খুররম অপলক দৃষ্টিতে দূতমহাশয়ের আন্তরিক মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে থাকে, চাঁদোয়ার নিচে ছায়ায় অবস্থান করার পরেও তার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে। রো এখন পর্যন্ত যা কিছু বলেছে সবই অসম্ভব, কিন্তু তারপরেও… আমার আব্বাজান কখনও তাকে এভাবে প্রভাবিত করার অনুমতি নিজের স্ত্রীকে দেবেন না, সে মন্থর কণ্ঠে বলে, যতটা না দূতমহাশয়ের উদ্দেশ্যে তাঁর চেয়ে বেশি যেন নিজেকেই শোনায়।
‘আপনার আব্বাজান বদলে গিয়েছেন। শাসনকার্য তাঁর কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। আপনি তার যেকোনো পরামর্শদাতাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। সম্রাজ্ঞী তাকে কাজ থেকে বিরত থেকে, প্রকৃতি সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহের উত্তর খুঁজতে তাকে প্ররোচিত করেন যা তাকে ভীষণভাবে ব্যস্ত রাখে, তাকে সুরাপান আর আফিম গ্রহণে প্ররোচিত করেন… তিনি সম্রাটকে পুরোপুরি নিজের উপরে নির্ভরশীল করে ফেলেছেন এবং তাঁর আস্থাকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অপব্যবহার করছেন।
‘আপনি বলছিলেন আপনি এখন আর আমার আব্বাজানের প্রিয়পাত্র নন। কি হয়েছিল?
‘আমি ঠিক নিশ্চিত নই। একটা সময় ছিল যখন সম্রাটের সাথে আমি প্রচুর সময় কাটিয়েছি। আমি যখন প্রথমবার অসুস্থ হই, তিনিই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন, উপশমের বিষয়ে নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন এমনকি নিজের ব্যক্তিগত হেকিমকে একবার আমার চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমার প্রতি তার আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পায়। কিছুদিনের ভিতরেই আমি যখন সুস্থ থাকতাম তাঁর ডেকে পাঠাবার হার ক্রমশ পূর্বের চেয়ে হ্রাস পেতে থাকে এবং একটা সময় বন্ধই হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে কেবল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেই তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছে।
‘আমার আব্বাজান সম্ভবত আপনাদের বাণিজ্য শুল্ক হ্রাসের অনুরোধে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। খুররম রো’র অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারে তাঁর মন্তব্য একেবারে জায়গামত আঘাত হেনেছে এবং সে কথা চালিয়ে যায়।
‘আপনি আমাকে সতর্ক করার সম্ভষ্টির কথা বলছিলেন। স্যার টমাস, কেন? আমার আব্বাজান তাঁর কোনো সন্তানকে প্রশ্রয় দেবেন সেটা নিয়ে আপনার কেন এত আগ্রহ?
‘আমার কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ মক্কায় হজ্জযাত্রী পরিবহণে পর্তুগীজ আর আরব জাহাজের সাথে ইংরেজ জাহাজকে অনুমতি দিতে আমার অনুরোধ সম্রাট প্রত্যাখান করেছেন। আমার রাজা এতে দারুণ আশাহত হবেন। আপনার আব্বাজান যদি অনুমতি দিতেন তাহলে আরো অনেক ইংরেজ জাহাজ সুরাটে আসতো এবং সেখানে অবস্থিত আমাদের বাণিজ্য কুঠি তাহলে সমৃদ্ধি লাভ করতো। ইংল্যান্ড থেকে আমাদের জাহাজগুলো তাহলে আরো বেশি পরিমাণে পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসতে পারতো এবং সেই সাথে হিন্দুস্তান থেকে আরবে বাণিজ্যের সাথে সাথে হজ্জযাত্রীদের বহন করতে পারতো কিংবা দেশে আরো বেশি পরিমাণে এখানের পণ্য নিয়ে যেতে পারতো। বাণিজ্য হওয়া উচিত প্রতিটা সভ্য দেশের আদর্শ এবং মোগল সাম্রাজ্যের সাথে ইংল্যান্ডের বাণিজ্য বিপুলভাবে সমৃদ্ধি লাভ করতো।
খুররম ভাবে, বাণিজ্যের জন্য ফিরিঙ্গিগুলোর এই উৎসাহের বিষয়টা সে হয়তো কোনোদিনই ঠিকমত বুঝতে পারবে না। রো একজন অভিজাত ব্যক্তি কিন্তু তিনি যখন ব্যবসার লাভ নিয়ে কথা বলেন তখন বাজারের মামুলি যেকোনো ব্যবসায়ীর মত তাঁর চোখ মুখ চকচক করতে থাকে। দৃতমহাশয় উত্তেজনার বশে হাত থেকে নিজের লাঠিটা ফেলে দেয় এবং তিনি ঝুঁকে সেটা তুলে নেয়ার আগেই কথা বলতে শুরু করে।
‘আমি বড় আশা করে এসেছিলাম যে নিজেকে রক্ষা করতে আমার তথ্য আপনাকে সাহায্য করবে… যে আপনি পরবর্তীতে মনে রাখবেন যে একজন ইংরেজ আপনাকে সতর্ক করেছিল এবং কৃতজ্ঞ বোধ করবেন… এবং একদিন আপনি যখন সম্রাট হবেন, আমি আশা করি এবং বিশ্বাস করি আপনি হবেন, তখন আমার মাতৃভূমির দাবি আপনার সুনজরে থাকবে।
‘নিজেকে রক্ষা করা বলতে আপনি ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন?
‘সম্রাজ্ঞী নিজে একবার যখন এই সর্বনাশা খেলায় নেমেছেন তখন তিনি যতক্ষণ না আপনার এবং আপনার আব্বাজানের মাঝে একটা প্রকাশ্য বিরোধের সৃষ্টি করতে পারছেন–এমনকি যুদ্ধের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না–ততক্ষণ তিনি বিরত হবেন না। খুররমের চোখে মুখে ততক্ষণ সন্ধিগ্ধ অভিব্যক্তি দেখে রো হতাশ ভঙ্গিতে নিজের মাথা নাড়ে। যুবরাজ, আমি এতক্ষণ আপনাকে যা বলেছি তা একটু ভেবে দেখবেন। আমি আপনাকে দিব্যি দিয়ে বলতে পারি যে আমি একটা কথাও মিথ্যা বলিনি। আপনি যদি আমার কথা উপেক্ষা করেন তাহলে আখেরে আপনারই ক্ষতি হবে।
খুররমের মনের অবিশ্বাসের মেঘ ভেদ করে প্রথমবারের মত রো’র আন্তরিক কণ্ঠস্বর, তাঁর আবেগপূর্ণ প্রত্যয় প্রবেশ করে। মেহেরুন্নিসা… তাঁর পক্ষে কি আসলেই এমনটা করা সম্ভব–কোনো অবাধ্য কর্মচারী কিংবা উচ্চাকাঙ্খি অমাত্যর পরিবর্তে–যে আব্বাজানকে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে? তিনি যদি আসলেই তার শত্রুতে পরিণত হয়ে থাকেন তাহলে প্রতিটা হতবাক করে দেয়া ঘটনা এতদিন যার কোনো ব্যাখ্যা ছিল না সবকিছুই অর্থবহ হয়ে উঠে। আমি বুঝতে পারছি না আপনাকে আমার বিশ্বাস করা ঠিক হবে কিনা, কিন্তু আপনি যা বললেন সে বিষয়ে আমি ভেবে দেখবো।
‘আমি এতক্ষণ আপনাকে ঠিক এই কথাটাই বলতে চেয়েছি, সেই সাথে অবশ্য একটা অনুরোধও আছে। আমি আগেই বলেছি, আমি শীঘ্রই ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে জাহাজে উঠবো কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পরিচারক নিকোলাস ব্যালেনটাইন হিন্দুস্তানে থেকে যেতে চায়। সে খুবই বিশ্বস্ত এবং বুদ্ধিমান আর যেকোনো মনিবের অধীনে কাজ করতে সক্ষম। আপনি কি অনুগ্রহ করে তাকে আপনার গৃহস্থালীর কোনো কাজে নিয়োজিত করবেন? যাতে গোপনে পর্যবেক্ষণ করতে এবং ইংল্যান্ডে আপনাকে সবকিছু লিখে জানাতে পারে?
