আব্বাজান! জাহাঙ্গীরের দিকে খুররম দৌড়ে যেতে, যার ডান হাত সাথে সাথে নিজের কোমরের খঞ্জরের দিকে উড়ে যায়। খুররম আধো-আলোয় ইস্পাতের শানিত ঝিলিক খেয়াল করে। আব্বাজান… আমি, খুররম। সে তাঁর পায়ের কাছে নিজেকে ছুঁড়ে দেয় যা কিছু বলবে বলে ঠিক করে ছিল সব শব্দ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সে জাহাঙ্গীরের হাত তার মাথা স্পর্শ করবে বলে আশা করে, কিন্তু মাথায় কিছুই অনুভব করে না। সে মুখ তুলে উপরের দিকে তাকিয়ে সম্রাটের ক্রোধে টানটান হয়ে থাকা মুখমণ্ডল দেখতে পায়।
‘তোমার এত বড় স্পর্ধা আততায়ীর মত আড়াল থেকে আমার পায়ের কাছে লাফিয়ে পড়ো?’ জাহাঙ্গীরের কণ্ঠস্বর খানিকটা কর্কশ শোনায়, যেন এইমাত্র তিনি পান করে এসেছেন।
খুররম তাঁর আব্বাজানের এহেন কুপিত মূর্তি দেখে স্তম্ভিত হয়ে ধীরে ধীরে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আমি কোনো আততায়ী নই, আমি উপরের আশা করে, যায়। সে জাহকছু বলবে বলেও হুররম। সে আপনার সন্তান। আপনার সাথে নিশ্চয়ই আমার দেখা করার অধিকার আছে।
‘তোমার কোনো অধিকার নেই।’ জাহাঙ্গীর এতক্ষণ পরে খঞ্জরের ফলাটা পুনরায় ময়ানে ঢুকিয়ে রাখে।
‘আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। তিনদিন পূর্বে আগ্রায় পৌঁছাবার পর থেকেই আমার সাথে দেখা করার জন্য আমি বারবার আপনার কাছে অনুরোধ জানিয়েছি। আপনি কেন আমার আবেদনে সাড়া দেননি?”
কারণ আমি তোমার মুখদর্শন করতে চাই না, ঠিক যেমন দাক্ষিণাত্যে আমি তোমায় তোমার নেতৃত্ব পরিত্যাগ করার আদেশ দেইনি। তুমি ঔদ্ধত্যের বশবর্তী হয়ে তোমার যা ইচ্ছে তাই করছে।
‘আমি আগ্রা ফিরে এসেছি কেবল একটা বিষয়ে পরিষ্কার হতে যে আপনাকে অসন্তুষ্ট করার মত আমি কি করেছি। আপনার কাছ থেকে আগত প্রতিটা রাজকীয় বার্তা যখন নতুন নতুন অবজ্ঞা বয়ে নিয়ে আসে তখন আমার পক্ষে দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পার্সীদের বিরুদ্ধে আপনি কেন শাহরিয়ারকে পাঠালেন? কেন আপনি তাকে আমার জায়গীর দান করলেন?
‘আমায় প্রশ্ন করার কোনো অধিকার তোমার নেই।’
‘আপনি যদি আমায় প্রশ্ন করার অধিকার না দেন তাহলে আমায় অন্তত অনুমতি দেন প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসাবে আমি যা বিশ্বাস করি সেগুলো যেন আপনাকে বলতে পারি। আমার ধারণা কেউ হয়তো আমার বিরুদ্ধে আপনাকে খেপিয়ে দিয়েছে।’
‘কে?
খুররম সামান্য সময়ের জন্য ইতস্তত করে। মেহেরুন্নিসা।
জাহাঙ্গীর সামনের দিকে এক পা এগিয়ে আসে এবং খুররম মর্মাহত হয়ে দেখে তাঁর দাক্ষিণাত্যে অবস্থানের সময় গত আঠারো মাসে তার আব্বাজানের মাঝে কি বিপুল পরিবর্তন এসেছে। তার চোখ দুটো রক্তজবার মত লাল এবং তাঁর একদা দৃঢ় চোয়ালের উপরে ত্বক এখন শীথিলভাবে ঝুলে রয়েছে। সম্রাজ্ঞী আপনার মাঝে আমার জন্য–একটা সময়–যে ভালোবাসা ছিল তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত, সে কথা চালিয়ে যেতে নিজেকে বাধ্য করে। তিনি আপনার প্রতি আমার প্রভাবকে ভয় পান এবং আমার প্রতি আপনার মমতাকে শাহরিয়ারের সাথে প্রতিস্থাপিত করতে আগ্রহী যার নিজের কোনো স্বাধীন মতামত নেই। সে যখন তার জামাতা হবে তখন নিজের কন্যার মত তার উপরও সম্রাজ্ঞীর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ অধিষ্ঠিত হবে… এবং সেই সাথে আপনার উপরেও!
‘অনেক হয়েছে! তোমার কি বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপাট হয়েছে? তোমার সাথে আরজুমান্দ বানুর বিয়ের দেয়ার জন্য সম্রাজ্ঞী স্বয়ং আমার কাছে অনুরোধ করেছিলেন এবং প্রথমবারের মত স্বাধীনভাবে তোমার উপরে সেনাপতির দায়িত্ব অর্পণ করতেও তাঁরই আগ্রহ বেশি ছিল। ব্যাপারটা মোটেই এমন নয় যে তিনি তোমায় ভয় পান বরং তুমিই আমার প্রতি তার ভালোবাসা এবং তার প্রভাবকে সহ্য করতে পারছে না। আমার মরহুম আব্বাজান একজন মহান মানুষ ছিলেন কিন্তু তুমি যখন একেবারে ছোট ছেলে তখন তোমায় মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্রয় দেয়াটা তার অনেকগুলো ভুলের মধ্যে অন্যতম। আমার উত্তরাধিকারী হওয়া তোমার এক্তিয়ারের ভিতরে পড়ে এমন একটা ধারণা নিয়ে তুমি বড় হয়েছে।
না, কিন্তু সেরকম ভাবতে আপনিই আমায় সাহস যুগিয়েছেন। আপনি আমায় শাহজাহান উপাধি দিয়েছেন এবং লাল তাবু স্থাপনের অধিকার।
‘কিন্তু পরবর্তী মোগল সম্রাট হিসাবে আমি তোমায় মনোনীত করিনি। আমার সন্তানদের ভিতরে আমার উত্তরাধিকারী কে হবে সেই সিদ্ধান্ত আমি নেব। দাক্ষিণাত্যে তোমার উদ্ধত আচরণের কথা আমার কানে এসেছে, কীভাবে তুমি ইতিমধ্যে এমন আচরণ শুরু করেছিলে যেন সিংহাসন তুমি পেয়ে গেছো…’
‘এসব কার কাছে শুনেছেন?”
‘আমি তোমায় আগেই বলেছি আমায় পাল্টা প্রশ্ন করবে না। তুমি যেভাবে আগ্রায় ফিরে এসেছে এবং জোর করে যেভাবে নিজেকে আমার সামনে হাজির করেছে তাতে তোমার অহঙ্কার, হঠকারী আর বেপরোয়া উচ্চাকাঙ্খ সম্বন্ধে আমি যা কিছু ভয় করেছিলাম সবকিছুকে কি প্রমাণিত করে নি? জাহাঙ্গীরের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকে। খুররম যখন তাঁর দিকে তাকায় তার মনে হয় যেন তাঁর আব্বাজান একজন অচেনা আগন্তুকে পরিণত হয়েছেন। সে আশা করেছিল একটা সময়ে তিনি যেমন তাকে ভালোবাসতেন সে তার সেই ভালোবাসাকে পুনরায় জাগ্রত করবে কিন্তু তার উপস্থিতি মনে হচ্ছে তাকে কেবল ক্রুদ্ধ করে তুলছে। একটা অসহায়, হতাশ অনুভূতি যার অভিজ্ঞতা যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর কখনও হয়নি ধীরে ধীরে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নেয় শেষ একবার অনুরোধ করবে।
