‘তাকে তাহলে এই মুহূর্তে আমার একান্ত কক্ষে নিয়ে এসো।’ এই লোকটা কি চায়? হেকিম যখন তার চিকিৎসার উপকরণ গুছিয়ে নিয়ে বিদায় নেয় জাহাঙ্গীর তখন আপন ভাবনায় মশগুল। মানডু দক্ষিণে অনেক দিনের দূরত্বে অবস্থিত এবং বয়স্ক আর গাট্টাগোট্টা আলী খান অযথা পথের ধকল সহ্য করবেন না। রাজ্যপাল পাঁচ মিনিট পরে তাকে অভিবাদন জানায়। তার পরনের ঘামে ভেজা আলখাল্লা আর পায়ের ধূলি ধূসরিত নাগরা দেখে বোঝা যায় তিনি বাস্তবিকই গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা জানাতে চান।
‘আলী খান, কি ব্যাপার?
‘আমি নিজ মুখে আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জানাতে চাই বা অন্যথায় আমার আশঙ্কা আপনি খবরটা হয়ত বিশ্বাস করবেন না।
‘কি সংবাদ বলেন।
‘আপনার সন্তান যুবরাজ খুররম আপনার প্রজাদের আপনার বিরুদ্ধে সংগঠিত করছে।’
‘আপনি কি বলতে চান?
‘আপনাদের ভিতরে প্রকাশ্য বিরোধের সম্ভাবনা যদি দেখা দেয় সে আমার সমর্থন কামনা করে আমার কাছে চিঠি লিখেছিল। আমি, অবশ্যই, তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি এবং মনে করেছি সাথে সাথে আপনাকে জানান আমার দায়িত্ব।’
‘আমাকে তাঁর চিঠিটা দেখাও।
‘আমার কাছে সেটা এখন নেই, কিন্তু বার্তাটা যে বহন করে এনেছিল আমি সেই বার্তাবাহক বন্দি করে সে সবকিছু স্বীকার না করা পর্যন্ত তাকে নিপীড়ন করি। যুবরাজ খুররম দক্ষিণে একটা শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করতে চাইছেন যেখান থেকে তিনি আপনার আধিপত্যকে প্রশ্ন করতে পারবেন। আমি কেবল একমাত্র রাজ্যপাল নই যুবরাজ যোগাযোগ করেছেন। এই দেখেন–আমার কাছে নামের একটা তালিকা আছে…’ আলী খান হাসলে জাহাঙ্গীর যা অনুগ্রহোদ্দীপক হাসি হিসাবে অনুমান করে।
জাহাঙ্গীর তার দিকে আলী খানের বাড়িয়ে ধরা কাগজটা নেয়। সে রাজ্যপালের বিশ্বস্ততার বিষয়ে অনেক দিন আগেই খসরুর শেষ বিদ্রোহের সময়েই সন্দেহ করার মত কারণ খুঁজে পেয়েছিল। আলী খান অবশ্য একাধারে ধূর্ত আর উঁচুমহলে আত্মীয়স্বজনও রয়েছে এবং জাহাঙ্গীর কখনও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মত যথেষ্ট প্রমাণ পায়নি। খুররম অবশ্যই জানতো লোকটার বিশ্বস্ততা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে এবং সম্ভবত সেই কারণেই সে তার সাথে যোগাযোগ করেছিল। খুররমের অবস্থানের দুর্বলতা সম্বন্ধে এটা থেকে অনেক কিছু অনুমান করা যায় যা আলী খান, কোনো সন্দেহ নেই সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করে, তাকে তার আব্বাজানের কাছে ধরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাহাঙ্গীর নামের তালিকায় চোখ বুলাতে গিয়ে দেখে তালিকাটা বেশ লম্বা। সে সহসা ক্লান্তি অনুভব করে এবং একা থাকতে চায়। আলী খান, আমি তোমায় যথাযথভাবে পুরস্কৃত করবো। আমি এখন একা থাকবো।’
‘ধন্যবাদ, জাঁহাপনা। আপনি আমার আনুগত্যের উপর ভরসা রাখতে পারেন। আলী খান ঘুরে দাঁড়িয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যাবার জন্য অগ্রসর হবার সময় তাঁর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
রাজ্যপালের পেছনে দরজা বন্ধ হতে, জাহাঙ্গীর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মোছে। সে যে সন্তানকে একটা সময় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো সে কীভাবে এতটা আনুগত্যহীন হতে পারে? দূর্গের প্রকারবেষ্টিত ছাদে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তাঁদের শেষবারের মত দেখা হবার পর থেকে, এমন একটা দিনও অতিবাহিত হয়নি যখন সে খুররমের বিষয়ে চিন্তা করে নি, নিজেকে মনে মনে প্রশ্ন করে নি সে কি করার পরিকল্পনা করছে। তার সত্ত্বার একটা অংশ আশা করেছে যে সে হয়তো নিজের ঔদ্ধত্যের জন্য অনুতপ্ত হবে এবং অনুবর্তী হবে। তাঁর আসিরগড় থেকে লেখা চিঠিগুলো প্রথমদিকে এই আশাগুলোকে সাহসী করে তুলতো, কিন্তু মেহেরুন্নিসা যখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিত তার শব্দ চয়ন আর কিছু না নিজের কাজের স্বপক্ষে উদ্ধত যুক্তি প্রদর্শন–সেখানে ক্ষমাপ্রার্থনার কোনো ধরনের দোষ স্বীকারের কোনো প্রসঙ্গই নেই। তারই পরামর্শে তিনি চিঠির উত্তর প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু তিনি একই সাথে মেহেরুন্নিসার অনুরোধ মেনে নিয়ে নিজের সন্তানকে গ্রেফতার করার জন্য সেনাবাহিনী প্রেরণ করা থেকে বিরত থাকেন। এটা এখন প্রতিয়মান হচ্ছে যে মেহেরুন্নিসা বরাবরের মতই ঠিক পরামর্শই দিয়েছিল। তিনি শিথিলতা প্রদর্শন করেছেন, কোনো ধরনের পদক্ষেপ না নিয়ে তিনি বৃথাই কালক্ষেপণ হতে দিয়েছেন, যা খুররমকে আরো উদ্ধত হতে উৎসাহিত করেছে।
*
জাহাঙ্গীর যখন মেহেরুন্নিসা কক্ষের দিকে এগিয়ে যায় তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সে এইমাত্র পরামর্শদাতাদের একটা বৈঠকে যোগ দিয়ে এসেছে যেখানে আলী খান, পরিষ্কার সবুজ আলখাল্লা পরিহিত হয়ে, তাঁর গল্পের পুনরাবৃত্তি করেছে। তার পরামর্শদাতাদের রাজ্যপালকে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে প্রশ্ন করা দেখে বোঝা গেছে তার নিজের মত তারাও দুশ্চিন্তাগ্রস্থবা নিদেনপক্ষে সেইরকমই ভান করেছে। আলী খানের তালিকায় তাদের কারও নাম নেই কিন্তু খুররমের ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে তাদের কেউ কি অবগত ছিল? ভাবনাটা জাহাঙ্গীরের অভিব্যক্তিকে কঠোর করে তুলে। মন্ত্রণা কক্ষের পেছনের দেয়ালে অবস্থিত একটা তিরস্করণীর আড়াল থেকে মেহেরুন্নিসা সবকিছু দেখেছে এবং শুনেছে। তাঁর কি বলার আছে তিনি শুনতে আগ্রহী–কিন্তু গিয়াস বেগ আর আসফ খানের সাথেও পরামর্শ করা প্রয়োজন, তাঁদের সাথে যোগ দিতে যাদের তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন।
