“ফারগানার ন্যায়সঙ্গত সুলতান, আমি বাবর তোমাকে আদেশ দিচ্ছি অস্ত্র নামিয়ে রাখো।”
“আমি আত্মসমর্পন করবো না। তোমাকে আমি সুলতান বলে মানি না। আমার নাম হানিফ খান। আমি তামবালের প্রতি অনুগত, সেই এখন পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। পারলে সম্মুখ যুদ্ধে আমাকে পরাস্ত করো।”
বাবর তার কালা পাহাড়ের উপর থেকে লাফিয়ে নামে এবং আলমগীর হাতে ধরা অবস্থায় হানিফ খানের দিকে এগিয়ে যায়। যে তক্কে তক্কে ছিলো বাবর তার। কাছাকাছি যেতেই হাতের বর্শা দিয়ে সে বাবরকে আঘাতের চেষ্টা করে। বাবর লাফিয়ে একপাশে সরে যায়। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে অর্ধভুক্ত খাবারে ভর্তি একটা নিচু টেবিলের পায়ার সাথে তার বাম পা আটকে যায়। বেকায়দা ভঙ্গিতে সে টেবিলের উপরে আছড়ে পড়ে। টেবিলের উপরে থাকা কাঠের পেয়ালা আর তার ভেতরের খাবার ছিটকে ফেলে। মাংসের সুরুয়া অর্ধেকটা ভর্তি একটা বিশাল ধাতব পাত্রের মুখে তার তরবারি ধরা হাতের কব্জি আটকে যেতে, আলমগীর তার মুঠো থেকে ছুটে যায়।
হানিফ খান বাবরের অসহায় অবস্থার সুযোগে তাকে একেবারে শেষ করে দেবার জন্য ছুটে আসে। তার বর্শাটা দু’হাতে মাথার উপরে তুলে বাবরের উন্মুক্ত গলায় সেটা সর্বশক্তিতে নামিয়ে আনবে। বাবর একটা কাঠের বড় বারকোশ তখন তুলে নিয়ে সেটাকে ঢালের মত ব্যবহার করে। বর্শা বারকোশে বিদ্ধ হয়। তবে সেটাকে ছিন্ন করতে পারে না। ছিটকে পড়া খাবারের উষ্ণ চটচটে সুরুয়ার ভিতরে গড়িয়ে একপাশে সরে যাবার সময়ে সে বারকোশটা ফেলে দিয়ে বর্শার হাতল ধরে মোচড় দেয় এবং হানিফ খানের হাত থেকে সেটা টেনে নেয়।
বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে হানিফ খান, লাফিয়ে পেছনে সরে গিয়ে কোমরের পরিকর থেকে একটা সরু খঞ্জর টেনে বের করে। আলমগীর কোথায় পড়েছে সেটা দেখার সময় নেই বাবরের, হাতের বর্শাটা দিয়ে সে লোকটাকে সজোরে আঘাত করলে ফলার মাথায় আটকানো বারকোশটা খুলে পড়ে। আর একই সময়ে, নিজের গালে সে একটা তীক্ষ্ণ ব্যাথা অনুভব করে। হানিফ খান বাবরের গলা লক্ষ্য করে খঞ্জরটা চালিয়েছিলো কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। বাবর এবার বশার ফলাটা সজোরে তাকে লক্ষ্য করে আঘাত করে হানিফ খান একপাশে ঘুরে আঘাতটা এড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু ফলাটা তাকে বামদিকে স্পর্শ করলে সে টেবিলের পাশে রাখা শক্ত কুশনের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বাবর এবার বর্শাটা মোচড় দেয় এবং মুহূর্ত মাত্র চিন্তা না করে প্রতিপক্ষের কণ্ঠনালী লক্ষ্য করে সজোরে বর্শাটা নামিয়ে এনে গালিচার উপরে তাকে গেথে ফেলে। যা অচিরেই ফিনকি দিয়ে রক্তে ভিজে লাল হয়ে যায়।
ইতিমধ্যে ওয়াজির খান, বাইসানগার আর বাকী লোকেরা এসে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে তার সাহসিকতার জন্য তাকে শুভেচ্ছা জানায়। দূর্গটা এখন তাদের দখলে। ফারগানা উদ্ধারের বন্ধুর পথে সে মাত্র প্রথম পদক্ষেপটা সাফল্যের সাথে রেখেছে। বাইরে বের হয়ে এসে বাবর দেখে আবার তুষারপাত শুরু হয়েছে। শত্রুর পড়ে থাকা দেহের চারপাশের লাল রঙ ইতিমধ্যে অনেকটাই ঢাকা পড়েছে। একটু আগে তামবালের চামচার ভবলীলা সে যেভাবে সাঙ্গ করেছে, সেভাবে পালের গোদাটাকে কখন মুঠোর ভেতরে পাবে সেই মুহূর্তটার জন্য সে অধীর হয়ে রয়েছে।
*
আর এভাবেই পুরো ঘটনাটার সূচনা হয়। বাবর একজন হানাদারে পরিণত হন। ঝটিকাবেগে আক্রমণ করেন এবং ফিরে যাবার সময় প্রতিবারই মৃত শত্রুর কারো একজনের মুখে রক্ত দিয়ে নিজের নাম লেখা একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে যান। আর তার সাফল্য ক্রমশ বাড়তে থাকে। তার বাহিনীর সংখ্যা, মিষ্টি কথা আর মধুর প্রতিশ্রুতি, সেই সাথে শক্তি বা তার অভিযানে প্রাপ্ত সম্পদের বিচক্ষণ ব্যবহার নতুন সমর্থকদের আকৃষ্ট করে এবং প্রতিপক্ষকে দলে টেনে, ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। মাটির দূর্গ দখলের বিশ মাসের মধ্যে, নিষ্ঠা আর একাগ্রতার সাথে একটার পরে একটা ছোট দূর্গ আর গ্রামের পর গ্রাম দখল করে ফারগানার পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশই সে দখল করে নেয়। তার কৌশল কার্যকরী বলে প্রতীয়মান হয়। তামবাল আকশির উত্তর বা পশ্চিমে বাবরের শক্ত ঘাঁটির দিকে বেশিদূর অগ্রসর হবার মতো সাহস দেখায় না। আর বাবরও মনে করে এবার সময় হয়েছে নিজের দাবির কথা প্রকাশ করবার।
প্রথম দাবিটা সে ছয়মাস আগে জানায় এবং তারপরে প্রায়শই তার পুনরাবৃত্তি করেছিলো তার আম্মিজান, নানীজান আর বোনের মুক্তির বদলে এক বছর আকশি দূর্গ আক্রমণ না করবার প্রতিশ্রুতি। তিনমাস আগে তামবাল এক বার্তাবাহকের মাধ্যমে প্রেরিত এক চিঠিতে অনেক মধুর ভাষায় জানায় এসান দৌলত, খুতলাঘ নিগার আর খানজাদা প্রত্যেকেই সুস্থ আছে এবং শাহী পরিবারের উপযুক্ত ব্যবহারই করা হচ্ছে তাদের সাথে। কিন্তু চিঠিতে সে তাদের মুক্তি দেবার তার কোনো অভিপ্রায়ের কথা উল্লেখ করেনি।
বাবর এখন পূর্বদিকে পঞ্চাশ মাইল দূরে অবস্থিত শহর গাভার দিকে অগ্রসর হচ্ছে কিছুদিন আগে তামবাল ভাড়াটে চকরাখ যোদ্ধাদের সহায়তায় সেখানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। সেখানে একটা হিসাব মেলানো এখনও বাকি আছে। সেখানকার দূর্গের চাকরাখ সর্দার তার সৎভাই আর তামবালকে শাহী প্রতিনিধি হিসাবে মেনে নিয়ে প্রথম আনুগত্য প্রদর্শনকারীদের অন্যতম। শহরটা দখল করলে তামবালকে আরেকটা জোরালো সঙ্কেত পাঠানো হবে যে, সময় হয়েছে বাবরের কাছে তার পরিবারকে ফেরত পাঠাবার।
