‘আমি ফিরে এসেছি কারণ আমি আপনার মুখোমুখি দাঁড়িব্বেলতে চেয়েছিলাম যে আমি আপনার অনুগত সন্তান। এটাই আমার বক্তব্য। তার কথাগুলো কি জায়গামত স্পর্শ করতে পেরেছে? জাহাঙ্গীরের অভিব্যক্তি একটু যেন মনে হয় নরম হয়। আমিও সন্তানের পিতা। খুররম সুবিধাজনক পরিস্থিতির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চেষ্টা করে। আগামী বছরগুলোতে তারা হয়ত এমন অনেক কিছুই করবে যা আমাকে প্রীত করবে না কিন্তু আমি আশা করি তাদের আমি সবসময়েই ভালোবাসবো এবং তাদের প্রতি সমান আচরণ করতে চেষ্টা করবো। আব্বাজান, আমি আপনার কাছে কেবল এটাই চাই–ন্যায়বিচার। আমি অবশ্যই কিন্তু তাকে হতাশ করে দিয়ে তার কানে পায়ের শব্দ ভেসে আসে এবং তারপরেই একজন কর্চি ডানহাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে খিলানাকৃতি দরজার নিচে দিয়ে আবিভূর্ত হয় কারণ ইতিমধ্যে চারপাশ প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে।
‘জাঁহাপনা, সম্রাজ্ঞী জানিয়েছেন যে বাদ্যযন্ত্রীর দল প্রস্তুত।’
‘তাকে গিয়ে বলল আমি শীঘ্রই তাঁর সাথে যোগ দেব।
তরুণ পরিচারক বিদায় নিতে জাহাঙ্গীর কথা বলতে আরম্ভ করে। তুমি যা বলেছো আমি সেটা বিবেচনা করে দেখবো। এখন যাও, এবং আমি পুনরায় ডেকে না পাঠানো পর্যন্ত তুমি দূর্গে আসবে না।’ তিনি কথা শেষ করেই গোড়ালির উপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। খুররম একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে কবুতরের ডাক শুনে। সে এবার হাভেলি ফিরে যাবে এবং তার আব্বাজানের আদেশ অনুযায়ী অপেক্ষা করবে। সে এছাড়া আর কি করতে পারে?
*
‘আপনাকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। আপনার কোনো কবুতর কি আজ ফিরে আসে নি?’ মেহেরুন্নিসা জানতে চায়।
তুমি আমার মনমর্জি ভালোই বুঝতে পার। না, আমাকে আমার কবুতরেরা বিরক্ত করে নি। আমি যখন দূর্গপ্রাকারে গিয়েছিলাম খুররম সেখানে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।
‘খুররম? তার এতবড় স্পর্ধা!
‘আমিও তাকে ঠিক এই কথাই বলেছি।’
‘সে কি চায়?
‘জানতে চেয়েছিল কেন আমি তার সাথে দেখা করছি না এবং সে কীভাবে আমার অসন্তোষের কারণ হয়েছে সেটা জানতে।’
মেহেরুন্নিসা ভ্রূকুটি করে। কামরার ভেতরে একজন পরিচারিকা প্রবেশ করে, নিঃসন্দেহে তাঁর কাছে জানতে এসেছে বাইরের বারান্দায় বাদ্যযন্ত্রীরা এখন তাঁদের বাজনা শুরু করবে কি না, এবং সে হাতের ইশারায় মেয়েটাকে বিদায় করে। সে বুঝতে পারে নি যে খুররম তাঁর আব্বাজানের কাছে সরাসরি অনুরোধ করার কোনো উপায় খুঁজে বের করতে পারবে। তার অভিপ্রায় ছিল যে আগামী আরও কয়েকদিন পরে–যত বিলম্ব হবে ততই মঙ্গল এতে করে খুররমের অবমাননা আরও বেশি হবে–জাহাঙ্গীর তাকে দেওয়ানি আমে ডেকে পাঠাবে এবং পুরো দরবারের সামনে তাঁর দাক্ষিণাত্যের অভিযান পরিত্যাগ করার কারণে তাকে তিরষ্কার করবে এবং তাকে অবিলম্বে সেখানে ফিরে যাবার আদেশ দেবে। খুররম এমন একটা প্রকাশ্য দরবারে জাহাঙ্গীর আবেগতাড়িত হতে পারে এমন কিছুই বলার সুযোগ পাবে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যুবরাজকে সে ঊনজ্ঞান করেছিল।
খুররমের অনেক দোষের ভিতরে একটা হল অনুমিতি,’ সে বলে।
‘তাকে দেখে বাস্তুবিকই সঙ্কটাপন্ন বলে মনে হয়েছে।
কারণ সে জানে যে তাঁর দুষ্টাচরণ ফাঁস হয়ে গিয়েছে। সে আপনার সহানুভূতি উদ্রেক করার চেষ্টা করেছিল।
‘সে দাবি করেছে সে কোনো অন্যায় করে নি… যেকোনো শত্রু চেষ্টা করছে তাকে আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে।
‘কোনো শত্রু? কে হতে পারে?
‘তুমি।’ জাহাঙ্গীর মাথা উঁচু করে এবং সরাসরি তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘কিন্তু আমি কেন তাঁর শত্রু হতে যাব?
‘সে দাবি করেছে যে তুমি ক্ষমতার জন্য লালায়িত এবং ভীত সে তোমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মেহেরুন্নিসা টের পায় তার হৃৎপিণ্ড প্রবল গতিতে স্পন্দিত হচ্ছে কিন্তু সে জোর করে নিজের অভিব্যক্তি সংযত রাখে, এমনকি খানিকটা অবজ্ঞার ভাবও সেখানে ফুটিয়ে তোলে। আমি চিন্তা করিনি তার উচ্চাকাঙ্খ তাকে এতটা বেপরোয়া করে তুলতে পারে। আপনার জন্য আমার ভালোবাসা সম্পর্কে সে জানে, সে আরও জানে কীভাবে আমি আপনার কাছ থেকে প্রসাশনিক দায়িত্বভার কিছুটা গ্রহণ করতে চেষ্টা করছি যাতে আপনি সাম্রাজ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোনিবেশ করার সুযোগ পান। সে এজন্যই আমার মাধ্যমে আপনাকে আক্রমণ করার প্রয়াস নিয়েছে।
‘কিন্তু সে এটা কেন করবে?
‘আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না?’ জাহাঙ্গীরের হাত মেহেরুন্নিসা নিজের হাতে তুলে নেয়। আপনাকে সে যদি এমন কথা বলার স্পর্ধা দেখাতে পারে তাহলে কল্পনা করেন অন্যদের কাছে সে কতটা জঘন্য কথা বলতে পারে! একজন রমণী আপনাকে শাসন করে এমন দাবি করে সে আসলে বোঝাতে চাইছে যে আপনি আর শাসনকার্য পরিচালনা করার মত সুস্থ নন। সে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সৃষ্টি করেছে সিংহাসন দখলের জন্য একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করতে।’
কিন্তু বিষয়টা যদি তাই হবে তাহলে কেন আগ্রা এসেছে, কেন সে আমার কাছে এসেছে? দাক্ষিণাত্যে তাঁর অধীনে একটা সেনাবাহিনী রয়েছে যা সে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধোদ্যোগে নিয়োজিত করতে পারতো।
‘সবকিছুই তার বিশদ পরিকল্পনার অংশ।’ মেহেরুন্নিসা জাহাঙ্গীরের হাত ছেড়ে দেয় এবং একটা কাঁচের বোতল তুলে নেয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। সে বোতলের মুখ থেকে ছিপি খুলে নিয়ে ভেতরের তরল একটা পানপাত্রে ঢালে এবং পাত্রটা তাঁর হাতে তুলে দেয়। এই পানীয়টা সামান্য পান করেন। এটা আপনার অস্থিরতা প্রশমিত করবে।’
