বার্তাটার নিচে আলী খান, মানডুর শাসনকর্তা, স্বাক্ষর রয়েছে।
‘বার্তাটায় কিছু নেই, বাহাদুরি আর ধৃষ্টতাপূর্ণ এক টুকরো কাগজ, খুররম যতটা অনুভব করে কণ্ঠস্বরে তাঁর চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তুলে বলে। মাথাটা যথাযথ ধর্মীয় আচার অনুসরণ করে কবর দাও। জামাল খানের জন্য আমরা এখন এতটুকুই কেবল করতে পারি।’
সে ঘুরে দাঁড়ায় এবং দূর্গের উপরিতলে অবস্থিত আরজুমান্দের কক্ষের অভিমুখে সে যখন রওয়ানা দেয় তখনও তার হাতে মানডুর শাসনকর্তার চিঠিটা ধরা রয়েছে। সে কক্ষের দরজার উন্মুক্ত পাল্লার মাঝ দিয়ে দেখে যে আরজুমান্দ গবাক্ষের কাছে বসে রয়েছে তার কোলে তাদের সদ্যোজাত সন্তান আওরঙ্গজেব।সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে তাদের প্রাণ ভরে দেখে। ছেলেটা এখন ভালোই আছে, যদিও সেই দিনটার কথা সে কখনও ভুলবে না, তারা আগ্রা ছেড়ে আসবার দুই মাস পরে এবং সন্তান ভূমিষ্ট হবার পুরো একমাস আগে, তাঁদের দলটা যখন বিন্ধ্যা পর্বতের ভিতর দিয়ে উপরের দিকে যাবার জন্য পরিশ্রম করছিল তখন আরজুমান্দের গর্ভযন্ত্রণা শুরু হয় যেখানে বর্ষার ভারি বর্ষণে ছোট ছোট খাড়িগুলো বিপদসঙ্কুল পাহাড়ী নদীতে পরিণত হয়েছে এবং তারা যখন যাত্রা বিরতি করে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করে তখন টপটপ করে বৃষ্টির পানি পড়তে থাকা গাছের ডালপালা ছিল তাদের তাবু হিসাবে একমাত্র আশ্রয়।
কোনো হেকিম, বা ধাত্রীর সহায়তা ছাড়া কেবল তাঁদের সঙ্গে আসা দু’জন আয়ার সহায়তায় আরজুমান্দ পর্দা দেয়া গরুর গাড়িতে সন্তান জন্ম দেয়। বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে, অসহায়ভাবে তার আর্তনাদ শুনতে শুনতে ইচ্ছা করছিল এসব বন্ধ হোক কিন্তু একই সাথে ভয় হচ্ছিল সহসা এই আর্তনাদ বন্ধ হয়ে যাবার কি অর্থ ভেবে–এতটা ক্ষমতাহীন নিজেকে তার আর কখনও মনে হয়নি। কেন তার জীবনটা, যা প্রথমে তার দাদাজান তারপরে তার আব্বাজানের প্রশ্রয়ে এত ভালোভাবে শুরু হয়েছিল, এমন এক রমণীর সাথে তার বিয়ে হয়েছিল সে যাকে ভালোবাসে এবং যে তাকে ভালোবাসে তারপরে তার সফল যুদ্ধাভিযান, এতকিছুর পরেও কেন এমন ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার হল? সে মনে মনে ভাবে, তবে কি নিয়তি তাকে পরীক্ষা করছে, খানিকটা স্বস্তির জন্য দু’হাতে নিজেকে আঁকড়ে রয়েছে, দেখতে চায় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলে তাঁর উচ্চাকাঙ্খর কি দশা হয়? না, সে স্থিরসংকল্প, আরজুমান্দের আর্তনাদ তাঁদের সপ্তমে পৌঁছেছে মনে হতে সে নিজের দু’পাশে দু’হাত টানটান করে রেখে বুক টানটান করে দাঁড়ায়, তার দুর্ভাগ্য তাকে কেবল আরো দৃঢ়সঙ্কল্প করবে। আরজুমারে কান্নার শব্দ কিছুক্ষণ পরেই হ্রাস পায় এবং এক স্বাস্থ্যবান শিশুর তীক্ষ্ণ স্বরে কান্নার শব্দ তার বদলে ভেসে আসে।
সে এখন যখন দরজার ছায়ায় দাঁড়িয়ে তাকে তাঁদের সন্তানের সাথে দেখছে, তাঁদের জন্য উদ্বেগ, অনিশ্চয়তাবোধ যা সে কখনও দীর্ঘ সময় ভুলে থাকতে পারে না পুনরায় তাকে আচ্ছন্ন করে। তাঁর জন্য যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দেয়ার মাঝে ভয়ের খুব বেশি কিছু নেই কিন্তু চারপাশের সবকিছু যখন মনে হয় বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে তখন তার পরিবারকে রক্ষা করা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। সে আশা করেছিল দাক্ষিণাত্যে অবস্থানরত তার বাহিনী তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে কিন্তু তার পরিবারের পলায়নের পরপরই কিন্তু সে নিজের বাহিনীর কাছে পৌঁছাবার অনেক আগেই জাহাঙ্গীর দ্রুতগামী অশ্বারোহী বার্তাবাহক প্রেরণ করে মালিক আম্বারের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান বন্ধের আদেশ দেয় এবং পুরো বাহিনীকে আগ্রায় ডেকে পাঠায়। খুররমের কতিপয় সেনাপতি-কামরান ইকবালের মত মানুষেরা–আদেশ অমান্য করে এবং আসরগড়ে তাকে। খুঁজে বের করে। আরো অনেকেই–কোথায় তাদের নিজেদের সুবিধা হবে সেই সম্বন্ধে সচেতন হবার সাথে সাথে জাহাঙ্গীরের শাস্তির ভয়দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে আগ্রায় ফিরে যায় যেখানে তারা প্রকাশ্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য হয়।
জামাল খানের হত্যাকাণ্ড–এখন আবার নতুন আরেকটা আঘাত। কোনো মানুষের পক্ষে নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করা সম্ভব না। জামাল খান বাস্তবিকই তার পরিকল্পনার কিছুটা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন কিন্তু তার কাছ থেকে বলপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তি দ্বারা তাঁর নিজের খুব বেশি সংখ্যক সমর্থকদের নিরাপত্তার বিষয়টার আপোষ করা হয়নি। খুররম তার শিবিরে গুরুত্বপূর্ণ নৃপতি আর শাসনকর্তাদের ভিতর যাঁদের আকৃষ্ট করতে চেয়েছে তাঁদের কারো কাছ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। বাতাস কোন দিকে প্রবাহিত হয় সেটা দেখার জন্য তারা অপেক্ষা আর পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই এবং তাঁদের কাছে তাঁর প্রেরিত বার্তাগুলো বাস্তবিকই যদি জাহাঙ্গীরের কাছে পৌঁছায় এই মনোভাবের কারণে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কিন্তু এরফলে তাঁদের পক্ষে তাকে সহায়তা দেয়ার সম্ভাবনা, গোপনে হলেও, অনেকটাই হ্রাস পাবে।
সে আরজুমান্দের কক্ষে প্রবেশ করার সময় চেষ্টা করে নিজের চেহারায় একটা উৎফুল্লভাব ফুটিয়ে রাখতে কিন্তু সে তাকে খুব ভালো করে চেনে। তার এগিয়ে আসবার শব্দ শুনে সে মুখ তুলে তাকায়, কিন্তু তার চোখেমুখে ফুটে থাকা টানটান উত্তেজনার অভিব্যক্তি দেখে আরজুমান্দের হাসি স্নান হয়ে যায়।
