তিনি যখন ভেতর প্রবেশ করছেন মেহেরুন্নিসার কক্ষে তখন মাত্র সন্ধ্যের মোমবাতি প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে। তার প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা করছে। মেহেরুন্নিসা সাথে সাথে তার দিকে এগিয়ে এসে, তাঁর কাঁধে হাত রাখে এবং কোনো কথা না বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার জন্য পানপাত্রে সুরা ঢালার পূর্বে আলতো করে তাকে জড়িয়ে ধরে তার ওষ্ঠে মৃদু চুম্বন করে। তিনি পানপাত্রে লম্বা একটা চুমুক দেন। তিনি যখন মনে মনে ভাবেন, সুরার তৃপ্তি এবং এর প্রশমিতকারী উষ্ণতা তার প্রয়োজন, তখন কক্ষের দরজা পুনরায় খুলে যায় গিয়াস বেগের দীর্ঘদেহী বয়োজ্যষ্ঠ অবয়ব আর পেছনে রয়েছে তাঁর সন্তান আসফ খানের গোলগাল কাঠামো।
‘বেশ, আপনারা সবাই আলী খানের বক্তব্য শুনেছেন। কি মনে হয়েছে। শুনে? তিনি সরাসরি জিজ্ঞেস করেন।
‘জাহাপনা, কি বলবো আমি বুঝতে পারছি না। গিয়াস বেগ তাঁর রূপালী চুল ভর্তি মাথা নাড়ে। আমি কখনও ভাবতে পারিনি এমন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে।’
‘এটাই কেবল সবচেয়ে বেশি সম্ভব। আমি ঠিক যেমন সন্দেহ করেছিলাম। খুররম সিংহাসন দখল করতে আগ্রহী। তাকে বহুদিন আগেই গ্রেফতার করার পরামর্শ দিয়ে আমি ভুল করিনি। প্রহরীরা সেদিন যদি একটু দ্রুত কাজ সমাধা করতো…’ মেহেরুন্নিসা বলে।
কিন্তু, জাঁহাপনা, এক মুহূর্ত ভেবে দেখেন–আলী খান কেবল এটুকুই বলেছে যে যুবরাজ খুররম সমর্থক সংগ্রহ করতে চেষ্টা করছেন। তার মানে এই নয় যে তিনি আপনার বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী, গিয়াস বেগ প্রতিবাদ করেন।
‘কিন্তু এমন একটা পদক্ষেপ কেন গ্রহণ করবে?’ মেহেরুন্নিসা জানতে চায়। কারণ, বাছা, সে নিজেকে অরক্ষিত মনে করছেন। জাহাপনা, আমার অকপট বাচনভঙ্গি মার্জনা করবেন, কিন্তু আপনি যুবরাজকে কখনও বলেননি কীভাবে সে আপনাকে ক্রুদ্ধ করেছে। তিনি এ কারণেই আপনাকে ক্রুদ্ধ করার ঝুঁকি নিয়ে হলেও আগ্রা এসেছিলেন আপনার সাথে কথা বলার চেষ্টা করতে… মাজিদ খান সেই রাতে যুবরাজের সাথে তাঁর কথোপকথনের বিষয়ে বলেছে। আর আমি যদি নিষ্কপট আমি এবং দরবারের আরো অনেকেই বুঝতে পারেনি কেন আপনি তার বিরুদ্ধে খেপে গিয়েছেন। আপনার আদেশ অনুযায়ী যুবরাজ খুররম সবকিছু করেছে… আনুগত্য আর সাহসিকতার সাথে আপনার বাহিনীকে বিজয়ী করেছে। অতি সম্প্রতিও তিনি ছিলেন আপনার সবচেয়ে গর্বের…সবাই আশা করেছিল আপনি তাঁর নাম আপনার উত্তরাধিকারী হিসাবে
‘ঠিক তাই। যেহেতু সম্রাট তার মমতার বিষয়ে এত ভোলামেলা, এত উদার, তিনি এহেন প্রত্যাশা জাগ্রত করেছেন, কিন্তু যুবরাজের মাঝে এসব প্রত্যাশা অন্য কিছুতে পরিণত হয়েছিল–একটা লোভী, অধৈর্য উচ্চাকাঙ্খা…’ মেহেরুন্নিসা বাধা দিয়ে বলে।
যুবকেরা সবসময়ে উচ্চাকাঙ্খী। কিন্তু তিনি যে কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করতে আগ্রহী চেয়েছিলেন তার কি প্রমাণ তোমার কাছে আছে?
‘সে দাক্ষিণাত্যে নিজের নেতৃত্ব পরিত্যাগ করে এখানে, আগ্রায় এসেছে।
কিন্তু তার কারণ এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যা তিনি বুঝতে অপারগ হয়েছিলেন। যার একটা হল যুবরাজ শাহরিয়ারকে জায়গির প্রদানের বিষয় খুররমের বিশ্বাস সেটা তাকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল… এবং ন্যায়সঙ্গতও, বটে।’
‘এসব জায়গির প্রদান সম্রাটের বিশেষ অধিকার। আপনার অবস্থান থেকে মহামান্য সম্রাটের সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে প্রশ্ন করা যায় না।’
‘এবং আপনিও পারেন না আমাকে মত প্রকাশে বাধা দিতে। আপনি সম্রাজ্ঞী হতে পারেন কিন্তু এখনও আমি আপনার জন্মদাতা পিতা। বৃদ্ধ লোকটা এক মুহূর্ত সময় নিয়ে নিজের ভাবনার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে পুনরায় বক্তব্য শুরু করে, জাঁহাপনা, আপনার মরহুম আব্বাজান আমাকে আর আমার পরিবারকে চরম দুর্গতি আর দারিদ্রের হাত থেকে উদ্ধার করার পর থেকে আমি চেষ্টা করে এসেছি আপনার রাজবংশের সর্বোচ্চ সেবা করতে। আমি আপনাকে সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ করার সময় আমার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সেটা বলি। আপনি পরবর্তীতে আক্ষেপ করতে পারেন ঝোঁকের মাথায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
কক্ষের অভ্যন্তরে নিরবতা বিরাজ করে। মেহেরুন্নিসা মুখ ঘুরিয়ে থাকে। জাহাঙ্গীর তার বসার ভঙ্গি, তার মাথার নতি দেখে বুঝতে পারে সে কতটা ক্রুদ্ধ হয়েছে। জাহাঙ্গীর আগে কখনও তাকে তার আব্বাজানের সাথে তর্ক করতে কিংবা গিয়াস বেগকে, সচরাচর ভীষণ ধীরস্থির আর বিচক্ষণ, এতটা আবেগ নিয়ে কথা বলতে শোনেনি। আসফ খানের দৃষ্টি বাপ বেটির উপরে ঘুরতে থাকে, একটা গভীর ভ্রুকুটি তার চেহারায়।
‘আসফ খান, আপনি ভীষণ নিরব আর গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আপনার কি কিছুই বলার নেই?’ জাহাঙ্গীর জানতে চায়। খুররম যদি নিজেকে ধ্বংস করে দেয় তাহলে সে আপনার মেয়েকেও সেইসাথে ধ্বংস করবে।’
‘জাহাপনা, আমার ধারণা আব্বাজান ঠিকই বলেছেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে আরো বিশদভাবে না জানা পর্যন্ত আপনার কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হবে না। খুররম হৃদয় আর মনে আসলেই কি মনোভাব পোষণ করে আপনার সেটা খুঁজে দেখা উচিত। তাঁর কাছে একজন প্রতিনিধি প্রেরণ করেন–আপনি যদি অনুমতি দেন আমি খুশি মনে যেতে পারি।’
‘হ্যাঁ, গিয়াস বেগ সমর্থন জানায়। আপনি তাকে বিরোধ নিষ্পত্তির অন্তত একটা সুযোগ দিতে পারেন সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূরে সরে যাবার আগেই যখন বিরোধ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
