তাদের পাঠানো গুপ্তদূতেরা রেকী করে ফিরতে যে নব্বই মিনিট সময় লাগে তার পুরোটা সময়ই অবিশ্রান্তভাবে তুষারপাত হয়। কখনও ভারী বা কখনও হাল্কাভাবে। তার লোকেরা ফিরে আসতে দেখা যায়, ঘোড়া আর তার আরোহী তুষারে পুরো ঢেকে গেছে এবং গুপ্তদূতদের দলনেতা ঠাণ্ডায় নীল হয়ে আসা ঠোঁটে কোনোমতে কথা বলে। “এখান দু’মাইল দূরে একটা বাকের পরেই দূর্গটা অবস্থিত। দূর্গের বাইরে আমরা কোনো ঘোড়ার বা পায়ের ছাপ দেখতে পাইনি যাতে বোঝা যায়, আজ ভেতর থেকে কেউ টহল দিতে বা পর্যবেক্ষণ-ফাঁড়িতে যায়নি। আমরা যখন ঘোড়া থেকে নেমে দূর্গের কাছে এগিয়ে যাই, দূর্গের এক অংশ থেকে আমরা ধোয়া উঠতে দেখেছি- সম্ভবত রসুইখানা- কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দূর্গের মূল ফটক তখন ভোলা ছিলো। স্পষ্টতই এই আবহাওয়ায় কেউ আক্রমণ করতে পারে সেই ব্যাপারটা তাদের মাথাতেও নেই।”
“চমৎকার, শীঘ্রই তাদের এই নিশ্চয়তা নরকে পরিণত হতে চলেছে। ওয়াজির খান, এটা ইতস্তত করার সময় না, সবাইকে এই মুহূর্তে প্রস্তুত হতে বলুন এবং তুষারপাতের মাঝে আমরা আত্মগোপন করে গুপ্তদূতদের সহায়তায় দূর্গে পৌঁছাবার পথের শেষ বাঁকে দ্রুত আর নিরবে গিয়ে হাজির হবো। সেখান থেকে মূল ফটকের উদ্দেশ্যে ঘোড়া দাবড়ে যাবো।”
ওয়াজির খান মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় এবং পাঁচ মিনিট পরে অশ্বারোহী বাহিনীর একটা সারিকে মন্থর গতিতে পাহাড়ী পথ বেয়ে উপরের দিকে উঠে যেতে দেখা যায়। তুষারাবৃত প্রেক্ষাপটের মাঝ দিয়ে প্রায় দু’মাইল এগিয়ে যায়। তুষারপাত এখন আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। বাবরের চোখের সামনে একটা পাথুরে অবয়ব ভেসে ওঠে। দূর্গটা আর মাত্র হাজারখানেক গজ সামনে অবস্থিত। এখান। থেকে দূর্গ পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ প্রশস্ত।
“আমরা এখান থেকেই আক্রমণ শুরু করবো। লোকদের বলেন অপ্রয়োজনীয় সবকিছু এখানে পাথরের আড়ালে রেখে কেবল হাতিয়ার নিয়ে প্রস্তুত হতে। যাতে বরফের উপর দিয়ে যতোটা সম্ভব দ্রুত ঘোড়া দাবড়ে আমরা দূর্গে পৌঁছাতে পারি।” তার লোকেরা নিরবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কিন্তু তারা প্রস্তুত হতে হতে তুষারপাত একেবারে বন্ধ হয়ে যায় এবং সামনে- সাদা প্রেক্ষাপটের মাঝে একটা কালো আকৃতির মত দূর্গটা ভেসে উঠে।
“যারা প্রস্তুত, ঘোড়ায় আরোহন করো! কারো চোখে পড়ে যাবার আগেই আমাদের আক্রমণ করতে হবে!” বাবর চিৎকার করে কথাটা বলার ফাঁকে ময়ান থেকে আলমগীর বের করে আনে। সে লাফিয়ে জিনের উপরে উঠে বসে এবং তার বিশাল কালো ঘোড়াটাকে দূর্গের দিকে এগোতে বলে পেটে খোঁচা দেয় যার ফটক সে খোলা দেখতে পেয়েছে। দশজন যোদ্ধা পরিবেষ্টিত অবস্থায় এবং বাকীরা তার পেছনে সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত। ঘোড়ার কাধ ধরে ঝুঁকে ছুটে যাবার সময়ে বাবর টের পায় তার কানে রক্তের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। দূর্গের ফটক থেকে সে যখন মাত্র দুশো গজ দূরে, তখন ভেতর থেকে একটা চিৎকার তার কানে ভেসে আসে- শত্রুরা তাদের দেখে ফেলেছে। ভেতরের লোকেরা বিপদ টের পায়। তারা ফটকের পাল্লা বন্ধ করার চেষ্টা করতে সেটা কেঁপে উঠে। কিন্তু নতুন জমা বরফ পাল্লা নড়তে বাধা দেয়। দু’জন লোক বাইরে ছুটে আসে, বরফের স্তূপে লাথি দেয় এবং বৃথাই চেষ্টা করে পাল্লাটা বরফের উপর দিয়ে সরাতে।
“ব্যাটাদের পেড়ে ফেলো!” বাবর হুঙ্কার দিয়ে বলে। কিন্তু ঘোড়ার গতি বিন্দুমাত্র হ্রাস করে না। নিমেষের ভিতরে সে একজনকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে, একটা তীর তার গলায় বিদ্ধ হয়েছে। একই সাথে সে নিজেও দূর্গের তোরণদ্বারের কাছে পৌঁছে যায়। দ্বিতীয় লোকটাকে সে আলমগীর দিয়ে একটা কোপ বসিয়ে দেয়। টের পায় তার তরবারি জায়গা মতোই নরম মাংসপেশীতে কামড় বসিয়েছে। কিন্তু কোথায় সেটা দেখবার জন্য সে ঘোড়ার গতি একটুও হ্রাস করে না। তার বদলে, সে তার হাতে ধরা লাগামে একটা ঝাঁকি দিয়ে ঘোড়ার মাথা তখনও আংশিক খোলা ফটকের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। বিশাল কালো ঘোড়াটা নাক দিয়ে একটা শব্দ করে এবং বাবর টের পায় ঘোড়াটার একটা পা পিছলে গেছে কিন্তু কালো পাহাড় ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়। একই সাথে তার পেছনে তিনজন যোদ্ধা এসে হাজির হয়।
কিন্তু চতুর্থজন ঢুকতে ব্যর্থ হয়। ভেতরে প্রবেশপথ আটকে ঘোড়া আর তার আরোহীর ভূপাতিত হবার শব্দ বাবর শুনতে পায়। সে দূর্গের ভিতরে প্রবেশ করেছে বটে। কিন্তু তাকে সহায়তা করবার জন্য মাত্র তিনজন যোদ্ধা তার সাথে রয়েছে। চারপাশে তাকালে সে সারি সারি স্থাপিত উঁচু দরজার পেছন, সম্ভবত দূর্গের প্রধান সেনানিবাস থেকে পিলপিল করে লোকজনকে বের হয়ে আসতে দেখে। কেউ কেউ ইস্পাতের বর্ম গায়ে চাপাতে ব্যস্ত। আর বাকিরা ইতিমধ্যে অস্ত্রধারণ করেছে।
“আমার সাথে এসো! এখনই আক্রমণ করতে হবে!” বাবর পেটে খোঁচা দিয়ে পুনরায় তার ঘোড়ার গতি বৃদ্ধি করে। আর একটু পরেই তাকে তার তিনজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে আতঙ্কিত লোকগুলোকে কচুকাটা করতে দেখা যায়। সহসা একটা লম্বা লোক বাবরের নজর কাড়ে, যাকে দেখে সেনাপতিদের একজন বলে মনে হয়। ব্যাটকে মাথা নিচু করে পুনরায় ঘরের ভিতরে প্রবেশ করতে দেখলে সেও ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। কাঠের সরদলের নিচে দিয়ে ঝুঁকে পার হয়ে সে ভেতরের আধো অন্ধকারে চোখ পিটপিট করে প্রবেশ করতে যে বিশ ত্রিশজন সেখান থেকে বের হয়ে এসেছে, বুঝতে হবে সেটাই এই দূর্গের মোট জনবল। কেবল সেনাপতিগোছের লোকটাই এখন ভেতরে রয়েছে। লোকটা দৌড়ে একটা অস্ত্র সজ্জিত তাকের দিকে ছুটে গিয়ে সেখান থেকে একটা বর্শা আর ঢাল তুলে নিয়ে বাবরের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
