উইলো ঝেপের ছায়ায় ঠাণ্ডা পানি খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে গেল ওর। যখন খাওয়া শেষ হলো ধীরে ধীরে উঠে দাড়িয়ে মাথায় হ্যাট চাপাল, তারপর আগের দিন, যে খাড়াইয়ের কিনার থেকে বাথানটা প্রথমে চোখে পড়েছিল সেটার পানে তাকাল। বেশ ঝরঝরে বোধ করছে ও।
ঘোড়ার দিকে ঘাড় ফেরাল গ্রীন। দেখল ঝরনার পাড়ে ঘেসো জমিতে মহানন্দে চরছে জানোয়ারটা। এবার পানি, ভেঙে অপর পাড়ে চলে গেল সে, উইলো ঝোঁপের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে জরিপ করল দালানটা। কেউ নেই ধারেকাছে, কোরালটাও শূন্য। ছাতের ওপর আগের দিন কয়েকটা আগ্নেয়াস্ত্র ছুঁড়ে ফেলেছিল মনে পড়তে সিদ্ধান্ত নিল আজ সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে শহরে, মার্শালের দফতরে জমা দেবে। বাসার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে ও, হঠাৎ বিকট শব্দে গর্জে উঠল একটা রাইফেল।
ভোমরার গুঞ্জন তুলে ওর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেট, চোয়ালের হাড়ে তপ্ত সীসার ঘঁাকা লাগল। পেছন দিকে, ঝোঁপের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রীন, প্রাণপণ প্রয়াস পেল রাইফেলের আওতা থেকে সরে যাবার। পরমুহূর্তে আরও দুটো গুলি, ছুটে এল। এবার কাছ থেকে। খুউব কাছে। একদিনে দুই-দুবার ফাঁদে পা দেয়ায় নিজেকে গাল দিল ও। দীর্ঘ পদক্ষেপে মাত্র চার কদমে ঝরনা অতিক্রম করল সে, ঝোঁপঝাড় : তুড়ানো-ছিটানো রোল্ডারের মাঝ দিয়ে ছুটতে ছুটতে চলে গেল পাহাড়ের ওপাশে, এই বেরঠে এল খাজের মাথায়।
চালের গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল গ্রীন, হাঁপাচ্ছে, কিনার থেকে সাবধানে মাথা জাগিয়ে দেখা দালানের একপাশে একটা বোর্ড রাখা। অনুমান করল, যে লোকই গুলি ছুড়ে থাকুক ওর উদ্দেশে সে এর পেছনে লুকিয়ে আছে।
গ্রীন এর পিস্তলটা বের করে দৌড়ে নেমে গেল ঢাল বেয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটল বাড়ির দিকে। পাটাতনের ওপর ভাঁজ করা কম্বল আর কিছু কাপড়চোপড় পড়ে আছে লক্ষ্য করে, নোনা ধরা দেয়াল আর বাকবোর্ডের মাঝামাঝি জায়গায় গুড়ি মেরে বসে পড়ল। ছাতের ওর যেসব অস্ত্রশস্ত্র ছুঁড়ে ফেলেছিল দেখেই সেগুলো চিনতে পেরেছে ও।
বাঁকবোর্ডের ছটফটে ঘোড়াগুলোকে পাশ কাটিয়ে দালানের কোণে চলে গেল সে। পরক্ষণে শ্যামলা একটা অবয়ব আচমক এসে পড়ল ওর সামনে, ঠোলকি হলো ওদের। তারপর গ্রীন অনুভব করল একজন ক্রুদ্ধ মহিলার গায়ে হাত পড়ে গেছে। তার।
ঘন কালো দীর্ঘ এক গোছা চুল দেখতে পেল সে, লম্বাটে শ্যামবর্ণ মুখের দুপাশ দিয়ে নেমে গেছে। চোখ দুটো ডাগর কালো; টানা টানা ভ্রূ, লম্বা পাপড়ি! গ্রীনকে চিনতে পেরে তীব্র আক্রোশে শ্যামাঙ্গিনীর পুরু ঠোঁটজোড়া উল্টে গেল। আমি খুন: করব তোমাকে সত্যিই খুন করব একদিন, আমার ভাইকে মেরেছ তুমি। ছুরির মত ধার ওর ঘৃণায়। খুনী! তুমি মেরেছ ওকে, তুমি!
মেয়েটাকে একপাশে সরিয়ে ওর হাত থেকে রাইফেলটা কেড়ে নেয়ার সময় এই সুডৌল পেলব শরীরের নীচে কাঠিন্যের আভাস পেল গ্রীন। ওর নিজের মুখ শক্ত হয়ে আছে। মার্শাল মকের সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার। পাদ্রির সাথে আলাপ করেছ। নিশ্চয় শুনেছ লাইল ক্যানাডা খুন করেছে তোমার ভাইকে।
তুমি বা অন্য কেউ-একই কথা। হিসহিস করে উঠল শ্যামাঙ্গিনী। এখানে কেন এসেছ। কী চাই তোমার?
কার্ল হালামের খোঁজে, জবাব দিল গ্রীন, এখন ছেড়ে দিয়েছে মেয়েটাকে উদ্ধত বনবেড়ালির মত মাথা ঝাঁকিয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল সে, দৃষ্টিতে আগুন
যাতে ওকেও খুন করতে পার! ঘৃণায় ভরে আছে শ্যামাঙ্গিনীর চোখ, তবু সকৌতূহলে গ্রীনের মুখখানা জরিপ করছে। মারামারি করেছ তুমি। কোথায়?
ইতস্তত করল গ্রীন, চোয়ালে বুলেটের হাত বোলাল। তোমার টিপ ভাল না, মিস গার্সিয়া। আর ইঞ্চি দুয়েক হলেই খুন হয়ে যেতাম আমি। কিন্তু আমি ভাবছি আমাকে তুমি চিনলে কীভাবে? কোন নিরীহ লোক মারা পড়তে পারত।
মার্শালের সাথে দেখেছি তোমাকে, ঘৃণার সুরে বলল, মারিয়া। তোমার ঘোড়া দেখেছি, ওই বিরাট স্টীলডাস্টটা। যাই হোক তোমাকে অবশ্যি খুন করতে চাইনি আমি। ভাইকে কবর দিয়ে ওর জিনিসপত্র নিতে এসেছিলাম এখানে। তোমাকে দেখে সামলাতে পারিনি রাগ।
চলে যাবার জন্য আধপাক ঘুরল মেয়েটা, হঠাৎ করেই যেন ওর শ্যামল সৌন্দর্যে বেদনা আর হতাশার ছায়া ঘনিয়েছে। পাশ থেকে ওর শরীরের বাঁধুনি লক্ষ্য করল গ্রীন, বিচিত্র অনুভূতি হলো হৃদয়ে। ঘটনাবহুল চল্লিশটা বসন্ত পাড়ি দিয়েছে সে। এই দীর্ঘ সময়ে কোন মেয়েই রেখাপাত করতে পারেনি ওর মনে, কিন্তু আজ প্রথম দর্শনেই শামাঙ্গিণীর আদর সেই উষর অন্তরকে ছুঁয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে ভীষণ আশ্চর্য হলো গ্রীন।
লম্বা একটা শ্বাস টানতে আন্দোলিত হলো মারিয়ার ভরাট বুক। গ্রীনের দিকে তাকিয়ে বলল, কী হলো বলছে না, কোথায় মারামারি করেছ?
ভার্জিল রীডের স্যালুণে, সেজে।
ওই শয়তান বুড়োটা। কিন্তু ওর সাথে লড়োনি তুমি। অন্য কেউ ছিল। মারিয়ার চোখ জ্বলে উঠল কার্ল হালামের খোঁজে গেছিলে, না? ভেবেছিলে ওখানে যাবে সে?
এখন আর ভাবছি না। তবে তুমি বোধহয় বলতে পারবে কোথায় পাওয়া যাবে ওকে।
নিদারুণ ঘৃণায় শ্যামাঙ্গিণীর ঠোঁট বেঁকে গেল। বলব না।
তা হলে আমি ধরে নিচিছ তুমি হালামদের বন্ধু, ওদের পক্ষে আছ।
হালামদের! ক্ষিপ্ত সুরে মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল। ভাবছ ফ্রেড হালামের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আছে, যেখানে সে কখনও শান্তিতে থাকতে দেয়নি আমাদের? আমার প্রেমিককে খুন করেছে লবণ হ্রদে? যে লবণ ঈশ্বর সবার ব্যবহারের জন্যই দিয়েছেন। ফ্রেড হালমকে আমি খুন করতে পারি!
