এখন কি করবো আমরা? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো লিও।
কি আর? যতক্ষণ না ও ফিরে আসে বা কিছু ঘটে ততক্ষণ অপেক্ষা করাই উচিত আমার মনে হয়।
অপেক্ষা করছি আর দেখছি জংলীদের কাণ্ড-কারখানা। একটাই দুশ্চিন্তা, ঘোড়াটা না ডাক ছেড়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে ধরা পড়ে যাব অসভ্যদের কাছে। তারপর কি ঘটবে জানি না।
দেখছি জংলীদের অদ্ভুত আচরণ। এখন আর উপাসনা মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে বিচার সভা। হ্যাঁ, একটু পরে হঠাৎ মন্ত্রোচ্চারণ থেমে গেল। বিড়াল মাথায় লোকটার সামনের মানুষগুলো দুভাগ হয়ে সরে গেল দুপাশে। একই সঙ্গে তার পেছন থেকে ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী উঠলো, যেন সাজিয়ে রাখা চিতায় আগুন দেয়া। হয়েছে। সামনের মানুষগুলো আরেকটু সরে দাঁড়ালো। পেছনের ঘরগুলোর একটা থেকে পিছমোড়া করে বাঁধা সাতজন লোককে নিয়ে আসা হলো। নিম্নাঙ্গে এক টুকরো চামড়া জড়ানো, উর্ধাঙ্গ অনাবৃত সব কজনের। নারী-পুরুষ দুরকম মানুষই আছে তাদের ভেতর। দীর্ঘাঙ্গী, চমৎকার দেহসৌষ্ঠবের অধিকারিনী একটা মেয়েকে দেখলাম। মনে হয় সবে কৈশোর পেরিয়েছে। একজন বৃদ্ধকেও দেখলাম। এক সারিতে দাঁড় করানো হলো সাতজনকে! ভয়ে কাঁপছে সবাই। বৃদ্ধ তো বসেই পড়লো কাঁপতে কাঁপতে। মহিলারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কিছুক্ষণ অমনি রইলো ওরা। ইতিমধ্যে কয়েকজনে ভালো করে জ্বালিয়ে ফেলেছে অগ্নিকুণ্ডটা। কমলা রঙের লকলকে শিখা উঠেছে মানুষগুলোর মাথা ছাড়িয়ে।
সবকিছু তৈরি। একজন একটা কাঠের বারকোশ এনে দিলো লাল দাড়িওয়ালা পুরোহিতের হাতে। একটু আগে বিড়ালটাকে কোলে করে একটা টুলের ওপর বসেছে সে। বারকোশটার হাতল ধরে বিড়ালের দিকে তাকিয়ে কিছু বললো। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে গিয়ে বারকোশের মাঝখানে বসে পড়লো বিড়ালটা।
গভীর নিস্তব্ধতার ভেতর উঠে দাঁড়ালো পুরোহিত। বিড়বিড় করে কিছু মন্ত্র পড়লো। মনে হলো বিড়ালটার উদ্দেশ্যেই-ওটা এখন তার মুখোমুখি বসে। এরপর বারকোশটা ঘুরিয়ে ধরলো সে। বিড়ালের পেছনটা চলে এলো তার সামনে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল লোকটা বন্দীদের দিকে।
একেবারে বাঁয়ের বন্দীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো পুরোহিত। বারকোশ উঁচু করে ধরলো। বিড়ালটা এবার উঠে দাঁড়ালো। ধনুকের মতো পিঠ বাঁকিয়ে থাবা নাড়তে লাগলো উপরে নিচে। পরের বন্দীর সামনে চলে এলো পুরোহিত। একই ভঙ্গিতে বারকোশ উঁচু করে ধরলো। একই ভঙ্গিতে এবারও বিড়ালটা থাবা নাড়লো। তৃতীয়, চতুর্থ, অবশেষে পঞ্চম জনের সামনে এলে পুরোহিত। এ হচ্ছে সেই দীর্ঘাঙ্গীনী মেয়েটা। বারকোশ উঁচু করে ধরতেই খ্যাক-ম্যাক করে চেঁচাতে, গর্জাতে শুরু করলো বিড়ালটা। তারপর হঠাৎ থাবা তুলে আঁচড়ে দিলো মেয়েটার মুখ। রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে তীব্র, জী আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। দর্শকরাও সবাই হৈ-চৈ করে উঠলো। একটামাত্র শব্দ বারবার আওড়াচ্ছে তারা। কালুনের লোকদের মুখে বহুবার শুনেছি শব্দটা—ডাইনী! ডাইনী! ডাইনী!
জল্লাদরা অপেক্ষা করছিলো। এবার তৎপর হয়ে উঠলো তারা। মেয়েটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চললো আগুনের দিকে। সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলো মেয়েটা নিজেকে মুক্ত করার। হাত পা ছুঁড়ে, শরীর মুচড়ে, আঁচড়ে, কামড়ে, চিৎকার করে সে ছুটে যেতে চাইলো জল্লাদদের হাত থেকে। পারলো না। দুদিক থেকে দুজন দুই বাহু ধরে শূন্যে তুলে ফেললো তাকে। দর্শকরা মহা উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো আবার।
এ-তো খুন! সন্ত্রস্ত গলায় বললো লিও। ঠাণ্ডা মাথায় খুন! আমি এ হতে দিতে পারি না, বলতে বলতে তলোয়ার বের করলো ও।
আমি কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে গেলাম। কিন্তু তার আগেই খোলা তলোয়ার হাতে প্রাচীর দরজার দিকে ছুটেছে লিও, সেই সাথে চিৎকার। অগত্যা আমি ঘোড়া ছোটালাম ওর পেছন পেছন। দশ সেকেণ্ডের মাথায় অসভ্যদের মাঝখানে পৌঁছে গেলাম আমরা।
অবাক বিস্ময়ে তাকালো ওরা আমাদের দিকে। প্রথম দর্শনে অপদেবতা বা ভূত জাতীয় কিছু মনে করলো বোধহয়। সেই সুযোগে জল্লাদদের একেবারে কাছে। চলে গেলাম আমরা।
ওকে ছেড়ে দাও, বদমাশের দল! ভয়ঙ্কর গলায় চিৎকার করে উঠে এক জল্লাদের হাতে কোপ বসিয়ে দিলো লিও।
মেয়েটার হাত ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল লোকটা। জনতার দিকে তাকিয়ে অক্ষত হাতটা নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে বলে চললো কিছু একটা। এই ফাঁকে হতভম্ব অন্য জল্লাদদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে অন্ধকারের দিকে ছুটলো দীর্ঘাঙ্গিনী মেয়েটা। এদিকে পুরোহিতও এক লাফে উঠে দাঁড়িয়েছে। বারকোশটা এখনও তার হাতে, বিল্লিটাও বসে আছে বারকোশে। লিওর দিকে তাকিয়ে হিংস্র কণ্ঠে দাত মুখ খিচিয়ে চিৎকার করতে লাগলো সে। লিও-ও সমানে চেচিয়ে চলেছে ইংরেজি এবং আরও অনেকগুলো ভাষায়। তার বেশির ভাগই অকথ্য গালাগাল।
হঠাৎ বিড়ালটা, সম্ভবত চিৎকার চেঁচামেচিতে ভয় পেয়ে, লাফ দিলো বারকোশ থেকে, সোজা লিওর মুখ লক্ষ্য করে। মুখে থাবা পড়ার আগেই বাঁ হাতে শূন্যেই ওটাকে ধরে ফেলে লিও সর্বশক্তিতে আছাড় মারলো মাটিতে পড়ে আর নড়তে পারলো না বিড়ালটা। দলামোচা পাকিয়ে মিউ মিউ করতে লাগলো। তারপর, হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে আবার ওটাকে তুলে নিলো লিও। এবং ছুঁড়ে দিলো আগুনের ভেতর।
