অশ্বারোহী দ্রুত নিচের সমভূমির দিকে নামতে শুরু করলে খুররম চোখ কুঁচকে চারপাশের রুক্ষ ভূপ্রকৃতি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখে, মনে মনে ভাবে আসিরগড়ের তোরণদ্বারে লোকটার ঔদ্ধত্যের সাথে ঘোড়া দাবড়ে আসা কি কোনো সম্ভাব্য আক্রমণের ইঙ্গিতবহ। কিন্তু আকাশের অনেক উঁচুতে বাতাসের স্রোতে ডানা ভাসিয়ে ভেসে থাকা কয়েকটা মরাখেকো শকুন ছাড়া আশেপাশে কোনো জীবন্ত প্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। থলিটা নিয়ে আসবার জন্য তোক পাঠাও,’ সে মুখ থেকে ঘাম মুছে আদেশ দেয়। জুন মাস মাত্র শুরু হয়েছে এবং প্রতিদিনই দাবদাহের আক্রমণ প্রবলতর হচ্ছে এবং বাতাস গুমোট আর অসহনীয় হয়ে উঠছে। সে কিছুক্ষণের ভিতরেই তোরণগৃহ থেকে ধাতব চক্রের পরস্পরকে সজোরে ঘর্ষণের শব্দ শুনতে পায় যার সাথে সাথে কাঠের প্রবেশ তোরণ রক্ষাকারী লোহার বেষ্টনী কম্পিত ভঙ্গিতে উপরে উঠতে শুরু করায় শিকলের ঝনঝন শব্দ ভেসে আসে। তারপরে তোরণের ডানপাশে অবস্থিত একটা ছোট দরজা-খুব বেশি হলে চারফিট উঁচুভেতরের দিকে খুলে যায়। দীর্ঘদেহী, কৃশকায় এক তরুণ, তাঁর মাথার সোনালী রঙের চুল সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করে, দরজার নিচে দিয়ে ঝুঁকে বাইরে বের হয়ে আসে এবং ছুঁড়ে দেয়া থলিটা যেখানে একটা কাঁটা ঝোঁপের পাশে পড়ে রয়েছে সেদিকে দৌড়ে যায়। নিকোলাস পুটলিটা তোলার জন্য উবু হতে, খুররম ভাবে, টমাস রো ঠিকই বলেছিল। তরুণ ইংরেজ গত কয়েক মাসে নিজেকে একজন বিশ্বস্ত আর কুশলী কর্চি হিসাবে প্রমাণ করেছে। আগ্রা থেকে পলায়নের নাটকীয়তার মাঝে এই ইংরেজ তরুণকে তার অধীনে চাকরি দেয়ার ব্যাপারে রো’র অনুরোধের বিষয়টা সে বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। নিকোলাস অবশ্য ভুলে যায়নি। সুরাটের বন্দর থেকে ইংল্যান্ডগামী একটা জাহাজে তাঁর মনিবকে তুলে দিয়ে সে এখানে দাক্ষিণাত্যের মালভূমির উত্তরপ্রান্তে আসিরগড়ে পথ চিনে নিয়ে হাজির হয়েছে।
খুররম লক্ষ্য করে নিকোলাস সহসা গুটিয়ে যায় এবং আরেকটু হলেই তাঁর হাত থেকে থলিটা মাটিতে পড়ে যেত। নিজেকে সামলে নিয়ে, সে থলিটা এবার দু’হাতে আঁকড়ে ধরে এবং দেহের কাছ থেকে যতটা দূরে সম্ভব ধরে রেখে সতর্কতার সাথে সেটা বয়ে নিয়ে ঢালু পথ দিয়ে উপরের দিকে উঠতে আরম্ভ করে এবং দূর্গের ভেতরে প্রবেশ করে। অশ্বারোহী কি ছুঁড়ে ফেলে গেছে জানবার কৌতূহলে খুররম দ্রুত পাথরের খাড়া সিঁড়ি দিয়ে নিচের প্রধান আঙিনায় নেমে আসে। নিকোলাসের চারপাশে একদল সৈন্য জটলা করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং চটের দাগযুক্ত থলিটা তার পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে। খুররম সামনের দিকে এগিয়ে যেতে, তাঁর নাকে বিবমিষাকর একটা দুর্গন্ধ ভেসে আসে। থলির বাঁধন খুলো, সে নিকোলাসকে আদেশ দেয়। দ্রুত।
নিকোলাস কোমর থেকে নিজের খঞ্জরটা বের করে এক পোঁচে থলির মুখ আটকে রাখা মোটা দড়ি কেটে দেয় এবং তারপরে সেটাকে একপাশে কাত করে দেয়। থলির ভেতর থেকে পচনক্রিয়া শুরু হওয়া একটা কালচে বস্তু গড়িয়ে বের হয়ে আসে। খুররম কিছুক্ষণের জন্য বস্তুটাকে পচা তরমুজ মনে করে যতক্ষণ না সে নাকে বমি উদ্রেককারী মৃত্যুর মিষ্টি দুর্গন্ধ পুরোপুরি পায়। জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের একজন, হালকা পাতলা এক তরুণ, ঘুরে দাঁড়ায় এবং মুখ বিকৃত করে বমনার্থে ওআক তুলে এবং খুররমও যখন বুঝতে পারে সে চোখের সামনে কি দেখছে সে তার গলায় পিত্তের স্বাদ অনুভব করে।
সে, উবু হয়ে বসে, নিজেকে জোর করে বাধ্য করে পচে ফুলে উঠা বস্তুটা পরীক্ষা করে দেখতে যা এক সময় তার বিশ্বস্ত গুপ্তদূতদের একজন, জামাল খানের কাঁধের উপরে শোভা পেত। সে কয়েক সপ্তাহ আগে মানজুর শাসনকর্তার কাছে জাহাঙ্গীরের সাথে তার বিরোধে শাসনকর্তার সমর্থন কামনা করে একটা বার্তা দিয়ে তাকে পাঠিয়েছিল। গুপ্তদূতেরা বাম চোখ তুলে ফেলা হয়েছে এবং একজোড়া শূককীট রক্তাক্ত অক্ষিকোটরে মোচড় দিচ্ছে। হাঁ করে থাকা মুখের ভিতর ভাঙা দাঁত, পূজ জমা মাড়ি আর বেঢপ ফুলে বেগুনী হয়ে উঠা ঠোঁটের মাঝে বের হয়ে থাকা একটা কাগজের টুকরোয় কামরান নিজের সীলমোহর সনাক্ত করতে পারে। এটা মানডুর শাসনকর্তার কাছে তাঁর প্রেরিত চিঠিটা ছাড়া আর অন্য কিছু না।
‘যুবরাজ, থলির ভিতরে আরো কিছু একটা রয়েছে, সে নিকোলাসকে বলতে শুনে। সে নিজের পায়ে ভর দিয়ে পুনরায় উঠে দাঁড়িয়ে কর্চির ধরে থাকা চামড়ার ছোট থলেটা নেয়, এবং সেটা খুলতে প্রাণপনে ঢোক গিয়ে পাকস্থলী থেকে উঠে আসা বমি দমন করে সে কয়েক পা পিছিয়ে আসে। বিশ্বাসঘাতক খুররমকে সম্বোধন করে ভেতর একটা চিঠি রয়েছে।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমি একজন অনুগত কর্মচারী। আমি তোমার বার্তাবাহকের সাথে যেমন আচরণ করা উচিত ছিল তাই করেছি। তাঁর মৃত্যু মোটেই দ্রুত হয়নি কিন্তু তোমার মত একজন প্রভুর অধীনস্ত কোনো কর্মচারী সহানুভূতি আশা করতে পারে না। সে শেষ সময়ে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে যা জানে সবকিছু সে স্বীকার করে গেছে–তোমার সাথে কতজন সৈন্য রয়েছে, কতগুলো কামান আছে, ষড়যন্ত্রের অনুরোধ নিয়ে এবং যাঁদের কাছে তুমি বার্তা প্রেরণ করেছে সেইসব বার্তাবাহকদের নাম। তুমি এই বার্তা যখন পাঠ করছে তখন আমি মোগল রাজদরবারে পৌঁছে যাব তোমার রাজবৈরী প্রস্তাবের বিষয়ে তোমার আব্বাজান, মহামান্য সম্রাটকে অবগত করতে।
