ঠিক আছে, ঠিক আছে। পা ইং আশ্বাস দিল।
পা ইং-এর কাছে বিদায় নিয়ে তপন দত্তদাকে রিপোর্ট করল।
দত্তদা বললেন, তুমি জিয়ানকে নিয়ে তোমার ঘরে যাবে। আমিও হাজির হব তোমার ঘরে। সেখানে কথা হবে। পাখিটা নিয়ে যাও। তোমার ঘরে সাজিয়ে রাখো। অন্য কথা বলতে বলতে পাখির কথায় আসবে। আমার পরিচয় দিও–চেনা লোক। অ্যাডভেঞ্চারের গল্পের ভীষণ ভক্ত। টিচার। ভ্রমণ কাহিনি লেখে। জিয়ানের কথা শুনে থাকতে পারিনি। কিছু ভালোমন্দ খাবার-দাবারের ব্যবস্থা রেখো। তোয়াজ করতে হবে। যদি দামি খবর কিছু দেয় তখন আরও খাতির দেখানো যাবে।
গোবিন্দ সিং-এর কাছে ছুটি নিয়ে তপন সকাল দশটা নাগাদ পা ইং-এর দোকানে। হাজির হল। কাউন্টারের ভিতরে একটি লোক বসেছিল, সে উৎসুক চোখে দেখল তপনকে। পা ইংলোকটিকে দেখিয়ে বলল, এই হচ্ছে জিয়ান। বসিয়ে রেখেছি তোমার জন্যে।
জিয়ান তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। জিয়ানের চেহারা রোগা পাকানো। মাঝারি লম্বা। হাত দুটো শিরাবহুল, তাতে ভর্তি উল্কি। খুদে খুদে চোখ দুটো পিটপিট করছে। পরনে হলুদের ওপর কালো ডোরা কাটা স্পোর্টস গেঞ্জি ও পুরনো নীল জিনস। পায়ে রবারের জুতো।
তপন কৃতার্থ হয়ে ইংরেজিতে বলল, আপনার কথা শুনেছি। আপনার গল্প শুনতে চাই। আমার কথা বলেছে কি পা ইং?
হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছি বইকি, জানাল পা ইং, রায় ইন্ডিয়ান। অ্যাভেঞ্চার রাইতার।
জিয়ান বেশ গর্বিতভাবে বলল, তা ঘুরেছি অনেক। প্রচুর অ্যাডভেঞ্চার করেছি বটে।
তপন বলল, এখানে গল্প জমবে না, খদ্দের আসবে, চলো, আমার ঘরে যাই। কাছেই মহারাজ রোডে। বেশ বসা যাবে। সে জিয়ানকে বেশি ভাবনা-চিন্তার সুযোগ না দিয়ে প্রায়। ঠেলে বাইরে এনে ফেলল। একদফা ধন্যবাদ জানিয়ে আসল পা ইংকে। খানিকটা হেঁটে গিয়ে একটা ট্যাক্সি নিল।
তপনের ঘরে ঢুকেই জিয়ানের নজরে পড়ল টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা সেই বার্ড অফ প্যারাডাইস।
তপন হেসে বলল, চিনতে পারছ? তোমার সেই পাখি। আমি কিনেছি। চমৎকার।
জিয়ান বসল। তপন তৎক্ষণাৎ তার সামনে এগিয়ে দিল এক বোতল উত্তম সুরা। তারপর এক প্যাকেট দামি সিগারেট সামনে রেখে বলল, দাঁড়াও, পাশের দোকান থেকে গরম গরম মাংসের চপ নিয়ে আসি। হ্যাঁ–আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক, বাঙালি, তাকে বলেছিলাম তোমার কথা। তিনি তোমার গল্প শুনতে চান। খুব ধরেছিলেন আমায়। ভদ্রলোক টিচার, লেখেন-টেখেন–ভ্রমণ কাহিনি। এসে পড়তে পারেন। তোমার আপত্তি নেই তো?
একটা সিগারেট ধরিয়ে জিয়ান ঘাড় নেড়ে জানাল–না না, আপত্তির কী? তার মুখে গর্ব ও আত্মপ্রসাদ। সে বুঝে নিয়েছে, এই বিদেশিদের চোখে সে একজন হিরো। তার অতি কষ্টকর একঘেয়ে নাবিক জীবনের অভিজ্ঞতা কেউ যে এত আগ্রহ করে শুনতে চায়, সে বোধহয় এই প্রথম জানল।
তপন বাইরে গিয়ে দত্তদাকে টেলিফোন করল।
মিনিট পনেরোর ভিতর দত্তদা এসে পড়লেন। জিয়ানের সঙ্গে তার পরিচয় হল। তিনজনে বসল। জিয়ানের খাবার চটপট শেষ। বোতলের পানীয় ঢেলে অল্প অল্প চমক দিতে দিতে সিগারেটে টান মেরে জিয়ান বলল, কোথাকার গল্প শুনবেন? প্যাসিফিক? সাউথ সী আইল্যান্ডস না অ্যাটলান্টিক? আমি ক্যালকাটাতেও গেছি।
আগে সাউথ সীর কথাই বলো, দত্তদার অনুরোধ।
বাঁকা বাঁকা ইংরেজিতে জিয়ান বলে চলে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতা। প্রায় একঘণ্টা কাটল। দত্তদা গোপনে ইশারা করলেন তপনকে–অর্থাৎ এবার পাখির কথা পাড়ো।
জিয়ানের সমুদ্র জীবনের কাহিনি; নতুন দেশ, নতুন জাতি; নতুন নতুন বন্দর। ঝড়ে পথ হারিয়ে দিক-দিশাহীন সাগরবক্ষে ভেসে চলা। কত অজানা প্রাণীর দেখা পাওয়া। কূলহীন অতল সাগরগর্ভে কত অজানা বিস্ময়, রোমাঞ্চ, ভীতি। মাঝে মাঝে সন্দেহ হচ্ছিল ওর একার জীবনে এত কাণ্ড সত্যি ঘটেছে কি না! হয়তো বা গুণমুগ্ধ শ্রোতা পেয়ে অন্যের কাছে শোনা গল্প ও নিজের নামে চালাচ্ছে। তবু তপনের চমৎকার লাগছিল। পাখির ব্যাপারটা না থাকলে খুশিমতো বলতে দিত জিয়ানকে।
গল্পের স্রোত একবার থামতেই তপন জিজ্ঞেস করল–আচ্ছা, এই পাখিটা কোত্থেকে পেলে? এ পাখি তো ঘোর জঙ্গলে থাকে শুনেছি।
তা বটে, টেবিলে খাড়া করা পাখিটা দেখে নিয়ে গম্ভীরভাবে জানাল জিয়ান।
পাহাড়ে উঠতে হয়েছিল বুঝি? তপনের আগ্রহভরা প্রশ্ন।
না, দ্বীপ। ভীষণ জঙ্গুলে দ্বীপ, বলল জিয়ান।
দ্বীপ? কোথায়? এবার প্রশ্ন করেন দত্তদা।
ওয়াইজিওর কাছে, দক্ষিণ-পশ্চিমে, ডেম্পিয়ার প্রণালীতে ঢোকার মুখে, মেসমন আইল্যান্ডস। উঃ, সেবার ঝড়ে মারা পড়েছিলাম আর কী!
কী রকম? কী রকম? ওখানে গিয়েছিলে কী করতে? বলল তপনদা। মলা সাগরে কচ্ছপ ধরতে বেরিয়েছিলাম একদল জেলের সঙ্গে। জাহাজের কাভা ছিল না তখন। ভাবলাম এইভাবে দু-পয়সা রোজগার করি। নির্জন দ্বীপের বেলাভূমিতে কচ্ছপ ডিম পাড়ে। আচ্ছা গাড়ে। সেখানে তাদের ধরা যায়।
পাখিটাকে কি তুমি নিজে শিকার করেছিলে? কোন দ্বীপে? নিশ্চয়ই খুব অ্যাডভেঞ্চার হয়েছিল? বলো, বলো, শুনি। ডক্টর দত্তর কণ্ঠে অধীর আগ্রহ।
জিয়ান থমকে গেল। বলল, না, ঠিক নিজে মারিনি, পেয়েছি একদল সামুদ্রিক জিপসির কাছ থেকে। তবে দ্বীপটা জানি, ওরা দেখিয়ে দিয়েছিল।
সেই দ্বীপটায় গিয়েছিলে তোমরা? ডক্টর দত্তর প্রশ্ন।
