নিঃশব্দে, পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলো আতেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করলো আমাদের।
অতিথিরা, বললো সে, আমার সম্পূর্ণ অনিচ্ছায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনার জন্যে আমি ক্ষমা চাইছি। কি করবে বলো দুর্নীতির পঙ্কে নিমজ্জিত অশুভ এক দেশে তোমরা এসেছে। খান র্যাসেন, তোমার নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গেছে, আমি তাকে ত্বরান্বিত করতে চাই না। কারণ, সামান্য সময়ের জন্যে হলেও অন্তত একবার আমরা সত্যিই কাছাকাছি এসেছিলাম। চাচা সিমব্রি, আমার সাথে চলো। আমার এখন অবলম্বন দরকার, তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার?
উঠে দাঁড়িয়ে পায়ে পায়ে এগোলো বৃদ্ধ শামান। খানের সামনে পৌঁছে থামলো একটু। স্থির চোখে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দৃষ্টি বুলালো। তারপর বললো-আমার চোখের সামনে তোমার জন্ম, র্যাসেন, অশুভ এক মেয়েমানুষের গর্ভে, আমি ছাড়া আর কেউ জানে না তোমার বাপের পরিচয়। সে রাতে অগ্নি পর্বতের চূড়ায় আগুন লকলকিয়ে উঠেছিলো, তারারা মুখ লুকিয়েছিলো লজ্জায়। তোমাকে বড় হয়ে উঠতে দেখেছি আমি, র্যাসেন, তোমার লাম্পট্যও দেখেছি, তোমারই বিয়ের ভোজ থেকে তুমি উঠে গিয়েছিলে এক স্বৈরিণীর গলা জড়িয়ে ধরে। চাষীদের উর্বরা চাষের জমি কেড়ে নিয়ে তুমি বাগান বানিয়েছে। যাদেরটা নিলে তারা বাঁচলো কি মরলো দেখারও প্রয়োজন বোধ করেনি। ভেবেছো এসবের প্রতিফল তুমি পাবে না? অবশ্যই পাবে, খান র্যাসেন, কি ভয়ঙ্কর প্রতিফল তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। শিগগিরই তুমি মরবে, র্যাসেন, যন্ত্রণাদায়ক রক্তাক্ত মৃত্যু তোমাকে গ্রাস করবে। তোমার চেয়ে যোগ্য কেউ তখন তোমার জায়গা দখল করবে। দেশে স্বস্তি ফিরে আসবে।
ভয়ে কাঁটা হয়ে শুনছি আমি। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে, এই বোধহয় খান তলোয়ার বের করে দুটুকরো করে ফেললো বৃদ্ধকে। কিন্তু আশ্চর্য, তেমন কিছু করলো না র্যাসেন, বরং কুঁকড়ে গেল যেন। পা পা করে পিছিয়ে গেল তার সেই কোনায়। দৃষ্টি নেমে এসেছে মাটিতে, থুতনি ঠেকেছে গলায়।
আতেনের পাশে গিয়ে তার হাত ধরলো সিমব্রি। দরজার কাছে পৌঁছে ঘুরে দাঁড়ালো আবার। একই রকম নিরুদ্বেগ, নিষ্কম্প গলায় বললো, খান র্যাসেন, আমি তোমাকে তুলেছি, আমিই তোমাকে নামিয়ে আনবো। রক্তাক্ত অবস্থায় যখন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে তখন স্মরণ কোরো আমার কথা।
ওদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। কোনা থেকে বেরিয়ে এলো রাসেন।
গেছে ওরা? হাত দিয়ে ঘেমে ওঠা ভুরু মুছতে মুছতে সে জিজ্ঞেস করলো।
হ্যাঁ, জবাব দিলাম আমি।
আমাকে কাপুরুষ ভাবছো? কাঁপা কাঁপা গলায় বললো সে। সত্যি বলছি, আমি ওদের ভয় পাই, হলুদ-দাড়ি, সময় হলে তোমাকেও পেতে হবে। উহ! কি ভয়ানক মেয়েমানুষ। স্বামী হিসেবে ওর শোয়ার ঘরে ঢোকার চেয়ে রাঁধুনী হিসেবে রান্নাঘরে ঢুকলেই ভালো করতাম। প্রথম থেকেই আমাকে ঘৃণা করে। এবং যতই আমি গভীরভাবে ভালোবাসতে চেয়েছি ততই ও ঘৃণা করেছে আমাকে। এখন আমি বুঝতে পারছি, কেন, ভুরু কুঁচকে লিওর দিকে তাকালো র্যাসেন। বুঝতে পারছি কেন ও সব সময় অমন শীতল থেকেছে—কারণ, একজন মানুষ। এমন একজন মানুষ যার মনের বরফ গলানোর জন্যে ও তুলে রেখেছিলো ওর হৃদয়ের উষ্ণতা, আমাকে বা কাউকে বিতরণ করেনি একবিন্দু।
এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলো লিও। এবার এগিয়ে এলো দুপা। জিজ্ঞেস করলো, একটু আগের কথাবার্তায় আপনার কি মনে হয়েছে, খান? বরফ গলতে শুরু করেছে?
না—অবশ্য আমার ধারণা, তার কারণ আগুন এখনও ভালো করে জ্বলে ওঠেনি। আতেনকে আমি চিনি, এত সহজে ও শান্ত হবে না।
এবং বরফ যদি আগুনের ওপর গিয়ে পড়তে চায়? শুনুন, খান, ওরা বলছে আমি নাকি আপনাকে হত্যা করবো, কিন্তু আমার তেমন কোনো ইচ্ছে নেই। আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনার স্ত্রীকে আমি ভাগিয়ে নিয়ে যাবো, সত্যি বলছি তেমন কোনো ইচ্ছেও আমার নেই। আমি আর আমার এই সঙ্গী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে চাই আপনাদের এই শহর ছেড়ে। দিন রাত যেভাবে আমাদের পাহারা দিয়ে রাখা হয়েছে, একমাত্র আপনিই পারেন আমাদের মুক্ত করে দিতে। তাতে আপনিও বাঁচবেন আমরাও বাঁচবো।
ধূর্ত চোখে তাকালো ওর দিকে খান। ধরো আমি দিলাম মুক্ত করে, তখন তোমরা কোথায় যাবে? যে পথে এসেছে সে পথে যেতে পারবে না, একমাত্র পাখিদের পক্ষেই সম্ভব ঐ গিরিখাদের ওপরে ওঠা। তাহলে?
আমরা যাবো অগ্নি-পর্বতে। ওখানে কাজ আছে আমাদের।
স্থির চোখে ধান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো লিওর দিকে। পাগল আমি না তোমরা? অগ্নি-পর্বতে যেতে চাও! আমি তোমাদের বিশ্বাস করি না। কিন্তু… একটু যেন ভাবনায় পড়ে গেল সে, কিন্তু যদি তোমরা যাও, নিশ্চয়ই ফিরেও আসবে একদিন। তখন যে ওখান থেকে দলবল নিয়ে আসবে না তার নিশ্চয়তা কি? আমার বউকে তো নেবেই দেশটাও নেবে।
না, না, ব্যগ্রভাবে বললো লিও। সত্যিই বলছি অমন কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। আপনার স্ত্রীর এক বিন্দু হাসি বা আপনার দেশের এক কণা জমিও আমরা চাই না। ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করুন, তা যদি চাইতাম, প্রথম দিনই খানিয়ার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যেতাম। আমাদের চলে যেতে দিন, আপনি নির্বিঘ্নে রাজত্ব করুন, স্ত্রীকে বশ মানান।
