পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারতো, বললো লিও। পুরো পালটাই থাকতে পারতো। বলতে বলতে কোমর থেকে বড় হান্টিং নাইফটা খুলে হাতে নিলো ও। অন্য হাতে পিঠ থেকে খুলে নিলো ছোট্ট একটা বল্লম। সিমব্রির ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় দুটো বল্লম নিয়ে এসেছিলাম আমরা। খান জিজ্ঞেস করেছিলো, এগুলো দিয়ে কি করবো। জবাবে বলেছিলাম, অগ্নি-পর্বতের জংলীরা আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে পারবো। এখন জংলী নয় কালুনের খানের আক্রমণ ঠেকানো কাজে লাগছে ওগুলো। আমিও এক হাতে আমার হান্টিং নাইফ আর অন্য হাতে বল্লম নিয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম।
আর মাত্র কয়েক গজ দূরে কুকুরগুলো। তীব্র চিৎকারে কানে তালা ধরে যাওয়ার অবস্থা। একেবারে সামনের কুকুরটা লাফ দিলো আমাকে লক্ষ্য করে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ভয়ানক আতঙ্কে আমার কলজেটা গলার কাছে উঠে আসতে চাইলো—সিংহের মতো আকার একেকটা কুকুরের। তবে হ্যাঁ, আতঙ্কে বোধশক্তি লুপ্ত হলো না। কুকুরটা লাফ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও বল্লমধরা হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। শরীরের পুরো ওজন নিয়ে বল্লমের ফলার ওপর পড়লো ওটা। সামনের দুপায়ের মাঝ বরাবর গেঁথে গেল ফলা। প্রবল ধাক্কায় চিৎ হয়ে পড়ে যাওয়ার অবস্থা হলো আমার। হাত থেকে ছুটে গেল বল্লমের আঁটি। অনেক কষ্টে তাল সামলে যখন সোজা হলাম তখন বুকে বল্লম গাঁথা অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে কুকুরটা, সেই সঙ্গে রক্ত হিম করা স্বরে মরণ আর্তনাদ।
অন্য দুটো কুকুর এক সঙ্গে আক্রমণ করেছে লিওকে। কিন্তু ওর গায়ে দাঁত বসাতে পারেনি এখনও। পোশাকের বেশ খানিকটা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে একটা। বোকার মতো সেটার দিকে বল্লম চালালো লিও। ফস্কে গেল আক্রমণটা। বল্লমের ফলা গভীরভাবে গেঁথে গেল মাটিতে। সেই মুহূর্তে আর আক্রমণ করলো না কুকুর দুটো। হয়তো এক সঙ্গীর মৃতদেহ দেখে থমকে গেছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দাঁত মুখ খিচিয়ে চিৎকার করতে লাগলো ওরা। দুটো বল্লমই হাত ছাড়া হয়ে গেছে, তাই কিছু করতে পারলাম না আমরা।
ইতিমধ্যে স্থান পৌঁছে গেছে। অদ্ভুত এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠেছে তার মুখে। প্রথমে ভাবলাম হামলা করার সাহস পাবে না। কিন্তু ওর চোখে চোখ পড়তেই বুঝলাম, হামলা করবেই। ঘৃণা, ঈর্ষা, আর শিকারের উত্তেজনায় বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে আধপাগল লোকটা। ওর দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে, ও এসেছে হয় মারবে নয় মরবে বলে। ঘোড়া থেকে নেমে তলোয়ার বের করলো সে। শিস বাজিয়ে কুকুর দুটোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তলোয়ার উঁচিয়ে ইশারা করলো আমার দিকে। মুহূর্তে লাফিয়ে উঠলো জন্তুদুটা। লিওর দিকে ছুটে গেল সে নিজে।
আমার হান্টিং নাইফ বাট পর্যন্ত ঢুকে গেল একটা কুকুরের পেটে। শূন্য থেকে মাটির ওপর আছড়ে পড়ে স্থির হয়ে রইলো সেটা। কিন্তু অন্যটা কামড়ে ধরলো আমার হাত, কনুইয়ের খানিকটা নিচে। হাড়ের সাথে কুকুরটার দাঁতের ঘষা খাওয়ার শব্দ হলো। তীব্র যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম আমি। হাত থেকে খসে পড়ে গেল ছোরা।
ভয়ঙ্কর জন্তুটা হাত কামড়ে ধরে আছে আমার। সামনে ঝাকাচ্ছে আর টানছে। সর্বশক্তিতে ওটার পেটে একটা লাথি মারা ছাড়া আর কিছু আমি করতে পারলাম না। বলশালী শ্বাপদের প্রবল ঝাঁকুনির মুখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে হলো। এখনও কুকুরটা ঝাকাছে আমাকে, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলার চেষ্টা করছে। এমন সময় আমার মুক্ত হাতটা একটা পাথরের ওপর পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে আঁকড়ে ধরলাম কমলার চেয়ে সামান্য বড় পাথরটা। তুলে এনে সর্বশক্তিতে ঘা মারলাম জন্তুটার মাথায়। আশ্চর্য! বিন্দুমাত্র শিথিল হলো না কুকুরের কামড়।
ধস্তাধস্তি করছি আমি আর কুকুরটা। একবার এদিকে ঘুরতে হচ্ছে একবার ওদিকে। একবার কুকুরটা টানছে, একবার আমি। আমি চেষ্টা করছি কুকুরটাকে নিচে ফেলে ওপরে উঠে বসার, তাহলে হয়তো একটু সুবিধা করতে পারবো। কিন্তু কিছুতেই বাগে আনতে পারছি না ওটাকে। হাতটা যদি মুক্ত করতে পারতাম কোনো ভাবে!
ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছি আমি। এখনও এক বিন্দু শিথিল হয়নি কুকুরের কামড়। মাথার ভেতর আঁ আঁ করছে। এবার মুখ থুবড়ে পড়বো। হ্যাচকা এক টানে আমাকে এক দিকে ঘুরিয়ে দিলো কুকুরটা। মনে হলো লিও আর খানকে মাটিতে পড়ে ধস্তাধস্তি করতে দেখলাম যেন। একটু পরেই আরেক পাক ঘোরার। সময় দেখলাম, একটা পাথরে হেলান দিয়ে বসে আছে খান, আমার দিকে চোখ। নিজের এই ভয়ানক বিপদের মধ্যেও তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো হৃৎপিণ্ডটা। মেরে ফেলেছে লিওকে! এখন কুকুরটা আমাকে কি করে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো। করে তাই দেখছে তারিয়ে তারিয়ে!
এরপর বেশ কিছুক্ষণ অন্ধকার। কিছু মনে নেই আমার। হঠাৎ হাতের তীব্র যন্ত্রণাকাতর টান শিথিল হয়ে এলো। যেন ঘুমের ঘোরে চমকে চোখ মেললাম। আমি। সেই মুহূর্তে দেখলাম বিশাল শ্বাপদটা আকাশে উঠে যাচ্ছে। তারপর আরও আশ্চর্য, শূন্যে পাক খাচ্ছে ওটা! ভালো হাতটা দিয়ে চোখ ডললাম। হ্যাঁ! শূন্যে পাক খাচ্ছে জানোয়ারটা, লিও তার পেছনের এক পা ধরে মাথার ওপর তুলে ঘোরাচ্ছে আর এগিয়ে যাচ্ছে একটা বড় পাথরের দিকে।
ঠক! পাথরের ওপর আছড়ে দিলো। লিও কুকুরটার মাথা। তারপর ছেড়ে দিলো ওর পা। নিষ্পন্দ পড়ে রইলো সেটা মাটির ওপর।
