খানিয়া আতেনের কণ্ঠস্বর! তার সাথের লোকটা বুড়ো শামান সিমব্রি।
এখন কি করবো আমরা, হোরেস? আর্তনাদের মতো শোনালো লিওর গলা।
আপাতত কিছুই না, বললাম আমি। আমরা কি করবো তা নির্ভর করছে ওরা কি করে তার ওপর।
এখানে এসো, জলের ওপর দিয়ে ভেসে এলো খানিয়ার গলা। আমি শপথ করে বলছি, তোমাদের ক্ষতি করতে আসিনি। দেখছে না আমরা একা?
জানি না, বললো লিও, তোমরা একা না পেছনে আরও লোক আছে? কিন্তু, যেখানে আছি সেখান থেকে নড়ছি না আমরা।
ফিসফিস করে সিমব্রিকে কিছু একটা বললো খানিয়া। মাথা নেড়ে নিষেধ করলো সিমব্রি। তর্ক করার ভঙ্গিতে আবার কিছু বললো আতেন। এই নদী অগ্নি পর্বতের সীমানা। এটা অতিক্রম করা ঠিক হবে কিনা সম্ভবত তা নিয়ে আলাপ করছে ওরা। একটু পরে সিমব্রির ঘন ঘন মাথা নাড়া সত্ত্বেও ঘোড়া নদীতে নামিয়ে দিলো খানিয়া। পানি ভেঙে এগিয়ে আসছে দ্বীপের দিকে। অগত্যা শামানও আসতে লাগলো পেছন পেছন। সে
দ্বীপে উঠে ঘোড়া থেকে নামলো আতেন। বললো, শেষবার দেখা হওয়ার পর অনেক দূর চলে এসেছো তোমরা। অশুভ এক পথ বেছে নিয়েছে। ওখানে, পাথরের মাঝে একজন মরে ড়ে আছে। গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখলাম না, কি করে মারলে ওকে?
এগুলো দিয়ে, দুহাত সামনে মেলে দিলো লিও।
আমি জানতাম। অবশ্য এজন্যে তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। অমোঘ নিয়তিই নির্ধারণ করে দিয়েছে ওর মৃত্যুর উপায়। তার নড়চড় তো হতে পারে না। তবু এমন লোক আছে যারা এ মৃত্যুর কৈফিয়ত চাইতে পারে। এবং একমাত্র আমিই পারি তাদের হাত থেকে তোমাদের রক্ষা করতে।
নাকি তাদের হাতে তুলে দিতে? খানিয়া, কি চাও তুমি?
সেই প্রশ্নের জবাব। কাল সূর্যাস্তের আগেই যা তোমার দেয়ার কথা ছিলো।
ঐ পাহাড়ে চলো, জবাব পাবে, অগ্নি-পর্বতের দিকে হাত তুলে লিও বললো। ওখানে আমি খুঁজবো আমার…
মৃত্যুকে। মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, কিন্তু বলতে ছাড়লো না আতেন। আগেই তো বলেছি, বিদেশী, ও জায়গা পাহারা দেয় জংলীরা; দয়া, মায়া বলতে তাদের কিছু নেই।
হোক। মৃত্যুই আসুক তাহলে। চলো, হোরেস, দ্রলোকের সাথে মোলাকাত করতে যাই।
আমি শপথ করে বলছি, আবার বললো খানিয়া, তোমার স্বপ্নের নারী ওখানে নেই। আমি সেই নারী, হা, আমিই, যেমন তুমি আমার স্বপ্নের পুরুষ।
বেশ, ঐ পাহাড়েই তাহলে প্রমাণ হবে।
ওখানে কোনো মেয়েমানুষ নেই, ব্যস্তভাবে বললো আতেন। কিছুই নেই। খালি আগুন আর একটা কণ্ঠস্বর।
কার কণ্ঠস্বর?
কারও না। অলৌকিক। আগুন থেকে বেরোয়। সেই স্বরের মালিককে কেউ কখনও দেখেনি, দেখবেও না।
এসো, হোরেস, বলে ঘোড়ার দিকে এগোলো লিও।
থামো! এবার কথা বললো বৃদ্ধ শামান, মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাবেই তোমরা? শোনো তাহলে, আমি গিয়েছি ঐ ভূতুড়ে জায়গায়। নিয়ম অনুযায়ী খানিয়া আতেনের পিতাকে সমাহিত করার জন্ধে যেতে হয়েছিলো। আমার তখনকার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ভুলেও যেও না ওখানে।
আর আপনার ভাইঝি বলছে ওখানে কেউ যেতে পারে না, আমি মন্তব্য করলাম।
বুড়োকে কিছু বলার সুযোগ না দিলে লিও বলে উঠলো, সাবধান করে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। হোরেস, আমি ঘোড়ায় জিন চাপাচ্ছি, তুমি নজর রাখো ওদের দিকে।
অক্ষত হাতে একটা বল্লম তুলে নিয়ে দাঁড়ালাম আমি। কিন্তু ওরা কিছু করলো না। যেমন ছিলো তেমন দাঁড়িয়ে রইলো ঘোড়ার লাগাম ধরে।
কয়েক মিনিটের ভেতর র্যাসেনের ঘোড়ায় জিন চাপানো হয়ে গেল। আমাকে উঠতে সাহায্য করলো লিও। তারপর বললো, আমরা চললাম। ভাগ্যে যা নির্ধারিত হয়ে আছে ঘটবে। কিন্তু, খানিয়া, যাওয়ার আগে তোমাকে ধন্যবাদ। জানাতে চাই, যথেষ্ট সদয় ব্যবহার করেছে আমাদের সাথে। আমি চাইনি তবু তোমার স্বামীর রক্তে আমার হাত রঞ্জিত হয়েছে। আমার ধারণা এই একটা, ঘটনাই আমাদেরকে চির বিচ্ছিন্ন রাখার জন্যে যথেষ্ট। তুমি ফিরে যাও। যদি কখনও কষ্ট দিয়ে থাকি, জানবে দিয়েছি অনিচ্ছায়। আমাকে ক্ষমা কোরো। বিদায়।
মাথা নিচু করে শুনলো, আতেন। শেষে বললো, তোমার নম্র কথার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু, লিও ভিসি, এত সহজে তো আমরা আলাদা হতে পারি না। তুমি আমাকে পাহাড়ে যেতে বলেছো, হ্যাঁ, আমি যাবো ওখানে। তোমার পেছন। পেছন আমিও যাবো এখানে। ঐ পাহাড়ের আত্মার সাথে সাক্ষাৎ করবো। আমার সমস্ত শক্তি এবং যাদুবিদ্যা প্রয়োগ করবো। দেখি কে জয়ী হয়।
আর কিছু না বলে এক লাফে ঘোড়ায় উঠলো আতেন। জল ঝাঁপিয়ে চলে গেল পাড়ের দিকে। অনুসরণ করলো বৃদ্ধ সিমব্রি।
কি বললো ও, বুঝলে কিছু? জিজ্ঞেস করলো লিও।
না, তবে আশা করা যায় শিগগিরই বুঝবো। এখন চলো, আমরা রওনা হই।
নিরাপদে নদীর ওপারে পৌঁছুলাম। নদীর এ অংশেও পানি হাঁটু ছাড়িয়ে উঠলো না। কাল রাতের মতো হেঁটে পার হয়ে গেলাম। পাড় থেকে সামান্য একটু যাওয়ার পরই শুরু হলো জলাভূমি। খুব বেশি গভীর নয়। নদী যেভাবে পেরিয়েছি সেভাবেই পেরোতে লাগলাম এ জায়গা। যথাসম্ভব দ্রুত এগোনোর চেষ্টা করছি আমরা। তাড়াতাড়ি পাহাড়ে পৌঁছানোর ইচ্ছা ছাড়াও এর পেছনে যা কাজ করছে তা হলো, খানিয়ার ভয়। কেন যেন মনে হচ্ছে রক্ষীদের আনতে গেছে আতেন। কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে থাকতে বলে এসেছে, এখন গিয়ে ডেকে আনবে অবাধ্য বিদেশীদের শায়েস্তা করার জন্যে।
