না। তখন আমরা ফিরছি। মেস্মন আইল্যান্ডস-এর একটা ছোট দ্বীপে থেমেছি। সেখানে জিপসিরা এল নৌকায়। ওদের কাছে মরা পাখিটাকে দেখলাম। চমৎকার পালক দেখে কিনে নিলাম, একখণ্ড কাপড়ের বদলে।
কী করে পেয়েছে ওটা বলল জিপসিরা? প্রশ্ন করল তপন।
বলেছিল। মৃত অবস্থায় সমুদ্রের জলে ভাসছিল একটা দ্বীপের পাশে। বোধহয় ঝড়ের তোড়ে ছিটকে পড়েছিল জলে। আমাদের একজন জেলে পাখিটার পেট-টেট কেটে পরিষ্কার করে দিল। তবে বেটা আনাড়ি ছিল। কেটে-কুটে নষ্ট করে দিল পাখিটা। নইলে ভালো দাম পেতাম।
দত্তদা আনমনে ভাবছেন কিছু। তপন কথা চালাতে জিজ্ঞেস করল, জিয়ান, তুমি তিমি শিকার দেখেছ?
দেখেছি বইকি। জিয়ান ফের বক্তৃতা শুরু করে।
মিনিট দশ বাদে দত্তদা বলে উঠলেন, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। ওই দ্বীপে আমি যাব, যে দ্বীপের পাশে পাখিটা ভাসছিল। তুমি হবে আমার গাইড। ওই দ্বীপে নিশ্চয় এরকম পাখি আরও আছে। সেই পাখিদের ফোটো তুলব। জীবন্ত পাখির মুভি ফোটোগ্রাফ। দারুণ হবে। ভয় নেই তোমার লোকন করব না। জাহাজে তুমি যা মাইনে আর যা যা পাও তাই দেব আমি।
এই পাখি? জিয়ান আমতা আমতা করে।
জিয়ানের মুখের ভাব দেখে দত্তদা বললেন, কেন, দ্বীপটা তো তুমি চেনো। ওই দ্বীপে গেলে এই পাখি ঠিক খুঁজে পাব।
হ্যাঁ, তা চিনি। তবে চোখে দেখিনি। জিপসিরা দেখিয়ে দিয়েছিল কোম্বারে। মেসমন আইল্যান্ডস-এর একদম পুবে। আমরা যে দ্বীপে গিয়েছিলাম তার থেকে বেশি দূরে নয়। পাখির দেহটা তখনো বেশ টাটকা ছিল। তবে ঠিক কোন দ্বীপটা কে জানে!
কেন, ওখানে কি অনেক দ্বীপ?
হ্যাঁ, অনেকগুলো, আর সবকটাই জঙ্গুলে। বেশির ভাগেই মানুষ থাকে না। কখনো আর যাইনি ওদিকে। শেষে যদি পাখি পাওয়া না যায়? এত কষ্ট করে যাবেন? জিয়ান যেন ভরসা পায় না। সে বলল, বুরং রাজা তো অন্য জায়গাতেও আছে।
না না, আমি ওইখানেই যেতে চাই, দত্তদা জোর দিলেন, প্যারাডাইস বার্ডের ফোটো তুলতে না পারলেই বা কী? খাসা একটা অ্যাডভেঞ্চার হবে। ভ্রমণ কাহিনি লিখে ফেলব। ওখানকার দ্বীপে ঘুরে ঘুরে ফোটো তুলব। জিপসিদের সঙ্গে যে দ্বীপে দেখা হয়েছিল সেখান অবধি চিনে যেতে পারবে তো?
হ্যাঁ, তা পারব।
ব্যস, তাহলেই হবে। তোমার কি এখন জাহাজে কাজ আছে?
না। তবে সাত-আট দিন বাদে একটা জুটবে।
দরকার নেই তোমার ও কাজে। আমরা সপ্তাহখানেকের ভিতরেই বেরিয়ে পড়ব।কাল এসো এখানে। আমার বাড়ি নিয়ে যাব। তারপর সব প্ল্যান ছকে ফেলব। কি, রাজি? জিয়ান বলল, অলরাইট। তবে কাল নয়, পরশু আসব, সন্ধে ছটা নাগাদ।
অমনি দত্তদা উঠে দাঁড়িয়ে সাড়ম্বরে করমর্দন করলেন জিয়ানের সঙ্গে। তারপর বললেন, বারোটা বাজে। চলো বাইরে কোথাও লাঞ্চ খাওয়া যাক। আমার মোটর আছে বাইরে। চলো–
এক নামকরা চিনা হোটেলে তিনজনে খেতে ঢুকল। জিয়ানকে দেখে মনে হচ্ছিল বেজায় খুশি। এমন খাতির-যত্ন তার ভাগ্যে কদাপি জুটেছে কিনা সন্দেহ। লোকটি বকে একটু বেশি। ফুর্তির চোটে সমানে কথা বলে চলেছে। মেনু এল। জিয়ানকে অনুরোধ জানানো হল খাবার পছন্দ করতে। সে একধারসে অর্ডার দিল–বার্ড-নেস্ট স্যুপ, চাওমিন, ডাক রোস্ট, গলদা চিংড়ি ভাজা ইত্যাদি। ভক্তদের পকেট হালকা করতে তার বিন্দুমাত্র সঙ্কোচ নেই। পয়সা বেশ খরচা হলেও খাওয়াটা হল তোফা।
বেলা একটা নাগাদ জিয়ান ঘড়ি দেখে বলল, এবার আমি উঠি। ব্লু-ড্রাগনে একজন আমার জন্য অপেক্ষা করবে। পরশু আসব মিস্টার রায়ের ঘরে সন্ধে ছটায়।
ব্লু-ড্রাগন কী? জিজ্ঞেস করল তপন।
রেস্টুরেন্ট, জবাব দিল জিয়ান।
সকলে উঠে পড়ল। জিয়ান বিদায় নিল। তপন ডক্টর দত্তর সঙ্গে গেল তার বাড়ি।
গাড়িতে যেতে যেতে তপন জিজ্ঞেস করল, দত্তদা, ওয়াইজিও কোথায়? আর মেস্মন আইল্যান্ডস?
বাড়ি চলো দেখাচ্ছি, দত্তদা জবাব দিলেন।
.
০৩.
দত্তদার পড়ার ঘরের দেওয়ালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মস্ত একখানা ম্যাপ ঝোলানো। দত্তদা দেখালেন, এই দেখ ডাচ নিউগিনির উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত। তারপর সমুদ্র। ডেম্পিয়ার প্রণালী। তার উত্তরে এই ওয়াইজিও দ্বীপ। প্রায় নিরক্ষরেখার ওপরে। আর ওয়াইজিওর একটু নীচে দক্ষিণ-পশ্চিমে এই যে ফুটকিগুলো, এই হচ্ছে মেস্মন আইল্যান্ডস। এই দ্বীপগুলো ছোট ছোট, জঙ্গুলে, ভলক্যানিক বা কোরাল আইল্যান্ড। বেশির ভাগেই মানষের বসতি নেই। অস্বাস্থ্যকর। কাঠ, জায়ফল, নারকেল ইত্যাদির খোঁজে লোক এসব দ্বীপে কখনো কখনো যায় বটে, কিন্তু থাকে না। মেস্মন আইল্যান্ডস-এর দ্বীপগুলোর আলাদাভাবে নাম দেওয়া নেই। ম্যাপে পয়েন্ট-আউট করা হয়নি ভালোভাবে। কিন্তু তপন আমার একটা সন্দেহ হচ্ছে–
কী?
এটা ডিক্সন দ্বীপের পাখি।
-–ডিক্সন দ্বীপ?
–নামটা আমার দেওয়া। জন ডিক্সন ছিল একজন অর্নির্থলজিস্ট অর্থাৎ পক্ষিবিদ। বিশেষত বার্ড অফ প্যারাডাইস স্পেশালিস্ট! পাঁচ বছর আগে ম্যানিলায় এক কনফারেন্সে ওর সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়। কথায় কথায় ডিক্সন বলেছিল যে ও একটা এক্সপেরিমেন্ট। করছে। পাপুয়া নিউগিনি থেকে কয়েক জাতের প্যারাডাইস বার্ড এনে মলুক্কা সী-তে একটা জনহীন জঙ্গুলে দ্বীপে ছেড়েছে। দেখা যাক তাদের মধ্যে মিশ্রণ ঘটে নতুন স্পিশিস তোর হয় কিনা! প্যারাডাইস বার্ডস-এর মধ্যে একরকম মিশ্রণ ঘটেছে আগে। ডিক্সন খুব গোপনে করেছে ব্যাপারটা। সেই দ্বীপটা যে ঠিক কোন জায়গায় বলতে চায়নি ডিক্সন। শুধু বলেছিল, মেস্মন আইল্যান্ডস-এ।
