একটু পরে ধূসর হয়ে এলো আকাশ। পথের পাশে ক্ষেতে নামিয়ে দিলাম ঘোড়া দুটোকে। বেশিক্ষণ লাগলো না ওদের পেট ভরতে। কিছু দূরে একটা খালে নিয়ে গিয়ে পানি খাওয়ালাম। তারপর আবার ছুটে চলা।
সূর্য ওঠার কিছুক্ষণের ভেতর মাঠের এখানে ওখানে দেখা যেতে লাগলো কৃষকদের। সাত সকালে চলে এসেছে কাজ করতে। আমাদের ওপর দৃষ্টি পড়া মাত্র হাঁ করে চেয়ে রইলো ওরা, কালুন নগরীর লোকরা যেমন তাকিয়ে থাকতো তেমন। দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওরা বুঝে ফেলেছে আমরা কারা। অনেকেই চিৎকার করে বললো, তোমরা যাও, আমাদের বৃষ্টি ফিরিয়ে দাও। এক গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসীরা লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণই করে বসলো। তীর বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে সেযাত্রা রক্ষা পেলাম আমরা।
সন্ধ্যা নাগাদ ধারণা করলাম, কালুনের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। এমন ধারণার কারণ, এক জায়গায় বেশ দূরে দূরে কয়েকটা পর্যবেক্ষণ চূড়া দেখতে পেলাম। তবে কোনো সৈনিক বা রক্ষী দেখলাম না। সম্ভবত প্রাচীনকালে, কালুনের খানরা যখন বহিঃশত্রুর আক্রমণ আশঙ্কা করতো তখন তৈরি করা হয়েছিলো চূড়াগুলো। এখনকার শাসকশ্রেণী বাইরের আক্রমণ আশঙ্কা করে না, তাই পাহারা রাখারও প্রয়োজন বোধ করেনি।
পর্যবেক্ষণ চূড়াগুলো পেরিয়ে কিছুদূর আসার পর সূর্য ডুবে গেল। ঘোড়াগুলোকে একটু বিশ্রাম দেয়ার জন্যে থামলাম আমরা। চাঁদ উঠলেই আবার রওনা হবো।
জিন খুলে নিয়ে ঘোড়া দুটোকে ছেড়ে দিলাম চরে বেড়ানোর জন্যে। আশেপাশে পানি নেই। তবে ও নিয়ে ভাবলাম না। ঘণ্টাখানেক আগে পথের পাশের এক জলা থেকে ওদের পানি খাইয়ে নিয়েছি। আপাতত পানি না খেলেও চলবে। কাল রাতে প্রাসাদ ছেড়ে বেরোনোর আগে কিছু খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম, তার খানিকটা খেয়ে নিলাম আমরা। সারারাত এবং দিনের ছুটে চলা শেষে খাবারটুকুর সত্যিই খুব প্রয়োজন বোধ করছিলাম। কিছুক্ষণ ঘাস খেলে ঘোড়াগুলো। তারপর ক্লান্তি দূর করার জন্যে গড়াগড়ি করতে লাগলো; পিঠ মাটিতে, পা-গুলো আকাশে। আমরা ঘাসের ওপর বসে দেখতে লাগলাম ওদের গড়াগড়ি খাওয়া।
একটু একটু করে আঁধার হয়ে আসছে চারদিক। ঘোড়াগুলোর গড়াগড়ি শেষ। ধীরে ধীরে পা নামিয়ে আনলো ওরা। প্রথমে আমার ঘোড়াটা। লিও বসে ছিলো ওটার কাছেই।
আরে ওর খুরগুলো অমন লাল কেন? বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো ও। কেটে গেছে নাকি?
দিন শেষের অস্পষ্ট আলোয় আমিও এবার খেয়াল করলাম লাল দাগগুলো। উঠে গেলাম পরীক্ষা করার জন্যে। স্মরণ করার চেষ্টা করলাম লাল মাটির কোনো এলাকা দিয়ে এসেছি কিনা। মনে পড়লো না। বসে এক হাতে তুলে নিলাম ঘোড়াটার এক পা। বিশ্রী একটা গন্ধ ঝাঁপটা মারলো নাকে। কস্তুরী এবং গরম মসলার সঙ্গে রক্ত মেশালেই কেবল এমন গন্ধ ছুটতে পারে।
আশ্চর্য! অবশেষে বললাম আমি। দেখি, লিও, তোমার ঘোড়ার পা–।
এক অবস্থা এটারও। উৎকট গন্ধওয়ালা কোনো জিনিসে চুবিয়ে নেয়া হয়েছিলো খুরশুলো।
খুব বেশি চাপ পড়লেও খুরের যেন ক্ষতি না হয় সেজন্যে স্থানীয়দের কোনো পদ্ধতি বোধহয়, বললো লিও। আমরা যেমন নাল ব্যবহার করি অনেকটা তেমন আর কি।
এক মুহূর্ত ভাবলাম। ভয়ঙ্কর একটা চিন্তা উঁকি দিয়ে গেল আমার মনে।
না, লিও, আমার তা মনে হয় না। আমি তোমাকে ঘাবড়ে দিতে চাই না, তবে—তবে আমার মনে হচ্ছে, এক্ষুণি রওনা হয়ে গেলেই আমরা ভালো করবো।
কেন?
আমার ধারণা এটা ঐ খানেরই কীর্তি।
খানের কীর্তি! কি কারণে ও এমন করবে? ঘোড়াগুলোকে খোড়া করে দিতে চায়?
না, লিও, ও চায় ওরা ছোটার সময় শুকনো মাটিতে তীব্র গন্ধ রেখে যাক।
চমকে উঠলো লিও। মানে–মানে তুমি বলতে চাও, ঐ কুকুরগুলো?
মাথা ঝাঁকালাম আমি। এবং কথা বলে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে জিন চাপালাম ঘোড়ায়। শেষ ফিতেটা সবে বাঁধা হয়েছে কি হয়নি, দূর থেকে ভেসে এলো অস্পষ্ট আওয়াজ।
শুনেছো? বললাম আমি। আবার এলো শব্দ। এবং এবার কোনো সন্দেহ রইলো না, ওগুলো কুকুরের ডাক।
ও ঈশ্বর। মরণ-শ্বাপদ! চিৎকার করলো লিও।
হ্যাঁ, আমাদের পরম বন্ধু খান শিকারে বেরিয়েছে। এতক্ষণে বুঝতে পারছি ওর সেই হাসির মর্ম।
এখন কি করবো আমরা? ঘোড়াগুলো রেখে হেঁটে যাবো?
পাহাড়টার দিকে তাকালাম। ওটার পাদদেশের সবচেয়ে কাছের অংশ এখনও বহু বহু মাইল দূরে।
উঁহুঁ, পায়ে হেঁটে অত দূর যেতে পারবো না,,পারলেও সে সুযোগ বোধহয় পাওয়া যাবে না। প্রথমে ঘোড়াগুলোকে ছিঁড়ে খাবে কুকুরের পাল, তারপর বিড়াল যেমন ইঁদুর ধরে তেমনি করে ধরবে আমাদের। না, লিও, ঘোড়ায় চড়েই যেতে হবে।
লাফ দিয়ে জিনের ওপর চড়ে বসলাম। লাগামে টান দেয়ার আগে একবার ঘাড় ফিরিয়ে চাইলাম। সন্ধ্যার অস্পষ্ট আলোয় দূরে দেখতে পেলাম এক দঙ্গল খুদে খুদে অবয়ব। সেগুলোর মাঝে এক অশ্বারোহী। লাগাম ধরে অন্য একটা ঘোড়া ছুটিয়ে আনছে পেছন পেছন।
পুরো পাল নিয়ে আসছে, গম্ভীর ভাবে বললো লিও। বদলি ঘোড়াও আছে সঙ্গে।
ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম আমরা।
.
মৃদু ঢালের একটা চূড়া অতিক্রম করলাম। তারপরই শুরু হলো উঁচু নিচু পাথুরে, জমি। ধীরে ধীরে ঢালু হয়ে একটা নদীতে গিয়ে মিশেছে। মাঝে মাঝে ছোট বড় ঝোপঝাড়। কয়েক মাইল নিচে দেখতে পাচ্ছি পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া নদীটা। দুঘণ্টা একটানা ছুটিয়ে নিয়ে চলেছি ঘোড়াগুলোকে। ঘোড়ায়। চড়ার যতরকম কৌশল জানা আছে সব প্রয়োগ করে যথাসম্ভব গতিবেগ আদায় করার চেষ্টা করছি। কিন্তু লাভ হচ্ছে না। ক্রমশ কমছে তাড়া করে আসা শ্বাপদের পালের সঙ্গে আমাদের ব্যবধান। এখন অনেক কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ। আধ মাইল দূরে কিনা সন্দেহ।
