রেশমের চাঁদোয়ার নিচে একটা নিচু কাঠের আসনে বসার জন্য খুররম রো’কে ইঙ্গিত করে এবং পরিচারকদের তাকিয়া নিতে আসবার জন্য আদেশ দেয়। সে দূতমহাশয়কে কখনও পছন্দ করতো না–সব বিদেশী যারা দরবারে এসে সমবেত হয়েছে তাদের সবাইকে সে অবিশ্বাস করে এবং এই নমুনার প্রতি তাঁর আব্বাজানের আগ্রহ তাঁর কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছে–কিন্তু লোকটার শারীরিক অবস্থা তাঁর সৌজন্যতাবোধের দাবি করে। রো সতর্কতার সাথে আসনের উপরে নিজেকে উপবিষ্ট করে এবং এটা করার সময়েই যন্ত্রণায় তাঁর চোখমুখ কুঁচকে যায় এবং কোনোভাবেই নিজের মুখ থেকে মৃদু গোঙানির আওয়াজ নিঃসৃত হওয়া বন্ধ করতে পারে না। যুবরাজ, আমি দুঃখিত। আমার পাকস্থলী আমাকে বেশ কষ্ট দিচ্ছে। আমার পাকস্থলীই কেবল না, দূতমহাশয় যন্ত্রণায় বাঁকানো মুখে ভাবে। তার পেটের নাড়িভুড়ি এখনও পীড়ন করছে। একটা সপ্তাহও ভালোমত অতিক্রান্ত হতে পারে না তার আগেই তারা আমাশয়ে আক্রান্ত হয়, এবং সে এখন অর্শরোগের কারণে বিব্রত- ইংল্যান্ডে বাড়িতে স্ত্রীর কাছে তাঁর ক্রমশ নালিশ করার স্বভাব লাভ করা চিঠিতে সে তাদের আমার পান্না বলে অভিহিত করে। সে অবশ্য এসব কিছুই এই তরুণ অহঙ্কারী যুবরাজের কাছে বলবে না। আলোচনার জন্য আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। খুররম দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরে আসছে শোনার পর থেকেই সে তার সাথে দেখা করবে কিনা সেটা নিয়ে যুক্তির জাল বুনছে। তাঁদের আলোচনাটা বেশ কষ্টসাধ্য হবে কিন্তু আলোচনাটা করা তাঁর নিজের দেশ, নিজের সম্রাটের প্রতি তার দায়িত্ব।
‘যুবরাজ, আমার যা বলার আছে আমি সেটা কেবল আপনাকেই বলতে চাই।’
‘আমাদের একা থাকতে দাও, খুররম তাঁর পরিচারকদের আদেশ দেয়, এবং তাঁর দিকে ঝুঁকে আসে। কি বলতে চান?
রো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিশ্চিত হতে যে আসলেই চারপাশে আর কেউ নেই। যুবরাজ, আপনি আগ্রা ফিরে আসবার পরে এত দ্রুত আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি বলে আমায় মার্জনা করবেন কিন্তু আপনার সাথে আমার দেখা হওয়াটা ভীষণ জরুরি ছিল। আপনার আব্বাজানের দরবারে আমি যদিও একজন বহিরাগত, কিন্তু আপনাদের এখানে অবস্থান করার সময় আমি আপনাদের ভাষা আয়ত্ত্ব করেছি এবং দরবারের অমাত্যদের অনেকের সাথে বন্ধুত্ব করার সুযোগ আমার হয়েছে। আমি আপনার আব্বাজানের অনুগ্রহ কিছু সময়ের জন্য উপভোগ করেছিলাম। বস্তুতপক্ষে, একটা সময়ে আমার মনে হত যে তিনি আমাকে তার একজন বন্ধুর চোখে দেখেন…’
তিনি কি তাহলে আপনাকে এখানে প্রেরণ করেন নি? ভাবনাটা সহসা খুররমের মনে উঁকি দেয়।
না। আমি তার নয়, আমার নিজের কৈফিয়ত দেয়ার জন্য এসেছি, আপনার আব্বাজানের নয়। সত্যি কথা বলতে, বেশ কিছুদিন যাবত তাঁর সাথে আমার একান্ত মোলাকাত হয়নি। আমি আপনাকে যা বলতে চাইছি তা আপনার কাছে হয়ত অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে কিন্তু আমার কথা বিশ্বাস করার জন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।’ রো তার দুই হাত নিজের হার ছড়ির উপর রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নিসার ব্যাপারে সাবধান থাকবেন। তিনি এখন আর আপনার বন্ধু নন। বাস্তবিক পক্ষে তিনি এখন আপনার শত্রু।
‘মেহেরুন্নিসা? ইংরেজ হতভাগার কি দেহের সাথে সাথে মস্তিষ্কবিকৃতিও শুরু হয়েছে? তাঁর এই উদ্ভট অভিযোগ বা সেটা করার সময় তার অসহিষ্ণুতা আর কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। আপনি ভুল করছেন, কামরান শীতল কণ্ঠে বলে। সম্রাজ্ঞী সম্পর্কে আমার স্ত্রীর ফুপুজান–আমার সন্তানদের পিতামহী। পারিবারিক বন্ধনের সাথে সাথে আমার স্ত্রীর প্রতি তার ভালোবাসার কারণে আমি জানি এটা অসম্ভব একটা ব্যাপার।
‘যুবরাজ, আমার কথা ভালো করে শোনেন। আমি শীঘ্রই ইংল্যান্ডে আমার স্বদেশে ফিরে যাচ্ছি। আমার শরীরের পক্ষে আর এখানকার আবহাওয়ার অত্যাচার সহ্য করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি দেশে ফিরে যাবার সময় অন্তত এটুকু সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে যেতে চাই যে আমি আপনাকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলাম যদিও আপনি আমার কথায় কর্ণপাত করেন নি। আপনি একটা কথা মনে রাখবেন যে বিদেশী হবার কারণে আমি আপনাকে এমন কথা অবলীলায় বলতে পারি যা মোগল কোনো অমাত্য আপনাকে বলার সাহস করবে না। আপনার আব্বাজান কেন আপনার উপর বিরূপ হয়েছেন নিজেকে কেবল এই একটা প্রশ্নই করেন… নিজেকে জিজ্ঞেস করেন কেন তিনি শাহজাদা শাহরিয়ারকে আজকাল বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছেন…’।
খুররম দূতমহাশয়ের অকপট কথায় চমকে উঠে। আমাদের মাঝে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির জন্ম হয়েছে, সে আড়ষ্ট কণ্ঠে বলে।
না। পুরো ব্যাপারটায় সম্রাজ্ঞীর নিজের হাত রয়েছে। তিনি নিজেকে ভীষণ চতুর মনে করলেও দরবারের অনেকেই তাঁর দুরভিসন্ধি আঁচ করতে পেরেছে। আপনি যখন দাক্ষিণাত্যে ছিলেন তখন তিনি শাহজাদা শাহরিয়ারকে সম্রাটের সুনজরের আনতে তাঁর সাধ্যের ভিতরে যা কিছু রয়েছে সবকিছুই করেছেন। আমি পুরো বিষয়টা নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি এবং নিজেকে প্রশ্ন করেছি কেন। শাহজাদা নিজে এমন কোনো বিশেষ যোগ্যতা বা প্রতিভার অধিকারী নয় এবং–যুবরাজ, আমায় মার্জনা করবেন, আপনার সৎ-ভাই সম্বন্ধে এমন মন্তব্য করেছি বলে–আমার কানে এমন কথাও এসেছে যে তিনি নাকি খানিকটা স্থূলবুদ্ধির। সম্রাজ্ঞীর নিজের মেয়ের সাথে বাগদানের বিষয়টা যখন আমার কানে আসে, পুরো ব্যাপারটা আমার সামনে দিনের মত পরিষ্কার হয়ে যায়। সম্রাজ্ঞী ক্ষমতার জন্য লালায়িত। আপনি সম্ভবত জানেন না তিনি নিজে কত আদেশ জারি করেন, কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অনেকে তাকে পর্দার অন্তরালবর্তিনী সম্রাট হিসাবে অভিহিত করে থাকে। তিনি সম্রাটকে দিয়ে শাহরিয়ারকে–আপনি নন–তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা করতে প্ররোচিত করছেন। আপনার আব্বাজানের ইন্তেকালের পরে তিনি হিন্দুস্তান শাসন করবেন। শাহজাদা শাহরিয়ার আর শাহজাদী তার ক্রীড়ানকে পরিণত হবে।
