‘সে হয়তো বিরোধ নিষ্পত্তি করতেই চায় না।’
‘জাহাপনা, আপনি সেই প্রয়াস নেয়ার আগে সেটা নিশ্চিত জানেন না, নিজ সন্তানের সাথে যুদ্ধ এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করার কারণে প্রজারাও আপনার প্রশংসা করবে, গিয়াস বেগ দৃঢ়তার সাথে বলে।
জাহাঙ্গীর তাঁর পানপাত্রের গাঢ় তলানি পর্যবেক্ষণ করে। গিয়াস বেগের কথাগুলো তাঁর মনের একটা গোপন তন্ত্রীতে আঘাত করেছে। আকবর তাঁর সাথে যেমন আচরণ করেছিলেন তিনিও কি খুররমের সাথে ঠিক তেমনিই অন্যায় করেছেন? সেদিন রাতে প্রাকারবেষ্টিত দূর্গের ছাদে তিনি যদি আরো কিছুক্ষণ খুররমের বক্তব্য শ্রবণ করতেন তাহলে এমন কি ক্ষতি বৃদ্ধি হতো? তারা হয়তো একটা চলনসই বোঝাপড়ায় উপনীত হতে পারতো?
কিন্তু এমন সময় মেহেরুন্নিসা পুনরায় মন্তব্য করে। আব্বাজান, একটা আদর্শ পৃথিবীতে আপনি এইমাত্র যা পরামর্শ দিলেন তা হয়তো অর্থবহন করে। কিন্তু আমাদের পৃথিবী মোটেই নিখুঁত নয়। আমাদের সীমান্তের ভিতরে আর বাইরে শত্রুভাবাপন্ন লোকদের বাস সবাই সম্রাটকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আপন আপন প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে আগ্রহী। এমনকি খুররমও এখন হয়ত সৈন্য সংগ্রহ করছে, আমাদের শত্রুর মাঝে মিত্রের সন্ধানে প্রকাশ্যে প্রস্তাব রাখছে।
‘তোমার কাছে কি এসবের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ রয়েছে?
‘গুজব ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রতিটা দিন যা আমাদের নিশ্চায়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যতিরেকে কেটে যাচ্ছে সম্রাটকে দুর্বল আর খুররমকে শক্তিশালী করছে এবং সে এটা জানতে পারবে। জাহাঙ্গীরের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে সে তার মুখটা দু’হাতের তালুতে ধরে। আমার কথা শোনেন। আমি কি আপনাকে সবসময়ে ভালো পরামর্শ দেইনি? আমি জানি, আপনার জন্য এটা কঠিন কিন্তু খুররমকে ধ্বংস করার জন্য আপনাকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে। তাকে যখন বন্দি হিসাবে আপনার সামনে হাজির করা হবে তখন কথা বলার অনেক সময় পাওয়া যাবে। আপনি একজন পিতা বটে কিন্তু তার আগে প্রথমে আপনি একজন সম্রাট। নিজের সাম্রাজ্যকে রক্ষা করা কি আপনার মহান দায়িত্ব নয়? সে এক মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে তারপরে সে তাকে ছেড়ে দেয় এবং উঠে দাঁড়ায়। গিয়াস বেগ আবার নিজের মাথা নাড়তে শুরু করেছে। জাঁহাপনা, আমার কন্যার কথাগুলো অবিবেচনাপ্রসূত। আপনি অবশ্যই হঠকারী হয়ে কিছু করবেন না। কয়েকটা দিন অন্তত বিবেচনা করে দেখেন…’
‘আপনি জানেন আপনি এসব কথা বলছেন কারণ আপনি আমার আর আমার কন্যার চেয়ে আমার ভাই আর তার কন্যাকে বেশি পছন্দ করেন, মেহেরুন্নিসা চিৎকার করে উঠে, গলার স্বর কাঁপছে। আর আপনি, ভাইজান।’ সে চরকির মত আসফ খানের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। নিজেকে প্রশ্ন করে দেখেন আপনার সত্যিকারের আনুগত্য কোথায় নিহিত… আপনার সম্রাটের নাকি আপনার কন্যা?
আসফ খান এক কদম পেছনে সরে যায় এবং উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে জাহাঙ্গীরের দিকে আড়চোখে তাকায়, কিন্তু গিয়াস বেগ মোটেই ভীত নয়। ‘মেহেরুন্নিসা, তুমি এমন অভিযোগ করো তোমার এত বড় স্পর্ধা! আমরা একইভাবে তোমায় অভিযুক্ত করতে পারি খুররম আর আরজুমান্দের চেয়ে শাহরিয়ার আর তোমার কন্যার স্বার্থরক্ষায় তুমি ব্যক্তিগত কারণে সহায়তা করছো।’
‘আপনার বয়স হচ্ছে। আপনার স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছে নতুবা আপনি এমন কথা বলতে পারতেন না… সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, কেবলমাত্র পারিবারিক স্বার্থ নিয়ে না।
‘তুমি উদ্ধত। তুমি আমাকে সম্মান প্রদর্শন করার তোমার কর্তব্য সম্বন্ধে ভুলে গিয়েছ।
কর্তব্য? আপনি কর্তব্যের কথা বলছেন? একটা গাছের নিচে সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশু অবস্থায় আমাকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দিয়ে পরিত্যাগ করার সময় আপনার কর্তব্যবোধ কোথায় ছিল? আপনি সেই সময় আমায় কতটুকু সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন?
‘মৃত্যু তখন আমাদের খুব কাছে ছিল। আমার সামনে আর কোনো উপায় ছিল না, তুমি সেটা খুব ভালো করেই জানো। আর ভাগ্য যখন প্রসন্ন হয়েছিল, আমি ফিরে এসেছিলাম তোমায় খুঁজতে…’।
‘আর আপনি এখন আরো একবার আমায় পরিত্যাগ করছেন।
‘এসব অনেক হয়েছে! জাহাঙ্গীরের মাথায় এখনও যন্ত্রণা হচ্ছে। মেহেরুন্নিসার উপরে সে এক মুহূর্তের জন্য হলেও অসহিষ্ণু হয়ে উঠে, যার সচরাচর মায়াবী চোখ ক্রোধে জ্বলজ্বল করছে এবং যার নিচের ঠোঁট বিশ্রী ভঙ্গিতে বাইরের দিকে ওল্টানো রয়েছে। আমি এই বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য শুনতে চেয়েছিলাম কারণ এর সাথে আমাদের উভয়ের পরিবার জড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত কেবল আমি একাই গ্রহণ করবো।’
‘অবশ্যই।’ মেহেরুন্নিসা অনেক সংযত কণ্ঠে উত্তর দেয়। আমি দুঃখিত, আমি রেগে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমি আপনার জন্যই ক্রুদ্ধ হয়েছিলাম, কারণ আমি আপনাকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে চাই… আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষের জন্য যা সবসময়ে করে থাকি।
জাহাঙ্গীর পালাক্রমে তাদের তিনজনের দিকে তাকায়–বাবা, ভাই আর বোন। সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ কেবল তাঁরই পরিবারকে বিভক্ত করে নি। ‘আপনারা যা বলেছেন আমি সে বিষয়ে ভেবে দেখবো, কিন্তু আমি এখন আমার একান্ত কক্ষে ফিরে যাব।’ সে মেহেরুন্নিসাকে তাঁর দিকে সামান্য এগিয়ে আসতে লক্ষ্য করে, কিন্তু তিনি তাকে উপেক্ষা করেন। আজ রাতে একাকী তাঁর চিন্তা করা প্রয়োজন।
