঠিক যেমন তরুন হরিণ পালের গোদার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের শক্তি পরীক্ষা করে। সন্তানদের কঠোর শিক্ষা দেয়া জন্মদাতা পিতাদের জন্য প্রকৃতির নির্ধারিত পাঠক্রম।
জাহাঙ্গীর তারকাখচিত আকাশে বুকে মগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাঁর দাদাজান হুমায়ুন বিশ্বাস করতেন যে পুরো জীবনের রহস্যময়তার উত্তর তারকারাজি ধারণ করে রয়েছে। জাহাঙ্গীর ঠোঁট ওল্টায়। তাঁরা হুমায়ুনের সমস্যাবলী নিশ্চিতভাবেই সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিল–সমস্যাগুলোর জন্ম হয়েছিল ক্ষমাশীল হওয়ায় যখন তাঁর কঠোর হওয়া উচিত ছিল, ইতস্তত করায় যখন তার উচিত ছিল নিশ্চায়ক হওয়া। তিনি সে কারণেই নিজের সাম্রাজ্য হারিয়েছিলেন।
তার ক্ষেত্রে এমন কখনও হবে না। তিনি সিংহাসনের জন্য অনেক দিন অপেক্ষা করেছেন… মেহেরুন্নিসা বরাবরের মত এবারও ঠিকই বলেছে। কোনো ধরনের বিলম্ব, দ্বিধাবোধ তার ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতীয়মান হতে পারে। তাকে অবশ্যই আবেগমুক্ত হয়ে খুররমের মোকাবেলা করতে হবে।
*
পরেরদিন সন্ধ্যা নামার সময়, জাহাঙ্গীর দেওয়ানি-আমের মার্বেলের বেদীর নিচে সমবেত হওয়া তার পুরো দরবারের সামনে উঠে দাঁড়ায় সামনে সারিবদ্ধ অভিজাতদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতে। তিনি এখন যখন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন তিনি অনুভব করেন নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, ঠিক যেমন তাঁর রাজ্যাভিষেকের সময় যখন ঝরোকা বারান্দায় তাঁর প্রজাদের সামনে তাঁর প্রথমবার দর্শনের সময় হয়েছিল। বেদীর কাছে যারা দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের ভিতরে রয়েছে আসফ খান, গিয়াস বেগ আর তার উজির মাজিদ খান। তিনি কাউকে, এমনকি মেহেরুন্নিসাকেও বলেননি, তিনি কি বলবেন, কিন্তু কারো মনে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটা কিছু আজ ঘোষণা করবেন।
তিনি দরবারের বেলেপাথরের তৈরি একশ স্তম্ভ রেশমের কালো কাপড় দিয়ে মুড়ে দেয়ার আদেশ দিয়েছেন। বাইরের আঙিনার সবগুলো ফোয়ারা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং উজ্জ্বল রঙের ফুলের কেয়ারি আরো রেশমের কালো কাপড় বিছিয়ে দিয়ে, রঙিন সবকিছুর উপর আড়াল করা হয়েছে। তিনি নিজেও কালো রঙের একটা সাদাসিদে আলখাল্লা পরিধান করেছেন, মাথায় একই রঙের পাগড়ি আর আজ তিনি কোনো অলঙ্কার ধারণ করেন নি। তাঁর অমাত্যরা অস্বস্তির সাথে চারপাশে তাকায়। জাহাঙ্গীর অপেক্ষা করে, উত্তেজনার পারদ আরেকটু বৃদ্ধি পেতে দেয়, এবং তারপর সে তার বক্তব্য শুরু করে।
‘আপনারা সবাই জানে যে গতকাল মানডুর রাজ্যপাল আমায় জানিয়েছে যে আমার সন্তান যুবরাজ খুররম বিদ্রোহ সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। সে আমার রাজ্যপালদের অনেকের কাছেই বার্তা পাঠিয়ে আমার বিরুদ্ধে তাঁর সাথে তাদের মৈত্রী করতে অনুরোধ করেছে। এটাই তার একমাত্র অপরাধ নয়। সে দাক্ষিণাত্যে তাঁর সামরিক নেতৃত্ব পরিত্যাগ করে আমার অনুমতি ছাড়াই আগ্রা এসেছিল। আমি তাকে যখন গ্রেফতার করার আদেশ দেই সে রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। আমি এমনকি তখনও আশা করেছিলাম সে নিজের ভুল দেখতে পাবে এবং কর্তব্যের পথে ফিরে আসবে। আমি আমার পিতৃসুলভ মমতায় ধৈর্য ধারণ করেছি, তাকে তার তারুণ্যের অহঙ্কারের জন্য অনুতপ্ত হবার সময় দিয়েছি। আমি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বাহিনী প্রেরণ করা থেকে বিরত থেকেছি। কিন্তু উচ্চাকাঙ্খা তাকে পুরোপুরি অসৎ করে ফেলেছে। সে নমনীয় হবার বদলে আরো বেশি স্পর্ধিত হয়ে উঠেছে। আমি এখন আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।’
