রো’র মুখে প্রথমবারের মত হাসির আভাস ফুটে উঠে। না। আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি তাকে ইংল্যান্ডে ফিরে যাবার জন্য রাজি করাতে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। যুবরাজ, আপনি যদি তাকে কাজে নিযুক্ত না করেন, আমি দরবারে আমার কোনো পরিচিত জনকে তাঁর বিষয়ে অনুরোধ করে দেখবো।
*
আসফ খানের স্বভাবজাত প্রাণবন্ত মুখমণ্ডল শান্ত দেখায় কথাগুলো শোনার সময়। খুররম কথা শেষ করার পরে, তিনি উত্তর দেয়ার আগে কিছুক্ষণ সময় নেন। নিজের বোন সম্পর্কে এই মন্তব্য করাটা আমার পক্ষে কষ্টকর কিন্তু আমার মনে হয় দূতমহাশয় ঠিকই অনুমান করেছেন। মেহেরুন্নিসা আপনার শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। শাহরিয়ারকে সামনে রেখে সে একদিন শাসনকার্য পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেছে এবং আপনি তাঁর পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। দূতমহাশয় যেমনটা বলেছেন, লোকজন দরবারে ক্ষমতার প্রতি তাঁর মোহের বিষয়ে আলোচনা করতে আরম্ভ করেছে।
খুররম তাঁর দস্তানা পরা হাত দিয়ে সে যে স্তম্ভের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল সেটায় আঘাত করে। আমার আব্বাজান এতটা অন্ধ হন কীভাবে? এসব আলোচনার কথা কি তিনি জানেন না?
‘তিনি অবশ্যই এসব বিষয়ে অবগত কিন্তু এসব বিষয় উপেক্ষা করবেন বলে স্থির করেছেন। একমাস আগের কথা, মোল্লা শেখ হাসান শুক্রবার মসজিদে জুম্মার নামাযে নসিহত প্রদান করার সময় সম্রাট রাজকীয় আদেশ জারি করতে সম্রাজ্ঞীকে অনুমতি দেয়ায় তার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি দাবি করেন একজন মহিলার এটা করার কোনো অধিকার নেই। তিনি সুরাপানের জন্য সম্রাটের সমালোচনা করেন, আপনার আব্বাজানের মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে রাখার জন্য এই অভ্যাসকে দোষারোপ করেন এবং ধর্মীয় পরামর্শদা, উলেমাদের, সভায় অংশ নেয়ার সময় তাকে ঘুমিয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। মেহেরুন্নিসা সেই মোল্লাকে চাবকাতে চেয়েছিল কিন্তু সম্রাট সেবারের মত তাকে বিরত করেন এবং বিক্ষোভের পুরো বিষয়টা একেবারে উপেক্ষা করেন। মেহেরুন্নিসার বিরুদ্ধে কেবলমাত্র মোল্লারাই ক্ষুব্ধ হননি। সেনাপতিদের বেশ কয়েকজন–বিশেষ করে, গোয়ালিয়রের শাসক, ইয়ার, মোহাম্মদের মত বয়োজ্যেষ্ঠ অনেকেই আমার কাছে অভিযোগ করেছে। যে তাঁদের কাছে প্রেরিত আদেশে সম্রাটের চেয়ে আজকাল তাঁর সীলমোহরই বেশি সংযুক্ত থাকে, অবশ্য তারা তাদের এই অসন্তোষ একান্ত আলাপচারিতার সময় ব্যক্ত করেছে। সম্রাটের সামনে একজন সাহস করে এ বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলায় পরেরদিন বাংলার জলাভূমির জ্বরজ্বালা অধ্যুষিত প্রদেশের একটা বসতিতে নিজের পদোন্নতি হয়েছে দেখতে পায়।’
একটু আগেই সন্ধ্যা হয়েছে। রো বিদায় নেয়ার পরে খুররম বৃথাই আব্বাজানের কাছ থেকে তাঁর দূর্গে যাবার শমন আগমনের জন্য অপেক্ষা করে। সে সারাদিন রো’র কথাগুলো নিজের মনে বারবার উল্টেপাল্টে দেখে, প্রতিবারই কথাগুলো আগের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়। সশরীরে দূর্গে উপস্থিত হয়ে জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করার দাবি জানাতে সে যখন নিজের ঘোড়া নিয়ে আসতে বলবে সেই সময়ে আসাফ খানের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার কথা তার মাথায় আসে। নিজের বোনের মনে কি রয়েছে সে বিষয়ে তার চেয়ে ভালো আর কারো জানবার কথা নয়, এবং আরজুমান্দের আব্বাজান হবার কারণে নির্দ্বিধায় তাকে বিশ্বাস করা যায়।
‘আমার ক্ষতি করতে গিয়ে মেহেরুন্নিসা আরজুমান্দ আর আমাদের সন্তানদের অমঙ্গল সাধন করতে পারে। তার কাছে কি এর কোনো মূল্যই নেই?
না। জাহাঙ্গীরের ভালোবাসা অর্জন করার পরে, নিজের স্বার্থের বিষয়ে সে প্রথমে চিন্তা করে এবং তারপরেই কেবল নিজের মেয়ের কথা সে ভাবে। সে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহ্য করবে না… সে যেই হোক। তুমি দরবার থেকে দূরে ছিলে। আমি যা উপেক্ষা করতে অপারগ ছিলাম তুমি সেসব কল্পনাও করতে পারবে না। সে সম্রাটকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। আমি যদিও আগ্রা সেনানিবাসের প্রধান সেনাপতি, আজকাল কদাচিত আমি তাকে দেখতে পাই। এমনকি আমার সাথে তাঁর যখন দেখা হয়, মেহেরুন্নিসা সবসময়ে সেখানে উপস্থিত থাকে। অন্য সেনাপতিদের মত আমায় প্রদত্ত আদেশও সেই জারি করে। তাকে দেয়া জাহাঙ্গীরের নতুন খেতাবের সীলমোহর সেসব আদেশে জ্বলজ্বল করে। আমার বোন এখন আর কেবল “নূর মহল”, “প্রাসাদের আলো” নয়–তোমার আব্বাজান তাকে নতুন খেতার দিয়েছে “নূর জাহান”, “জগতের আলো”। গিয়াস বেগের কি মনোভাব?
তার উপরে এমনকি তারও কোনো প্রভাব নেই। রাজকীয় কোষাগারের নিয়ন্ত্রক হবার কারণে, তিনি ভালো করেই জানতেন বাদখপুর জায়গীর তোমাকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি করা হয়েছে। মেহেরুন্নিসার কাছে তিনি যখন এর কারণ জানতে চান কেন সেটা শাহরিয়ারকে দেয়া হয়েছে তিনি তাকে কড়া ভাষা বলেন এ বিষয়ে তাঁর মাথা না ঘামালেও চলবে। আমার আব্বাজান একজন নরম স্বভাবের মানুষ। আমি কখনও ভাবিনি যে তাকে এতটা ক্রুদ্ধ দেখতে পাব।’ আসফ খান কথা শেষ করে কিছুক্ষণ নিরবে বসে থাকেন, তারপরে জানতে চান, আপনি এখন কি করতে চান?
‘এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। আমি আমার আব্বাজানকে বাধ্য করবো আমার সাথে দেখা করতে, তিনি দেখা করতে চান বা না চান। আমি তাকে বোঝাব যে সম্রাজ্ঞী আমার নামে তাঁর কানে বিষ ঢালছে এবং এটাও যে আমি এখনও তার সেই বিশ্বস্ত সন্তানই রয়েছি। আমি দরবার থেকে অনেকদিন দূরে রয়েছি। তিনি আবার যখন আমায় দেখতে পাবেন আমার জন্য তার ভালোবাসা পুনরায় জাগ্রত হবে।’
