ঢাল বেয়ে কিছুদূর নামার পর বিরাট দুটো পাথরের স্কুপের মাঝ দিয়ে যাওয়ার জন্যে এক দিকে মোড় নিতে হলো সেই মুহূর্তে দেখতে পেলাম কুকুরের পালটা খুব বেশি হলে তিনশো গজ পেছনে রয়েছে। শ্বাপদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে অবশ্য। সম্ভবত ছুটতে ছুঁটতে ক্লান্ত হয়ে পথের মাঝে থেমে পড়েছে কয়েকটা। তবে এখনও যে আছে তা-ও কম নয়। তার ওপর ওদের সামান্য পেছনেই ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে খান। তার বদলী ঘোড়াটা নেই, বোধহয় সেটার পিঠেই এখন ও বসে আছে, অন্যটাকে বিশ্রাম নেয়ার জন্যে ছেড়ে দিয়ে এসেছে কোথাও।
আমাদের ঘোড়াগুলোও দেখলো ওদের। সঙ্গে সঙ্গে পাখা পেলো যেন ওরা। এখন আর আমাদের তাড়ায় নয়, প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ছুটছে ওরা। বেশ কিছুক্ষণ স্থির রইলো কুকুরের পাল আর আমাদের মাঝের ব্যবধান। আর সামান্য গেলেই নদীর পাড়ে পৌঁছে যাবে। এই সময় আবার কমতে শুরু করলো ব্যবধান। কিছুতেই কি ক্লান্ত হয় না শ্বাপদগুলো?
দূরত্ব কমে দুশো গজেরও নিচে চলে এসেছে। প্রতি মুহূর্তে আরও কমে আসছে। সামনে ছোটখাট একটা বন দেখতে পেয়ে চিৎকার করলাম আমি লিও, সামনে দিয়ে ঘুরে ওই বনের ভেতর ঢুকে পড়ো।
বনটার ভেতর ঢুকে মাত্র ঘোড়া থেকে নেমেছি কি নামিনি, তীব্র চিৎকার করতে করতে আমাদের পঞ্চাশ গজের কম দূর দিয়ে চলে গেল কুকুরের পাল।
গন্ধ শুঁকে শুঁকে এক্ষুণি চলে আসবে ওরা, চেঁচালাম আমি, দৌড়াও, লিও, ঐ পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিতে হবে। বলেই ছুটলাম শখানেক গজ দূরে,প্রকাণ্ড পাথরের চাঙড়টার দিকে।
ঘোড়র পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এখন বনের দিকেই আসছে কুকুরগুলো। ভাগ্য ভালো আমাদের, ওরা এসে পড়ার আগেই পাথরটার আড়ালে চলে যেতে পারলাম। ইতিমধ্যে প্রাণভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটতে শুরু করেছে ঘোড়া দুটো। তাদের ধাওয়া করে চলেছে শ্বাপদের পাল। এবারও ভাগ্য সহায়তা করলো আমাদের, আমরা যেখানে আছি তার উল্টোদিকে ছুটছে ঘোড়াগুলো। তার মানে আপাতত কিছুক্ষণের জন্যে আমরা নিরাপদ।
কুকুরগুলো বন পেরিয়ে যেতেই আবার ছুটলাম আমরা, নদীর দিকে। যতখানি সম্ভব এগিয়ে যেতে চাই। দৌড়াতে দৌড়াতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম একবার। চাঁদের আলোয় দূরে দেখতে পেলাম, মাঠের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের ঘোড়াদুটো। পেছন পেছন ছুটছে কুকুরগুলো। এখনও ওদের ভেতর ব্যবধান বেশ, কিন্তু কতক্ষণ থাকবে বুঝতে পারছি না। খানকেও দেখতে পেলাম, ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে ফেরানোর চেষ্টা করছে শাপদগুলোকে। পারছে না। ঘোড়া দুটোর পেছনে ছুটতেই বেশি উৎসাহ বোধ করছে ওরা।
এদিকে সামান্য একটু দৌড়েই হাঁপাতে শুরু করেছি আমি। যৌবন পেরিয়ে এসেছি অনেক আগে, এমনকি প্রৌঢ়ত্বও। একটু শক্ত-পোক্ত, কিন্তু বৃদ্ধ বই তো নই, এ বয়সে কত ধকল সহ্য করতে পারে শরীর? কাল মাঝ রাত থেকে একটু আগ পর্যন্ত বলতে গেলে ঘোড়ার পিঠেই কেটেছে। এর ভেতর খেয়েছি মাত্র একবার, তাও না খাওয়ার মতো।
পেছনে আবার শুনতে পেলাম মরণ-শ্বাপদের চিৎকার। ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, ঘোড়ার পিঠে ঋজু হয়ে বসে আছে খান র্যাসেন। ডাকাডাকি করে গোটা তিনেক কুকুরকে ছুটিয়ে আনতে পেরেছে ঘোড়াগুলোর লেজ থেকে। এখন আমাদের ওপর লেলিয়ে দিচ্ছে। প্রভুর মুখের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেণ্ড ঘেউ ঘেউ করলো কুকুরগুলো, তারপর লেজ উঁচিয়ে ছুটে আসতে লাগলো আমাদের দিকে।
কিন্তু আমি আর পারছি না। পাথরের মতো ভারি মনে হচ্ছে পা দুটো। কোমর ধরে গেছে, শিরদাঁড়া টনটন করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুণি বসে পড়ি। এবার বোধহয় সাঙ্গ হলো সাধের জীবন! দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি।
দৌড়াও, দৌড়াও, লিওর দিকে তাকিয়ে বললাম। আমি এখানে রইলাম, কয়েক মিনিট অন্তত ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবো। এই ফাঁকে তুমি চলে যাও, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ো।
দাঁড়িয়ে পড়লো লিও। আস্তে কথা বলো, ওরা শুনে ফেলবে, নিচুস্বরে বলতে বলতে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার হাত ধরে নিয়ে চললো টানতে টানতে।
নদীর মোটামুটি কাছে পৌঁছে গেছি আমরা। চাঁদের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি পানিতে। কুকুরের শব্দও কাছে এসে গেছে। এখন আর শুধু ঘেউ ঘেউ নয়, শুকনো মাটিতে ওদের পা ফেলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি, খানের ঘোড়ার খুরের শব্দও
এখন আমরা যে জায়গায় পৌঁছেছি সেখানে ছড়িয়ে আছে ছোট বড় নানা আকারের অসংখ্য পাথরের চাই। পথ বলতে কিছু নেই। নদীর প্রান্ত এখনও কয়েকশো গজ দূরে। এমন জায়গার ওপর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। হোঁচট খেয়ে পড়ে দাঁত-মুখ ভাঙার সম্ভাবনা ষোলা আনা। আস্তে আস্তে যেতে হবে। আর আস্তে গেলে তীরে পৌঁছানোর আগেই ধরে ফেলবে শ্বাপদগুলো। আমার মতো লিও-ও বুঝতে পেরেছে ব্যাপারটা। লাভ নেই হোরেস, বলে উঠলো ও, পারবো না আমরা। তারচেয়ে দাঁড়াও, দেখি শেষ পর্যন্ত কি ঘটে।
থেমে মুখোমুখি হলাম আমরা র্যাসেন আর তার কুকুরদের। বিরাট একটা চাঙড়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালাম। হা এসে গেছে ওঁরা। সোজা আমাদের লক্ষ্য করে ছুটে আসছে তিনটে প্রকাণ্ড লাল কুকুর সত্যিই এত বড় কুকুর আমি জীবনে দেখিনি। কয়েক গজ পেছনেই খান। এখনও সেই ঋজু ভঙ্গিতে বসে আছে ঘোড়ার পিঠে। আশ্চর্য প্রাণশক্তি লোকটার! আমাদের মতোই একটানা ছুটে আসছে কালুন থেকে, কিন্তু ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই অভিব্যক্তিতে।
