‘যুবরাজ, সতর্ক থাকবেন। আবেগের সাথে যেন ভাবনাও আপনার কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করে। আপনি যদি আবেগকে যুক্তির উপরে স্থান দেন আপনার পরাজয় তাহলে কেউ আটকাতে পারবে না। দূতমহাশয়ের সতর্কবাণী সবসময়ে মনে রাখবেন। মেহেরুন্নিসার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। সে যতটা ধূর্ত ঠিক ততটাই নির্ভীক।
‘আসফ খান, উদ্বিগ্ন হবেন না। আমি এখন অন্তত জানি কে আমার শত্রু–আর সে কতটা ভয়ঙ্কর। যুদ্ধক্ষেত্রে আমার মানসিক অবস্থা যেমন থাকে তার চেয়ে বেশি আবেগ আমি নিজের ভেতরে প্রশ্রয় দেবো না। আমি আব্বাজানের জন্য পরিচালিত কোনো অভিযানে আজ পর্যন্ত পরাজিত হইনি। আমি এখন তার এই স্ত্রীকে আমাকে পরাস্ত করার সুযোগ দেবো না।
*
‘যুবরাজ, আমি দুঃখিত, সম্রাট আদেশ দিয়েছেন যে তাকে যেন বিরক্ত করা না হয়।
মাজিদ খান, আমি জানি আপনি আমার আব্বাজানের একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী। তাঁর উজির হবার কারণে আপনি অবশ্যই সর্বান্তকরণে তার স্বার্থের বিষয়টা বিবেচনা করবেন, একই সাথে সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষা করাও আপনার দায়িত্ব। আমার আর আব্বাজানের মাঝে একটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে যা মোটেই আমার দ্বারা সৃষ্ট নয়। আমি যদি তার সাথে নিভৃতে কয়েক মুহূর্ত সময় অতিবাহিত করতে পারি আমি নিশ্চিত যে আমি তাঁর মন থেকে আমার আনুগত্যের ব্যাপারে যাবতীয় সংশয় দূর করতে এবং আমাদের সম্পর্কের মাঝে জন্ম নেয়া দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে পারবো।’
উজির খুররমের বাম কাঁধের উপর একটা নির্দিষ্ট স্থানের দিকে তাকিয়ে থাকবার সময় তার লম্বা, কৃশকায় মুখমণ্ডলে চিন্তার ছাপ ফুটে থাকে। খুররম ভাবে, লোকটা জানে আমি ঠিক কথাই বলেছি, কিন্তু সে মনে মনে কৌতূহলী হয়ে উঠে লোকটা ম্রাজ্ঞীর আদেশের বিরোধিতা করে কিনা দেখতে। সে মাজিদ খানের বাহু আঁকড়ে ধরে, তাকে তার দিকে সামান্য ঘোরায় এবং তাঁর চোখের দিকে তাকাতে তাকে বাধ্য করে। আব্বাজান আমাকে ডেকে পাঠাবেন সেজন্য আমি আজ নিয়ে তিনদিন অপেক্ষা করছি। আমি খসরু নই। আমি ষড়যন্ত্র করি নি এবং আব্বাজানের সিংহাসন দখলের কোনো পরিকল্পনা আমার নেই। মাজিদ খান, আপনি সেটা নিশ্চয়ই জানেন। আমি আমার প্রিয়তমা স্ত্রী আর সন্তানদের নামে দিব্যি দিয়ে বলছি যে আমি কেবল ন্যায়বিচারের প্রত্যাশী। দেখুন…’ খুররম উজিরের হাত ছেড়ে দেয় এবং এক পা পিছিয়ে এসে কোমরের পরিকর থেকে নিজের বাঁকানো খঞ্জরটা বের করে সেটা বিস্মিত মাজিদ খানের হাতে তুলে দেয়। এটা আপনার কাছে রাখেন–এবং সেই সাথে আমার তরবারি।’
না, না, যুবরাজ। উজিরকে এবার পুরোপুরি অসহায় দেখায়। আপনার অভিপ্রায় সম্বন্ধে আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তারপরে নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে, যেন ভীত যে দূর্গে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষেও কেউ আড়িপেতে থাকতে পারে, তিনি তাঁর কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনেন এবং বলেন, যুবরাজ, প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় সম্রাট নিয়মিত দূর্গপ্রাকারে তার কবুতরের খোপের কাছে তাঁর পাখিদের ফিরে আসা দেখতে যান। কবুতরগুলো ভয় পেতে পারে ভেবে তিনি সেখানে যাবার সময় সাথে কোনো প্রহরী বা পরিচারক রাখেন না। সম্রাজ্ঞী কখনও কখনও তার সাথে থাকেন কিন্তু আজ রাতে তিনি সম্রাটের বাসস্থানে একটা বিশেষ বিনোদনের আয়োজন করেছেন এবং তিনি, আমি নিশ্চিত, ব্যক্তিগতভাবে পুরো আয়োজনের তদারকি করবেন।
*
পশ্চিমের আকাশ গোলাপি বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে খুররম যখন দূর্গের একেবারে পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত একটা সংকীর্ণ, খাড়া সিঁড়ি বেছে নিয়ে সেখান দিয়ে দূর্গপ্রাকারের উদ্দেশ্যে উঠতে শুরু করে যেখানে ছেলেবেলায় সে আর তার ভাইয়েরা একসময় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতো। মাকড়সার জাল আর ধূলো দেখে বোঝা যায় যে আজকাল খুব কম লোকই সিঁড়িটা ব্যবহার করে এবং সে কারো কৌতূহলের উদ্রেক না ঘটিয়ে, বস্তুতপক্ষে সবার অলক্ষ্যে দূর্গপ্রাকারে পৌঁছে যায়। সে তাঁর সামনে প্রায় একশ গজ দূরে চোঙাকৃতি কবুতরের খোপ দেখতে পায় এবং তার পেছনে একটা খিলানাকৃতি দরজার ভিতর দিয়ে একটা প্রশস্ত সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে সে জানে নিচের রাজকীয় আঙিনায় গিয়ে সিঁড়িটা শেষ হয়েছে। সে নিজের চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখে কোথাও একজন প্রহরীও নেই।
সে কবুতরের খোপের আরেকটু কাছে এগিয়ে যায় তারপরে কি মনে করে সামান্য পিছিয়ে এসে ছায়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করে। সে নিচের আঙিনায় মশাল আর তেলের প্রদীপ জ্বালাবার সময় পরিচারকদের গলার আওয়াজ শুনতে পায়। সে তারপরে অন্ধকার হয়ে আসা আকাশের বুকে সহসা আলোর একটা ঝলকানি দেখতে পায় যার মানে দেওয়ানি আমের পাশের প্রধান আঙিনায় অবস্থিত অতিকায় আকাশ দিয়া–বিশ ফিট উঁচু একটা সোনালী দণ্ডের মাথায় অবস্থিত একটা বিশালাকৃতির তেলপূর্ণ পাত্র-জ্বালানো হয়েছে। দৃশ্যটা তার মাঝে আকষ্মিক একটা বেদনার জন্ম দেয়। প্রদীপের আলোর কমলা রঙের আভা থেকে শুরু করে রাতের বাতাসে ভাসতে থাকা ধূপের গন্ধ, সবকিছু কত পরিচিত। এটাই তাঁর পৃথিবী, তার স্থান যেখানে তাঁর থাকবার কথা। তারপরে খিলানাকৃতি দরজার নিচে দিয়ে খালি-মাথায় দীর্ঘদেহী একটা অবয়ব আন্দোলিত আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় উপস্থিত হয় এবং কবুতরের খোপের দিকে এগিয়ে আসে।
