জলা পেরিয়ে সামান্য ঢালু একটা সমভূমিতে পৌঁছুলাম। তিন-চার মাইল দূরে পাহাড়ের প্রথম ঢাল পর্যন্ত বিস্তৃত সেটা। ঢিপ ঢিপ করছে বুকের ভেতর। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই বুঝি হা-হা করতে করতে হাজির হলো জংলীরা। এতবার এতভাবে ওদের ভীতিজনক আচরণের কথা শুনেছি যে কিছুতেই ভয়টা তাড়াতে পারছি না মন থেকে।
হঠাৎ বেশ দূরে শাদা কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখলাম। কি হতে পারে ভাবছি, কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছি না। একটু পরে আরও অনেকগুলো একই রকম জিনিস পড়ে থাকতে দেখলাম। তারপর আরও অসংখ্য। কৌতূহল বেড়ে উঠলো আমাদের। চলার গতি আপনা থেকেই কখন যে বেড়ে গেছে খেয়াল করিনি।
. অবশেষে পৌঁছুলাম সেখানে। জিনিসগুলো দেখলাম। প্রথমে বিশ্বাস হইতে চাইলো না। ভুল দেখছি না যে? কিন্তু তা কি করে হয়? স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সাদা জিনিসগুলো নরকঙ্কাল। তারমানে এই উপত্যকা বিশাল এক কবরখানা ছাড়া আর কিছু নয়। মনে হয় বুড়সড় এক সেনাবাহিনী এখানে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো।
বিষণ্ণ মনে এগিয়ে চললাম ছড়িয়ে থাকা কঙ্কালের মাঝ দিয়ে। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পথ খুঁজছি, কিন্তু পাচ্ছি না। চারদিকে কেবল হলদেটে সাদা রঙের হাড় আর হাড়, খুলি আর খুলি। দিনে দুপুরেও গা ছমছম করে উঠতে চায়। ঘোড়াটাও কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছে। ঘনঘন সশব্দে নাক টানছে। একটু পরে হাড়ের একটা স্কুপের কাছে পৌঁছুলাম। এই হাড়গুলো এমন টিবি করে রাখলো কে? আশ্চর্য, স্কুপের ওপর ছোট আরেকটা স্থূপ! হাড়েরই মনে হচ্ছে। কেন? পটার এমন চেহারা দিলো কে?
শিগগিরই এখান থেকে বেরোনোর পথ না পেলে পাগল হয়ে যাবো! চারপাশে তাকাতে তাকাতে চিৎকার করলাম আমি।
কথাগুলো আমার মুখ থেকে সম্পূর্ণ বেরোতে পারেনি, চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম, নড়ে উঠেছে স্তূপের উপরের পটা। আতঙ্কে হিম হয়ে আসতে চাইলো আমার শরীর। হ্যাঁ, নড়ে উঠেছে ছোট পটা। ভাঁজ হয়ে থাকা একটা মূর্তি উঠে দাঁড়াচ্ছে। প্রথম দর্শনে মনে হলো নারী মূর্তি—আমি নিশ্চিত নইমাথা থেকে পা পর্যন্ত শাদা কাপড়ে মোড়া যেন কাফন পরা মৃতদেহ। চোখের কাছটায় দুটো গোল গোল গর্ত। হাড়ের স্তূপের ওপর থেকে নেমে এলো ওটা। মমির মতো সাদা হাত উঁচু করলো ইশারার ভঙ্গিতে। ঘোড়াটা আতঙ্কে চি-হি-হি করে খাড়া হয়ে গেল দুপায়ের ওপর।
কে তুমি? চেঁচিয়ে উঠলো লিও। দূরের পাহাড় থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো ওর কণ্ঠস্বর। কিন্তু কোনো জবাব দিলো না মূর্তি। আবার ইশারা করলো।
চোখের ভুল কিনা, নিশ্চিত হওয়ার জন্যে লিও এগিয়ে গেল ওটার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত, প্রায় হাওয়ায় ভেসে হাড়ের স্তূপের পেছনে চলে গেল মূর্তি। দাঁড়িয়ে রইলো প্রেতাত্মার মতো। আবার এগোলো লিও। বোধহয় স্পর্শ করে দেখতে চায় সত্যিই ভূত না অন্য কিছু। কাছাকাছি পৌঁছুতেই আবার হাত উঁচু করলো মূর্তি। আলতো করে চুলো লিওর বুক। তারপর আবার হাত গুটিয়ে নিয়ে ইশারা করলো প্রথমে উপরে চূড়ার দিকে, তারপর আমাদের সামনে কিছুদূরে পাথরের দেয়ালটার দিকে।
ফিরে এলো লিও। কি করবো আমরা?
ওর পেছন পেছন যাবো, বললাম আমি। ওপর থেকে বোধহয় পাঠানো হয়েছে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।
নাকি নিচে থেকে? বিড় বিড় করলো ও। একদম ভালো লাগছে না ওর ভাবভঙ্গি, চেহারা।
তবু ওকে ইশারায় এগোতে বললো লিও। দ্রুত অথচ একেবারে নিঃশব্দে পাথর আর কঙ্কালের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চললো মূর্তি। আমরা অনুসরণ করছি। কয়েকশো গজ যাওয়ার পর নিচু একটা ঢালের মাথায় পৌঁছুলো ওটা। পর মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।
নিশ্চয় ওটা ছায়া! সন্দেহ লিওর কঠে।
গাধা, আমি বললাম, ছায়া মানুষকে স্পর্শ করতে পারে? এগোও।
ঘোড়ার লাগাম ধরে চুড়ার কাছে পৌঁছুলো লিও। ওখানে তীক্ষ্ণ্ণ একটা বাঁক নিয়েছে ঢাল। মোড় ঘুরতেই দেখতে পেলাম মূর্তিটাকে। আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। আবার এগিয়ে চললো এটা। পেছন পেছন আমরা। কিছুদূর যাওয়ার পর ছোট একটা সুড়ঙ্গের কাছে পৌঁছুলাম। দেখে মনে হলো, সুড়ঙ্গটা মানুষের হাতে তৈরি।
মূর্তির পেছন পেছন ঢুকে পড়লাম প্রায়ান্ধকার সুড়ঙ্গে। লাগাম ধরে হেঁটে চলেছে লিও। ঘোড়ার পিঠে আমি। সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে জমাট বাঁধা লাভার একটা ঢাল বেয়ে উঠে যেতে লাগলাম আমরা। অসংখ্য ছোট বড় লাভার চাঙড় ছড়িয়ে আছে চারপাশে। একটু দূরে কুল কুল করে বয়ে যাচ্ছে একটা পাহাড়ী ঝরনা।
মাইল খানেক যাওয়ার পর আচমকা তীক্ষ্ণ্ণ একটা শিসের আওয়াজ শুনলাম। সঙ্গে সঙ্গে চাঙড়গুলোর আড়াল থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো একদল লোক। জনাপঞ্চাশেক তো হবেই, বেশিও হতে পারে। প্রত্যেকের চেহারায় অসভ্য এক অভিব্যক্তি। লালচে চুল-দাড়ি তাদের। গায়ের রঙ কালোর ধার ঘেঁষে। পরনে সাদা ছাগলের চামড়া। প্রত্যেকেরই হাতে রয়েছে বর্শা আর ঢাল। আবার শিস বাজাল ওদের কেউ একজন। তীক উল্লসিত চিৎকার করে উঠলো পুরো দলটা। তারপর ঘিরে ফেললো আমাদের।
বিদায়, হোরেস, কোনোমতে বলেই খানের তলোয়ারটা বের করলো লিও।
খানিয়া আর বুড়ো শামার কথাই তাহলে ঠিক হলো! পাহাড়ের-প্রথম ঢাল অতিক্রম করার আগেই মরতে চলেছি আমরা! দুর্বল গলায় বললাম, বিদায়, লিও।
