অচেতন হয়ে পড়তে পড়তেও কি করে যেন সজ্ঞান হলাম আমি। সম্ভবত কুকুরের কামড় থেকে হাত মুক্ত হয়ে যাওয়ায় আচমকা যে ব্যথা ঝাঁপিয়ে পড়লো তা-ই আমাকে সজ্ঞান করে দিয়েছে।
আর চিন্তা নেই, হোরেস, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো লিও। শামানের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে। তবু একবার দেখি চলে, নিশ্চিত হয়ে নেয়া যাক।
লিওর পেছন পেছন এগিয়ে গেলাম আমি। মরণ-শ্বাপদের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে যেমন দেখেছিলাম তেমনি পাথরে হেলান দিয়ে বসে আছে খান। নিঃশেষিত চেহারা। পাগলামির কোন চিহ্ন নেই চোখে। অসুস্থ শিশুর মতো বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
তোমরা খুব সাহসী, দুর্বল গলায় বললো সে। শক্তিশালীও। আমার কুকুরগুলোকে হত্যা করেছে, আমার মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। অবশেষে বুড়ো ইঁদুরের ভবিষ্যদ্বাণীই সত্য হলো। আমি ভুল করেছি। তোমাদের নয়, আতেনকেই শিকারের চেষ্টা করা উচিত ছিলো। যাহোক, আতেন রইলো। আমার মৃত্যুর প্রতিশোধ ও নেবে। আমার নয়, ওর নিজের স্বার্থেই নেবে। হলদে-দাড়ি, পারলে ওর হাতে পড়ার আগেই পাহাড়ে চলে যাও। অবশ্য তোমার আগেই আমি সেখানে পৌঁছাবো।
আর কিছু বলতে পারলো না র্যাসেন। ওর থুতনিটা ঝুলে পড়লো বুকের ওপর।
.
১২.
খুব একটা ক্ষতি হলো না পৃথিবীর, হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম আমি।
যা-ই হোক, বললো লিও, হতভাগ্য লোকটা মরে গেছে, ওর সম্পর্কে খারাপ কিছু আর না বলাই ভালো। সত্যিই হয়তো বিয়ের আগে ও সুস্থ ছিলো।
কি করে ওর এ দশা করলে?
তলোয়ারের নিচে দিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলাম। তারপর তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিলাম ঐ পাথরটার ওপর। ভাগ্য ভালো সময় মতো ওকে কায়দা করতে পেরেছিলাম, নইলে তোমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে যেতো। খুব বেশি ব্যথা পেয়েছে, হোরেস?
আমার একটা হাত চিবিয়ে মণ্ড বানিয়ে দিয়েছে, আর কিছু না! চলো, তাড়াতাড়ি নদীর কাছে চলে, পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তাছাড়া অন্য কুকুরগুলোও এসে পড়তে পারে।
আমার মনে হয় না ওরা আসবে। ঘোড়া দুটোকে শেষ করার আগে অন্য কোথাও যাবে না। একটু দাঁড়াও, আমি আসছি।
খানের তলোয়ার আর আমাদের বল্লম ও ছুরি দুটো কুড়িয়ে নিয়ে এলো লিও। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। এরপর কোন ঝামেলা ছাড়াই ধরে ফেললো র্যাসেনের ঘোড়াটা। কাছেই ঘাড় নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো বেচারা। ক্লান্ত বিধ্বস্ত।
উঠে পড়া, বুড়ো, বললো লিও। আর হাঁটা ঠিক হবে না তোমার। .
ওর সাহায্য নিয়ে উঠলাম আমি ঘোড়ার পিঠে। লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চললো লিও। তিন চারশো গজের বেশি হবে না নদীর তীর, কিন্তু ব্যথা আর ক্লান্তির কারণে এই পথটুকুই অসম্ভব দীর্ঘ মনে হতে লাগলো আমার।
অবশেষে পৌঁছুলাম নদীতীরে। ব্যথা, ক্লান্তি সব ভুলে ঘোড়া থেকে নেমে ঝাঁপিয়ে পড়লাম পানিতে। আমার পেছন পেছন সিও। চেঁ-চো করে পানি খেলাম, মুখ ধুলাম, তারপর আবার পানি খেলাম। পানির স্বাদ যে এমন অপূর্ব হতে পারে আগে কখনও বুঝিনি। মুখ, মাথা ডুবিয়ে দিলাম পানির ভেতর। একটু পরে প্রাণ ঠাণ্ডা হতে উঠলো লিও। জিজ্ঞেস করলোএবার? বেশ চওড়া নদী, মনে হচ্ছে একশো গজের বেশিই হবে। গভীরতা কেমন কে জানে? এখনই পার হওয়ার চেষ্টা করবো, না সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবো?
জানি না, দুর্বল গলায় জবাব দিলাম আমি। আমি আর এক পা-ও যেতে পারবো না।
তীর থেকে গজ তিরিশেক দূরে ছোট্ট একটা দ্বীপ। ঘাস আর নলখাগড়ার ঝোপে ছাওয়া।
ওখানে বোধহয় পৌঁছুতে পারবো, বললো লিও। তুমি আমার পিঠে ওঠো, দেখি চেষ্টা করে।
বিনাবাক্যব্যয়ে ওর নির্দেশ পালন করলাম। আস্তে আস্তে, পা দিয়ে নদীর তলা অনুভব করে করে চলতে লাগলো লিও। পানি খুব গভীর নয়। হাঁটুর ওপরে একবারও উঠলো না। কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই দ্বীপটার কাছে পৌঁছে গেলাম। আমাকে শুইয়ে দিয়ে লিও আবার চলে গেল তীরে। র্যাসেনের ঘোড়া আর অস্ত্রগুলো নিয়ে ফিরে এলো।
এরপর ও বসলো আমার ক্ষত পরিষ্কার করতে। পোশাকের হাতা অনেক পুরু হওয়া সত্ত্বেও মাংস ঘেঁতলে গেছে। একটা হাড় ভেঙে গেছে বলেও মনে হলো। নদী থেকে পানি এনে ক্ষতস্থানটা ধুয়ে দিলো লিও, রুমাল পেঁচিয়ে তার, ওপর দুর্বা ঘাসের প্রলেপ দিয়ে আবার একটা রুমাল পেঁচিয়ে বেঁধে দিলো। ও যখন এসব করছে সে সময় কখন যে আমি ঘুমিয়ে গেছি বা জ্ঞান হারিয়েছি জানি না।
.
হাতের অসহ্য যন্ত্রণা আমার ঘুম ভেঙে দিলো। চোখ মেলে দেখলাম ভোর হচ্ছে। কুয়াশার পাতলা একটা স্তর জমে আছে নদী এবং দ্বীপের ওপর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, আমার পাশেই গভীর ঘুমে নিমগ্ন লিও। একটু দূরে র্যাসেনের কালো ঘোড়াটা ঘাস খাচ্ছে। আবার চোখ বুজলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে জলের কুলকুল আওয়াজ ছাপিয়ে একটা শব্দ হলো। মানুষের কণ্ঠস্বর; কিন্তু লিওর নয়! চমকে উঠে বসলাম আমি। নলখাগড়ার ফাঁক ফোকর দিয়ে দেখতে পেলাম পাড়ের ওপর দুটো অশ্বারোহী মূর্তি। একজন নারী, একজন পুরুষ। এমন ভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, বুঝতে অসুবিধে হলো না, আমাদের পায়ের ছাপ পরীক্ষা করছে ওরা।
ওঠো! লিওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললাম, ওঠো, কারা যেন এসেছে।
এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়লো লিও। ছোঁ মেরে একটা বর্শা তুলে নিয়েছে। পাড়ের ওরা দেখতে পেলো ওকে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে মিষ্টি একটা গলা ভেসে এলো—অস্ত্র রেখে দাও, অতিথি, তোমার কোনো ক্ষতি করতে আমরা আসিনি।
