‘খুররম… কি এটা? আরজুমাদের কণ্ঠস্বর তাকে নিজের মাঝে ফিরিয়ে আনে। সে যুদ্ধক্ষেত্রের মত সহজাত প্রবৃত্তির বশে তেলের প্রদীপের আগুনের শিখায় কাগজের টুকরো ধরে রাখে। সে তারপরে আরজুমান্দের হাত ধরে তাকে তুলে নিজের পায়ে দাঁড় করায়। আমার আব্বাজান আমায় গ্রেফতার করার আদেশ দিয়েছেন। আমাদের সন্তানদের নিয়ে এসো। আমরা এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাব।’
আরজুমান্দের চোখ বড় বড় হয়ে যায় কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের ব্যগ্রতা তাকে বলে যে এটা প্রশ্ন করার সময় না এবং সে কালক্ষেপণ না করে দৌড়ে বাচ্চাদের কক্ষের দিকে যায়। খুররম দরজার ভিতর দিয়ে তাকে অনুসরণ করে এবং তারপরে হেরেম থেকে বের হয়ে নিজের দেহরক্ষীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে, আমাদের সবগুলো ঘোড়াকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত করো। সদর দরজায় যেকোনো মুহূর্তে সম্রাটের অনুগত সৈন্যদের উপস্থিত হবার শব্দ শোনার আশঙ্কার মাঝে, সে দৌড়ে নিজের কক্ষের দিকে যায় এবং গলায় ঝোলানো একটা চাবি হাতে নিয়ে একটা রঙ করা সিন্দুক খোলে। সিন্দুকের ভেতর থেকে রত্নপাথরের একটা ছোট বাক্স আর স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি একটা থলে তুলে নিয়ে সেগুলো একটা চামড়ার বগলিতে ঢুকিয়ে সেটা সে নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়, তারপরে নিজের তরবারিটা নিয়ে সেটা কোমরে বাধতে বাধতে হাভেলীর মূল আঙিনার দিকে দৌড়াতে শুরু করে। আরজুমান্দ ইতিমধ্যে মাথায় একটা শাল জড়িয়ে নিয়ে সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে। তার পাশে, অশ্রুসজল দারা শুকোহর হাত ধরে জাহানারা দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং শাহ্ সুজা আর রওসোন্নারা আয়াদের কোলে। একজন সহিস শেষ ঘোড়াটায় পর্যাণ এবং লাগাম পরিয়ে জটার পেটের কাছে নিচু হয়ে পর্যাণ আঁটকে রাখার চামড়ার বেল্টের আঁটুনি পরীক্ষা করে দেখে। সে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালে তাঁর কাজ শেষ হবার সাথে সাথে খুররম চিৎকার করে যাত্রার আদেশ দেয় এবং খয়েরী রঙের একটা উঁচু ঘোড়ায় আরোহণ করে তার সাথে ভ্রমণের নিমিত্তে আরজুমান্দকে পেছনে তুলে নেয়। সে পেছন থেকে শক্ত করে খুররমের কোমড় জড়িয়ে ধরে থাকে যখন সে ঘোড়ার পাজরে গুঁতো দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে শুরু করে পুতগতিতে সদর দরজার নিচে দিয়ে এগিয়ে যায় এবং হাভেলী থেকে বের হয়ে আসে। সে আবার কবে এটা দেখতে পাবে? তার পেছনে এবং একই গতিতে ঘোড়া তাড়িয়ে নিয়ে অনুসরণ করছে তার পরিবার-পরিজনের প্রায় ডজনখানেক সদস্য। দারা শুকোহ্ আর জাহানারা খুররমের দু’জন কর্চির ঘোড়ার পর্যাণের সামনের উঁচু অংশে বসে রয়েছে আর রওসোন্নারা এবং শাহ্ সুজা খুররমের দেওয়ান, শাহ্ গুলের চওড়া কাঁধবিশিষ্ট বে ঘোড়ার দু’পাশে ঝোলান খড়ের তৈরি ঝুরিতে রয়েছে।
খুররম কাঁধের উপর দিয়ে পিছনের দিকে তাকিয়ে দূর্গ থেকে নেমে আসা ঢালু পথটায় আলোর ঝলক দেখতে পায়। মশাল বহনকারী অশ্বারোহী দল নয়তো? না, এগুলো কেবল ধাতব কয়লাদানিতে দপদপ করতে থাকা আগুনের শিখা যা সাধারণত দূর্গের প্রবেশপথ গুলোকে আলোকিত করতে জ্বালানো হয়ে থাকে। সে কান খাড়া করে পিছু ধাওয়া করার শব্দ শুনতে চেষ্টা করে। নিজের জন্য না পরিবারের কথা চিন্তা করে সে ভয় পায়। তাকে যদি বন্দি কিংবা হত্যা করা হয় তাহলে তাদের কি নিয়তি হবে? আরজুমান্দ তখনই তাকে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরলে সে একটা ক্ষিপ্ত চিৎকার শুনতে পায় এবং রাস্তার পাশের বস্তি থেকে দুটো বিশালাকৃতির কুকুর দৌড়ে এসে খুররমের ঘোড়ার চারপাশে লাফাতে থাকে যতক্ষণ না তাঁরা জন্তুগুলোকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যায়। তাদের চারপাশের অন্ধকার প্রেক্ষাপট শীঘ্রই নিরব হয়ে যায় কেবল যমুনার তীর দিয়ে দক্ষিণে অগ্রসর হতে থাকা তার ক্ষুদ্র মরীয়া দলটার ঘোড়ার খুরের শব্দ পাওয়া যায়। সে অবশ্য এখনও বিপদ কেটে গিয়েছে বলে ভাবতে পারে না। সে তার ঘোড়ার গলার কাছে নিচু হয়ে থাকে, তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন কেবল একটা বিষয়–ভোরের আলো ফোঁটার আগেই সে আর তার পরিবারের আগ্রা থেকে যতটা দূরে সম্ভব সরে আসবার বিষয়টা নিশ্চিত করা।
২.০১ আসিরগড়
সমতলের উপর দিয়ে একটা কালো ঘোড়ায় নিঃসঙ্গ এক অশ্বারোহী পুতগতিতে ছুটে যায়, শেষ অপরাহ্নের নিস্তরঙ্গ বাতাসে লাল ধূলো একটা ভারি আচ্ছাদনের মত তার পেছনে ঝুলতে থাকে। অশ্বারোহী যখন পর্বতশীর্ষের পাদদেশের দিকে এগিয়ে আসে যার উপরে আসিরগড় দূর্গ দাঁড়িয়ে রয়েছে, খুররম দূর্গের বেলেপাথরের প্রাকারবেষ্টিত সমতল ছাদে দাঁড়িয়ে দেখে অশ্বারোহী দূর্গের দিকে খাড়াভাবে এঁকেবেঁকে উঠে আসা পথ দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করার সময় ঘোড়ার বেগ সামান্যই হ্রাস করে। লোকটা আরেকটু কাছে আসতে খুররম লক্ষ্য করে যে এই দাবদাহের ভিতরেও সে ইস্পাতের শিরোস্ত্রাণ এবং গায়ে ধাতব-কীলকযুক্ত চামড়ার আঁটসাট বহির্বাস পরিহিত রয়েছে। আমরা কি গুলি করে তাকে ফেলে দেব? কামরান ইকবাল, যে তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
‘নাহ্। একজন নিঃসঙ্গ অশ্বারোহী আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। দেখাই যাক কি তার অভিপ্রায়, খুররম, অশ্বারোহীর উপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে, উত্তর দেয় যে দূর্গের ঠিক নিচে অবস্থিত একখণ্ড সমতল ভূমিতে এসে পৌঁছেছে এবং নিজের হাপরেরমত হাপাতে থাকা বাহনকে আরো একবার পুতগতিতে ছোটার জন্য তাড়া দিচ্ছে। দূর্গের তোরণগৃহ থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে থাকার সময় সে তার ঘোড়ার পর্যাণে ঝুলতে থাকা একটা থলে তুলে নেয়, এবং ঘোড়াটাকে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে নিয়ে আচমকা এমনভাবে দাঁড় করায় যে জন্তুটা পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, থলেটা মাথার উপরে ঘোরায় এবং গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে দূর্গের লম্বা কীলকযুক্ত দরজার দিকে সেটা ছুঁড়ে দেয়। বিশ্বাসঘাতক খুররমের জন্য উপহার, তাঁর আত্মার যেন নরকে ঠাই হয়, সে চিৎকার করে বলে, তারপরে সে তার ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং ফিরতি পথে নিচের দিকে ছুটতে শুরু করে, সে তার বাহনের গলার কাছে নিচু হয়ে ঝুঁকে থাকে এবং সামান্য আঁকাবাঁকাভাবে যায় যেন দূর্গের ছাদে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকা সৈন্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়বে বলে সে প্রত্যাশা করছে।
