বল্লম উঁচিয়ে এগিয়ে আসছে বর্বররা। ইতিমধ্যে আমাদের পথপ্রদর্শক অদৃশ্য হয়েছে কোনো একটা চাঙড়ের আড়ালে, আমরা খেয়াল করিনি। অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো মন। আমিই লিওকে পরামর্শ দিয়েছিলাম মূর্তিটার পেছন পেছন আসার। কিন্তু না, অসভ্যরা যখন মাত্র কয়েক গজ দূরে তখন উঁচু একটা চাঙড়ের ওপরে দেখা গেল তাকে। কোনো কথা উচ্চারণ করলো না। হাত দুটো ছড়িয়ে দিলো শুধু।
সঙ্গে সঙ্গে আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটলো। মুখ মাটিতে দিয়ে শুয়ে পড়লো বুনন লোকগুলো। প্রত্যেকে। বজ্রপাত হয়েছে যেন ওদের মাথায়। ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে আনলো মূর্তিটা। তারপর কাছে ডাকার ভঙ্গিতে ইশারা করলো। বিশালদেহী এক লোক, সম্ভবত দলনেতা, উঠে এগিয়ে গেল। হাঁটার ভঙ্গিটা অত্যন্ত বিনীত, মার খাওয়া কুকুরের মতো। মূর্তির ইশারা ও দেখলো কি করে বুঝলাম না, নিশ্চয়ই মুখ নিচের দিকে থাকলেও চোখ টেরিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো। হাত দুটো আড়াআড়িভাবে একটার ওপর অন্যটা একবার রেখে আবার সরিয়ে এনে আরেকটা ইশারা করলো মূর্তি। এবারও কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে শুনলাম না। দলনেতা বুঝতে পারলো ইশারার মর্ম। দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু একটা বললো সে। তারপর আবার সেই তীক্ষ্ণ্ণ শিস। মুহূর্তে উঠে দাঁড়ালো বর্বরের দল। পড়িমরি করে ছুটে পালালো যে যেদিকে পারলো সেদিকে।
এবার আবার আমাদের দিকে ফিরলো পথ প্রদর্শক। ইঙ্গিতে নির্দেশ দিলো এগোনোর।
দুঘণ্টা একটানা চললাম আমরা। লাভার ঢাল শেষ। ঘাসে ছাওয়া একটা সমান জায়গায় পৌঁছে ঝরনাটার উৎসমুখ দেখতে পেলাম কিছু দূরে। তারপর আশ্চর্য হয়ে দেখলাম আগুন জ্বলছে এক পাশে। তার ওপর ঝুলছে একটা মাটির পাত্র। কিছু একটা সেদ্ধ হচ্ছে তাতে। কোনো মানুষ দেখলাম না আশেপাশে।
আমাকে ঘোড়া থেকে নামার নির্দেশ দিলো মৃর্তি—অবশ্যই ইশারায়। তারপর ইঙ্গিতে পারে পদার্থটুকু খেয়ে নিতে বললো আমাদের। খুব খুশি মনেই আমি খেতে লেগে গেলাম। প্রচণ্ড খিদেয় রীতিমতে অস্থির লাগছিলো এতক্ষণ। শুধু আমাদের নয়, ঘোড়াটার জন্যেও খাবারের বন্দোবস্ত রয়েছে দেখলাম।
গরম গরম খেয়ে নিয়ে (জিনিসটা কি জানি না, তবে স্বাদ মন্দ নয়) ঝরনার উৎসমুখের কাছে গিয়ে পানি খেয়ে এলাম। ঘোড়াটাকেও খাইয়ে নিলাম। কিন্তু মূর্তি কিছু খেলো না। পানি পর্যন্ত না। ভদ্রতা করে আমরা একবার সাধলাম ইশারায়। নিরাসক্ত ভঙ্গিতে প্রত্যাখ্যান করলো সে।
খাওয়ার পর আমার হাতের ক্ষত পরিষ্কার করে আবার বেঁধে দিলো লিও। এদিকে ভরপেট খাওয়ার সাথে সাথে ঝিমুনি এসে গেছে আমার। কিন্তু ঘুমানোর সুযোগ দিলো না পথপ্রদর্শক। হাত তুলে ইশারা করলো প্রথমে সূর্যের দিকে তারপর ঘোড়াটার দিকে। যেন বোঝাতে চাইলো এখনও অনেক দূর যেতে হবে আমাদের। সুতরাং আবার রওনা হলাম।
দিন শেষে ঘাসে ছাওয়া এলাকা পেরিয়ে গেলাম। তারপর আবার শুরু হলো পাথুরে ঢাল। মাঝে মাঝে মাথা তুলেছে দু’একটা খর্বাকৃতির ফার গাছ।
সূর্য ডুবে গেল। গোধূলির আলোয় এগিয়ে চললাম সেই অদ্ভুত মূর্তির পেছন পেছন। চারদিক অন্ধকার হয়ে এলো। তবু চলছি আমরা। পাহাড় চূড়ার লাল আভা আবছাভাবে এসে পড়েছে। সেই সামান্য আলোয় পথ দেখে এগোচ্ছি। কয়েক পা সামনে মূর্তিটাকে সত্যিই ভূতের মতো লাগছে এখন। একবারও পেছনে না তাকিয়ে, একটাও কথা না বলে এগিয়ে চলেছে সে। একটু পরপরই বাঁক নিচ্ছে, একবার এদিকে একবার ওদিকে। কিছুক্ষণের ভেতর পথের দিশা হারিয়ে ফেললাম। এখন যদি একা ফিরে যেতে বলা হয়, কিছুতেই পারবো না।
চাঁদ উঠলো। সরু একটা গিরিখাতের ভেতর পৌঁছুলাম। এঁকে বেঁকে এগিয়ে চললাম তার ভেতর দিয়ে। একটু পরে এমন এক জায়গায় পৌঁছুলাম, যার সঙ্গে কেবল গ্রীক অ্যামফিথিয়েটারেরই তুলনা চলে। পার্থক্য একটাই, এটা মানুষের তৈরি নয়, প্রাকৃতিক। অত্যন্ত সংকীর্ণ তার প্রবেশ পথ। একজন মানুষ কোনোরকমে ঢুকতে বা বেরোতে পারে। তার ওপাশে একটা ফাঁকা জায়গায় পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো ছোট ছোট পাথরের ঘর। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ঘরগুলোর সামনে বড় একটা চত্বর। সেখানে জড় হয়েছে কয়েকশো নারী পুরুষ। অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ধর্মীয় আচার পালন করছে।
তাদের সামনে, অর্ধবৃত্তের ঠিক কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে এক লোক। বিশালদেহী, লাল দাড়িওয়ালা। কোমরে এক টুকরো চামড়া জড়ানো, বাকি শরীর উলঙ্গ। সামনে পেছনে দুলছে সে; হাত দুটো নিতম্বের ওপর স্থির। দুলুনির তালে তালে চিৎকার করে বলছে হো-হাহা-হো! সে যখন দর্শকদের দিকে ঝুঁকছে অমনি দর্শকরাও একসাথে ঝুঁকে আসছে তার দিকে। সোজা হওয়ার সময় সবাই তার শেষের আওয়াজটার ধুয়া ধরে চেঁচিয়ে উঠছে হো! চারপাশের পাহাড়ী দেয়াল থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে শব্দটা। লোকটার দীর্ঘ চুলওয়ালা মাথার ওপরে বসে আছে বড় একটা সাদা বিড়াল। দুলুনির তালে তালে মৃদু মৃদু লেজ নাড়ছে সেটা।
চাঁদনী রাত, চারপাশে পাহজ, তার মাঝে এমন একটা দৃশ্য আর আওয়াজ! অদ্ভুত এক স্বপ্নের মতো মনে হলো আমার কাছে।
যে চত্বরে জংলীগুলো এই অদ্ভুত আচরণ বা উপাসনার কাজ করছে তার চারপাশে প্রায় ছফুট উঁচু একটা দেয়াল। দেয়ালের এক জায়গায় একটা দরজা। সেটার দিকে এগিয়ে চললাম আমরা সবার অলক্ষ্যে। দরজার কয়েক গজ দূরে পৌঁছে আমাদের থামতে ইশারা করলো মূর্তি। সে এগিয়ে গেল দেয়ালের নিচু একটা অংশের দিকে। অনাকাক্ষিত কিছু একটা দেখছে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর ফিরলো আমাদের দিকে। যেখানে আছি সেখানেই থাকার ইশারা করে মুখ ঢাকলো হাত দিয়ে। পরমুহূর্তে চলে গেল সে। কোথায়, কিভাবে, বলতে পারবো না। শুধু দেখলাম, যেখানে ছিলো সেখানে সে নেই।
