‘খুররম, কি হয়েছে?
সে তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রথমে ঝুঁকে তাকে চুমো দেয় তারপরে হেঁটে গবাক্ষের কাছে গিয়ে পুনরায় শুষ্ক, ঝিকমিক করতে থাকা ভূপ্রকৃতির দিকে তাকায়। সে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়েই সে শুনতে পায় আরজুমান্দ আওরঙ্গজেবকে নিয়ে যাবার জন্য একজন পরিচারিকাকে ডাকে। সে তারপরে টের পায় তার হাত আলতো করে তাকে জড়িয়ে ধরছে এবং তাকে ঘুরিয়ে দাঁড় করায় নিজের মুখোমুখি করতে।
‘খুররম, এভাবে চেপে রেখো না, যাই ঘটুক না কেন তোমার অবশ্যই আমায় সেটা বলা উচিত।
‘তোমার কি মনে আছে যে জামাল খানকে আমি আমার গুপ্তচর হিসাবে মানডুর শাসনকর্তার কাছে পাঠিয়েছিলাম? বেশ, আমি আমার উত্তর পেয়েছি। আমার আব্বাজান তাকে পুরস্কৃত করবেন সেই আশায় সন্দেহ নেই, শাসনকর্তা তাকে শারীরিকভাবে নিপীড়ন করেছে আমাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে সে যা জানতো সেটা প্রকাশ করতে এবং তারপরে তাকে হত্যা করেছে। সে তার ছিন্নমস্তক সাথে একটা ধৃষ্টতাপূর্ণ চিরকুট দিয়ে আমার কাছে ফেরত পাঠাবার মত হঠকারিতা প্রদর্শন করেছে। সে নির্ঘাত বিশ্বাস করেছে যে আব্বাজান আমায় পুরোপুরি পরিত্যাগ করেছেন এবং আমার পূনর্বাসিত হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই নতুবা তিনি এমন কাজ করার সাহস করতেন না। আর তিনি সম্ভবত ঠিকই ভেবেছেন। আমাদের এখানে অবস্থানের এতগুলো মাস অবস্থানের সময় আব্বাজানের কাছ থেকে আমি কোনো বার্তা পাইনি যদিও নিজের নিরপরাধিতার বিষয়ে প্রতিবাদ করে আমি তাঁর কাছে বেশ কয়েকটা চিঠি পাঠিয়েছি।’
‘কিন্তু এটাও তো সত্যি যে তিনি এখনও আপনার বিরুদ্ধে কোন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন নি। এটা নিশ্চয়ই কিছু অর্থবহন করে।
‘সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অন্য আর সবার মত–আমি যাঁদের আমাকে সমর্থন করতে রাজি করাতে চেষ্টা করছি যারা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানায় নি তাদের সকলের মত–তিনিও হয়ত অপেক্ষা করে কালক্ষেপণ করছেন এবং পুরষ্কার আর শাস্তির হুমকি প্রদান করছেন, আমি কোনোভাবেই যা করতে পারবো না, তার জন্য তার লড়াই লড়তে। আমার লোকজন ইতিমধ্যেই দলত্যাগ করতে আরম্ভ করেছে। শেষবার গণনার সময় আমার সাথে দুই হাজারেরও কম লোক ছিল… কে জানে একমাস, দুইমাস পরে আমার সাথে কতজন লোক থাকবে? আমরা এভাবে সবকিছু চলতে দিতে পারি না। আমার জন্মগত অধিকার আর যোগ্যতা আমাকে যে উচ্চাকাঙ্খী লক্ষ্যে অধিকার দিয়েছে আমি কীভাবে তা অর্জন করবো?
কিন্তু আপনি কি করবেন?
‘আগ্রায় আবার ফিরে গিয়ে আরো একবার নিজেকে আব্বাজানের করুণার কাছে নিজেকে সমর্পিত করে তাকে বাধ্য করবো আমার কথা শুনতে…’
না!” আরজুমান্দের কণ্ঠের প্রচণ্ডতা তাকে চমকে দেয়। খুররম, আমার কথা শোনেন। আপনি যা করতে চাইছেন সেটা করার মানে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু। আপনি নিদেন পক্ষে খসরুর মত অন্ধত্যুবরণ করা প্রত্যাশা করতে পারেন। আপনি প্রথমবার আমাকে যখন বলেন যে মেহেরুন্নিসা আমাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছে আমার নিজের ফুপুজান হবার কারণে কথাটা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হয়েছিল… কিন্তু তারপরে আমি চিন্তা করতে শুরু
করি এবং তখন বুঝতে পারি তাকে আমি আসলেই কত অল্প চিনি। আমি যখন বড় হচ্ছিলাম তখন তিনি তার প্রথম স্বামীর সাথে বাংলায় অবস্থান করছিলেন। তিনি সম্রাজ্ঞী হবার পরে তাকে তখন আরো দূরের কেউ বলে মনে হত, নিজের অবস্থান আর নিজেকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত… আমি তাকে কদাচিত একা দেখেছি। শাহরিয়ারের সাথে এখন যখন লাডলির বাগদান সম্পন্ন হয়েছে, আমরা তার জন্য প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছি… আমি এখন সেটা বুঝতে পেরেছি। আর আমি একটা বিষয় খুব ভালো করেই জানি আমার ফুপুজান কতটা ধূর্ত, কতটা স্থিরসংকল্প, কতটা শক্তিশালী… খসরুর বিদ্রোহের সাথে যখন আমার চাচাজান মীর খান যোগ দিয়েছিল তখন তিনি তাঁর এইসব গুণাবলি ব্যবহার করে নিজেকে আর সেই সাথে আমাদের পুরো পরিবারকে রক্ষা করেছিলেন এবং তিনি সেইসব গুণাবলি আবারও ব্যবহার করতে পিছপা হবেন না যদি তার কাছে সেটা প্রয়োজনীয় মনে হয়। আগ্রায় ফিরে যাবার কথা ভুলে যান… তার প্রভাবের কাছে নিজেকে সমর্পণ করবেন না। সম্রাটকে তিনি কি করার জন্য প্ররোচিত করতে পারেন সেটা ভেবে আমি আতঙ্কিত। আমার কথা দেন, অনুগ্রহ করে…’।
আরজুমান্দের কণ্ঠে খুররম আবেগপ্রবণ প্রত্যয় শুনতে পায়। সচরাচর তাঁর বিবেচনাবোধের উপর আস্থা রাখতে আগ্রহী আরজুমান্দ কদাচিৎ তার সাথে কিছু নিয়ে তর্ক করেছে। সে সম্ভবত ঠিকই বলেছে। সে নিজের নিরপরাধিতায় এবং যুক্তিতর্ক আর বোঝাবার ক্ষমতায় যতই বিশ্বাস করুক, জাহাঙ্গীরের ভালোবাসায় অপ্রতিরোধ্য, মেহেরুন্নিসা, খুব সম্ভবত আব্বাজানের সাথে তাকে আরেকবার দেখা করার সুযোগ থেকে বিরত রাখবে। বেশ, তাই হবে, সে অবশেষে মন্থর কণ্ঠে বলে, ‘আমি কথা দিচ্ছি… আমি আরেকটু ধৈর্য ধারণ করে দেখবো।
*
হেকিম জাহাঙ্গীরের উর্দ্ধবাহুতে শক্ত করে পট্টি বেধে দেয়ার সময় সে ব্যাথায় কুঁচকে উঠে। যমুনার তীরে বাজপাখি দিয়ে শিকার করার সময় তাঁর নিজের অসতর্কতার কারণে জখমটা হয়েছে। সে যদি চামড়ার দস্তানা পরিধান করে থাকতো তাঁর প্রিয় হলুদ বাজপাখির, পাখিটা তিনি নিজের হাতে পোষ মানিয়েছেন, তীক্ষ্ণ হলুদ ঠোঁট বাহুর একটা পুরাতন ক্ষতস্থানের মুখ উন্মুক্ত করতে পারতো না মির্জাপুরের রাজার সাথে লড়াই করার সময় ক্ষতটা হয়েছিল। হেকিম তার কাজ শেষ করার মাঝেই একজন পরিচারক ভেতরে প্রবেশ করে। জাহাপনা, মানডুর রাজ্যপাল আপনার সাথে দেখা করতে আগ্রহী। তিনি বলেছেন তিনি খবর নিয়ে এসেছেন যা অবিলম্বে আপনার শোনা উচিত।’
