চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো খান। একটা হাত আনমনা ভঙ্গিতে দুলছে শরীরের পাশে। হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো সে। আমি ভাবছি, হাসি থামিয়ে বললো, আতেন যখন জানবে পাখি পালিয়েছে, তখন কি করবে? আমার ওপর খেপে উঠবে, তোমার খোঁজে তোলপাড় করে ছাড়বে সারা দেশ।
উহুঁ, আমার মনে হয় না যতটুকু রেগেছে তার চেয়ে বেশি রাগার কিছু আছে, আমি বললাম। আপনি সামাদের একটা রাত সময় দেবেন শুধু, আর দেখবেন খোঁজ শুরু করতে যেন একটু দেরি হয়। ব্যস আর চিন্তা নেই, আমাদের খুঁজে পাবে না।
তুমি ভুলে গেছো, ঐ বুড়ো ইদুর যাদু জানে। কোন পথে তোমরা আসবে তা যখন জানতে পেরেছে, কোথায় খুঁজতে হবে তা-ও জানতে পারবে। তবু, তবু ওর চেহারা কেমন হয় দেখার লোভ আমি সামলাতে পারছি না, ও, হলদে-দাড়ি, তুমি কোথায়, হলদে-দাড়ি? ফিরে এসো, হলদে-দাড়ি, তোমার বরফ গলাতে দাও। শেষের কথাগুলো আতেনের স্বর নকল করে বলে গেল সে। তারপর আবার হেসে উঠলো হা-হা করে। আচমকা হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কতক্ষণের ভেতর তৈরি হতে পারবে তোমরা?
আধ ঘণ্টা, আমি জবাব দিলাম।
বেশ, তোমাদের ঘরে চলে যাও। তৈরি হতে লাগো, আমি এক্ষুণি আসছি।
১১-১৫. শূন্য কামরা পেরিয়ে বারান্দায়
১১.
শূন্য কামরা পেরিয়ে বারান্দায়, এলাম। বারান্দা থেকে উঠানে। খান পথ দেখাচ্ছে। উঠানে পৌঁছুতেই সে ফিসফিস করে বললো, ছায়ায় ছায়ায় এসো।
আকাশে পূর্ণ চাদ। স্পষ্ট আলোয় হাসছে চারদিক। এখনও কাউকে দেখিনি, আমাদেরও কেউ দেখেনি বলেই মনে হয়। তবু ভেবে পেলাম না, শেষ পর্যন্ত প্রাসাদ ফটুক বা নগর তোরণ পেরোবো কি করে। ওসব জায়গায় খানিয়ার নির্দেশে প্রহরীর সংখ্যা দ্বিগুণ করা হয়েছে।
দরজার দিকে গেল না খান। ওটাকে ডানে রেখে সরু একটা পথ ধরে প্রাসাদের প্রাচীরের কাছে নিয়ে এলো আমাদের। জায়গাটা ঝোপঝাড়ে ছাওয়া। ঝোপের পেছনে ছোট একটা গুপ্ত দরজা। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুললো র্যাসেন। দরজা পেরিয়ে দেখলাম সামনে প্রাসাদের বাইরের দেয়াল ঘেরা বাগান। ফটকের দিকে এগিয়ে চললাম আমরা খানের পেছন পেছন।
আর সামান্য গেলেই প্রাসাদ ফটক। এই সময় একটা অন্ধকার ঝোপ দেখিয়ে আমাদের অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল খান। একটু ভয় ভয় করতে লাগলো আমাদের। এখন যদি খান চার-পাঁচজন বিশ্বস্ত লোক নিয়ে এসে আমাদের ওপর চড়াও হয়? খুন করে লাশ গুম করে ফেলে?
কিন্তু না, তেমন কিছু ঘটলো না। দুটো সাদা ঘোড়া নিয়ে ফিরে এলো র্যাসেন একটু পরেই।
উঠে পড়ো, ফিসফিস করে সে বললো, আমার মতো মুখ ঢেকে নাও আলখাল্লা দিয়ে।
বিনাবাক্যব্যয়ে নির্দেশ পালন করলাম আমরা।
এবার এসো আমার পেছন পেছন, বলে দৌড়াতে শুরু করলো খান। প্রাচীনকালের অভিজাত বা জমিদারদের আগে আগে যেমন দৌড়বিদ দৌড়াতো তেমন। আমরাও ঘোড়া ছোটালাম। কেউ বাধা দেয়ার আগেই পেরিয়ে গেলাম উঁচু পাচিল ঘেরা বাগানের ফটক। রক্ষীরা পিছু নিলো না; সম্ভবত ভাবলো কালুনের দুই অভিজাত ব্যক্তি খান বা খানিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।
শহরের প্রধান সড়ক ছেড়ে অলিগলি দিয়ে আমাদের নিয়ে চললো র্যাসেন। রাত এখন অনেক। পথে খুব একটা লোকজনের সাথে দেখা হলো না। একটু পরে নগর প্রাচীর পেরোলাম। সামনে নদী। আসার সময় যেখানে নৌকা থেকে নেমেছিলাম সেদিকে গেল না খান। অন্য একটা পথ ধরে ছোট একটা জেটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। লাগাম টেনে ধরলাম আমরা। জেটির সঙ্গে বাঁধা একটা খেয়া নৌকা।
ঘোড়াসুদ্ধ এই খেয়ায় চড়ে নদী পেরোতে হবে তোমাদের, বললো র্যাসেন। পুলগুলো সব পাহারা দিচ্ছে রক্ষীরা। নিজেকে প্রকাশ না করে ওগুলোর কোনোটা দিয়ে তোমাদের পার করে দিতে পারবো না।
একটু কষ্ট হলো, তবে শেষ পর্যন্ত ঘোড়া দুটোকে ওঠাতে পারলাম নৌকায়। আমি লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম, দাঁড় তুলে নিলো লিও।
নদীর মাঝামাঝি পৌঁছুইনি তখনও, জেটির ওপর থেকে ভেসে এলো অট্টহাসির শব্দ। তারপর র্যাসেনের কণ্ঠস্বর-পালাও, বিদেশীরা, জলদি পালাও, পেছনেই আসছে মৃত্যু, হা-হা-হা-হা… ঘুরে দাঁড়ালো সে। পেছনে আলখাল্লা উড়িয়ে দ্রুত নেমে গেল জেটি থেকে।
অশুভ আশঙ্কায় পূর্ণ হয়ে উঠলো আমাদের অন্তর। কিছু একটা ফন্দি এঁটেছে খান। কিন্তু কি, বুঝতে পারছি না।
বেয়ে চলো, লিও, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম।
নদীতে স্রোত প্রবল বলে সরাসরি ওপারে গিয়ে পৌঁছুতে পারলাম না। নৌকা তীরে নিতে নিতে স্রোতের টানে ভাটির ঠিকে বেশ খানিকটা চলে গেলাম। অবশেষে তীরে নামলাম আমরা। ঘোড়া দুটোকে নামালাম। তারপর ওদের পিঠে উঠে ছুটিয়ে দিলাম দূরে পাহাড়-চূড়ার গনগনে আভা লক্ষ্য করে।
প্রথম কিছুক্ষণ বেশি দ্রুত এগোতে পারলাম না, কারণ কোনো পথ খুঁজে পেলাম না। মাঠের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। অবশেষে একটা গ্রামের কাছে পৌঁছে পথের দেখা পাওয়া গেল। এবার একটু জোরে ঘোড়া ছোটাতে পারলাম।
সারারাত একটানা ছুটে চললাম। ভোরের কিছু আগে চাঁদ ডুবে গেল। অন্ধকার হয়ে গেল চারদিক। দূরে অগ্নি-পর্বতের চূড়ায় লাল একটা আভা ছাড়া আর কোনো আলো দেখতে পাচ্ছি না। পথে কোথাও খানাখন্দক আছে কিনা জানি না। আপাতত কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি করার সিদ্ধান্ত নিলাম। নিজেদের, এবং ঘোড়াগুলোকেও একটু বিশ্রাম দিতে হবে।
