জাহাঙ্গীর সুরায় চুমুক দিয়ে এর হাল্কা তিতা স্বাদ থেকে বুঝতে পারে আফিমের বড়ি মেশান রয়েছে। পানীয়টা নিমেষের ভেতরে তাঁর পাকস্থলীকে উষ্ণ করতে শুরু করে এবং কয়েক মুহূর্ত পরে সে আরেক চুমুক দেয়, বেশ বড় চুমুক, তাঁর দেহের ভিতর দিয়ে অলক্ষ্যে প্রবাহিত হতে থাকা বিকিরণ সে উপভোগ করে। একটা নিচু বিছানার উপরে বসে মাথার নিচে রেশমের কারুকাজ করা একটা তাকিয়া রেখে সে পানপাত্রের তরলের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে, লক্ষ্য করে টকটকে লাল তরল কীভাবে আলোয় ঝলসে উঠে যখন সে পাত্রটা নিজের খুব একটা সুস্থির বলা যাবে না হাতে ধরে থাকে। বলতে থাকো…’
‘আমি যা বলছিলাম, আমার মনে হয় খুররম সিংহাসন দখলের পরিকল্পনা করেছে। দাক্ষিণাত্যে অবস্থানের সময় সে কোনো পদক্ষেপ নেয় নি কারণ সে দরবারের মনোভাব পরখ করে দেখতে চেয়েছিল। সে আগ্রা পৌঁছাবার পর থেকে সম্ভবত এটাই করছে–আমি একটা বিষয় নিশ্চিত করে বলতে পারি যে মাজিদ খানের সাথে সে আলাপ করেছে। সে সম্ভবত আমাদের দু’জন সম্পর্কে কুৎসা রটনার সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে। তাঁর আপনাকে খোঁজার পেছনের কারণ এমনটাও হওয়া বিচিত্র না যাতে করে সে বলতে পারে যে সে আপনার কাছে আবেদন করার পরেও আপনি তার কথা শোনেন নি। আমি নিশ্চিত অচিরেই দাক্ষিণাত্য থেকে তার বাহিনী এসে উপস্থিত হবে। শাহরিয়ারের সাথে উত্তরপশ্চিমে আপনার অন্য বাহিনীগুলো অবস্থান করায়, আপনি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।
জাহাঙ্গীর পাত্র থেকে আরেকটু সুরা পান করে কিন্তু কোনো মন্তব্য করে না।
‘নিজের উচ্চাকাঙ্খ গোপন করার ব্যাপারে খুররম খসরুর চেয়ে অনেক বেশি ধূর্ত, কিন্তু সেও একই জিনিষ চায়।’ মেহেরুন্নিসা এগিয়ে এসে জাহাঙ্গীরের কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। একজন পিতার কাছে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু হতে পারে না যখন তার আপন সন্তানেরা অবিশ্বাসী আর অবাধ্য হয়ে উঠে। এটা একটা দুঃখজনক ঘটনা যখন পরিবারগুলো বিভক্ত হয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে অথচ তাদের তখন একত্রিত হয়ে শক্তির সন্ধান করা উচিত কিন্তু এটাই জগতের রীতি। আপনাকে এই পরিস্থিতি অতীতে একবার মোকাবেলা করতে হয়েছিল এবং এখন আবার আপনাকে ঠিক তাই করতে হবে। তার কণ্ঠস্বর বিষণ্ণ শোনায়। ‘উচ্চাকাঙ্খ একটা খুবই ভালো জিনিষ, কিন্তু বিপুল সম্মানের অধিকারী হবার বাসনা একজন মানুষকে সহজেই অসম্মানজনক কর্মকাণ্ডে প্রবৃত্ত…’
জাহাঙ্গীর ভাবে, মেহেরুন্নিসা ঠিকই বলেছে। শেখ সেলিম চিশতি কি বহু বছর আগে ঠিক একই শব্দগুলো ব্যবহার করেন নি? খসরু আর খুররমের অবাধ্যতার বিষয়টা সুফি সাধক আগেই দেখতে পেয়েছিলেন এবং মেহেরুন্নিসা এখন যেমন তাকে সতর্ক করতে চেষ্টা করছে ঠিক সেভাবে তিনিও তাকে হুশিয়ার করতে চেয়েছিলেন।
‘আমার এখন কি করা উচিত? তার চোখের কোণে আত্মকরুণার অশ্রু জমতে শুরু করলে সে এক চুমুকে পানপাত্রটা খালি করে ফেলে।
‘খুররমকে গ্রেফতার করেন।
*
খুররম আর আরজুমান্দ সাদা কাপড় বিছানো একটা নিচু টেবিলের সামনে আসন পিড়ি হয়ে বসে আছে। তাদের সামনে রাখা খাবারের পদগুলো থেকে–তেতুল দিয়ে রান্না করা ফিজ্যান্টের মাংস, শুকনো ফল দিয়ে ঠাসা ঝলসানো ভেড়ার মাংস এবং রুটি তন্দুর থেকে সদ্য বের করে আনায় এখনও ধোয়া বের হচ্ছে–রুচিকর ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। খুররমের যদিও কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না এবং আরজুমান্দের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে সেও একই রকম বোধ করছে। আব্বাজানের সাথে তাঁর সাক্ষাৎকারের বিবরণ তাকে একদম কাঁপিয়ে দিয়েছে।
‘তোমার অবশ্যই একটু কিছু মুখে দেয়া উচিত…’ সে কথা বলতে আরম্ভ করে কিন্তু শেষ করে না। আরজুমান্দের এক পরিচারিকা পর্দা দেয়া দরজা দিয়ে ঝড়ের বেগে ভেতরে প্রবেশ করে।
‘যুবরাজ, আমায় মার্জনা করবেন, কিন্তু আসফ খানের কাছ থেকে আপনার জন্য একটা জরুরি বার্তা এসেছে।’
‘আমার আব্বাজান? আরজুমান্দ খুররমের দিকে ঘুরে বিস্মিত চোখে তাকায়, যে লাফিয়ে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সে খাবারের বেশ কয়েকটা পাত্র মাটিতে ফেলে, এবং পরিচারিকার হাত থেকে এক ঝটকায় বার্তাটা নেয়। সে সীলমোহর ভেঙে চিঠিটার ভাঁজ খোলার সময় মনে মনে ভাবে যে জাহাঙ্গীরের নমনীয় হবার বিষয়ে আসফ খান কি কিছু জানতে পেরেছেন। কিন্তু দ্রুত হাতে মুসাবিদা করা শব্দগুলোর অর্থ অনুধাবন করার সাথে সাথে তার মনে হয় যেন শরীরের শিরা উপশিরায় রক্ত প্রবাহ বুঝি বরফ হয়ে গিয়েছে: সম্রাট তোমায় অবিলম্বে গ্রেফতার করার আদেশ দিয়েছেন। তোমায় অবশ্যই এখান থেকে পালাতে হবে। প্রহরীদের কাপ্তান, যে আমার বন্ধুও বটে, আমায় লিখিত আদেশ দেখিয়েছে। সে আদেশ পালন করতে অশ্বারোহী দল পাঠাতে সামান্য বিলম্ব করবে কিন্তু খুব বেশিক্ষণ সে অপেক্ষা করতে পারবে না। আমি দোয়া করি এই বার্তা যেন সময়মত তোমার হাতে পৌঁছে। বার্তাটা পড়া শেষ হওয়া মাত্র পুড়িয়ে ফেলবে নতুবা এর বিষয়বস্তু হয়ত আমাকে এবং আমার কাপ্তান বন্ধুকে ধ্বংস করে ফেলবে। খুররম এতটাই বিস্মিত হয় যে কিছুক্ষণ সে কোনো কথা বলতে বা কাজ করতে পারে না এবং পলকহীন চোখে হাতে ধরে থাকা কাগজের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে থাকে যেন কোনোভাবে যদি সে শব্দগুলো গায়েব করতে পারতো।
