তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো আতেন। তুমি কি করে জানলে একথা?
যেমন করে আরও অনেক কিছু জেনেছি। দেখুন, আমার মনে হয় আপনি সত্যি বললেই ভালো করবেন।
কালো হয়ে গেল আতেনের মুখ। থুতনি ডুবে গেল বুকে। তীব্র ক্রোধে ফিসফিস করে উঠলো, কে বললো এ কথা? শামান, তুমি? ছোবল দিতে উদ্যত ফনিনীর মতো চাচার দিকে তাকালো সে।
আতেন, আতেন! মিনতি ভরা কণ্ঠস্বর সিমব্রির। শান্ত হও! তুমি ভালো। করেই জানো, আমি বলিনি।
তাহলে তুই, বানরমুখো ভবঘুরে, শয়তানের তল্পিবাহক, তুই-ই বলেছিস! ওহ! কেন তোকে প্রথমেই খুন করলাম না? ঠিক আছে, ভুলটা শুধরে নেবার সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
এই যে, ভদ্রমহিলা, অত্যন্ত মসৃণ গলায় আমি জবাব দিলাম, তোমার চাচার মতো আমাকেও কি যাদুকর ভেবেছো?
আচমকা আমার মুখে তুমি সম্বোধন শুনে একটু থমকালো খানিয়া। কিন্তু মুহূর্তের জন্যে। তারপর বললো, হ্যাঁ, আমবিশ্বাস তুই-ও যাদুকর। আর ঐ পাহাড়ের আগুনের ভেতর থাকে তোর জর্নিবানি, যে তোকে শিখিয়েছে এই বিদ্যা।
ছি ছি, খানিয়া, তোমার মতো একজন মহিলার মুখে এমন কুৎসিত ভাষা! যাকগে, এখন বলো, আমরা আসার পর যে সংবাদ পাঠিয়েছে তার জবাবে হেসা কি বলেছেন?
শোনো, ও জবাব দেয়ার আগেই লিও বলে উঠলো, ও-ও এখন তুমি করে সম্বোধন করছে খানিয়াকে। আমি একটা দৈব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্যে ঐ পাহাড়ে যাবো, তারপর তোমরা মীমাংসা কোরো কে বেশি ক্ষমতাবান, কালুনের খানিয়া না অগ্নি-গৃহের হেসা।
শুনলো আতেন। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। তারপর একটু হেসে বললো-এ-ই তোমার ইচ্ছা? কিন্তু, আমার মনে হয় না ওখানে এমন কেউ আছে যাকে তুমি বিয়ে করতে চাইতে পারো। ওখানে আগুন আর নির্লজ্জ অশুভ আত্মা ছাড়া তো কিছু নেই, গভীর দুঃখে উচ্চারণ করছে এমন ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে বললো খানিয়া।
আমার দেশের কিছু গোপন ব্যাপার আছে, একই রকম শীতল গলায় বলে চললো সে, কোনো বিদেশীকেই সেসব জানতে দেয়া হবে না। আমি আবার তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি বেঁচে থাকতে ওই পাহাড়ে যেতে তুমি পারবে না। আরও শুনে রাখো, লিও ভিনসি, আমি তোমার সামনে আমার হৃদয় মেলে দিয়েছি, জবাবে কি শুনেছি?-আমার খোঁজে তুমি আসোনি। এসেছো এক ডাইনীর খোঁজে। শুনে রাখো, লিও ভিনসি, ওকে তুমি কখনোই পাবে না। আমি তোমাকে আর কিছু বলবো না। তবে তুমি খুব বেশি জেনে ফেলেছে। আর সময় দেয়া যায় না, কাল সূর্যাস্তের ভেতর তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আতেনের প্রতিশোধ স্পৃহার শিকার হবে, না তার প্রেমের মর্যাদা দেবে। আমি চাই না। আমার দেশের মানুষ বলাবলি করার সুযোগ পাক, তাদের খানিয়া এক বিদেশীকে প্রেম-নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
ধীরে ধীরে, গাঢ় অথচ অনুচ্চ স্বরে ও বলে গেল কথাগুলো। প্রতিটা শব্দ যেন বিন্দু বিন্দু রক্ত হয়ে ঝরে পড়লো ওর ঠোঁট থেকে। দৃশ্যটা কখনও ভুলবো না আমি। নিশাচর পাখির মতো মিটমিটে চোখে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধ যাদুকর, পাশে রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়ানো কালুনের দীর্ঘদেহী তন্বী রানী আতেন। দুজনেরই দৃষ্টি লিওর বিরাট অবয়বটার দিকে। একজনের চোখে ভয় মেশানো প্রশ্ন, অন্যজনের দৃষ্টিতে জিঘাংসা। বুঝতে পারছি এখন কিছু একটা বলা দরকার, কিন্তু কি, ভেবে পাচ্ছি না। আমিও ওদের মতোই নির্বাক তাকিয়ে আছি ওদের দিকে।
হঠাৎ খসখস একটা শব্দ হলো পেছনে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম আমি। অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ এক ছায়া মূর্তি। আমার সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্র সামনে এগিয়ে আসতে লাগলো সে। আলোর ভেতর চলে এলো। তারপর তীব্র শব্দে ফেটে পড়লো বুনো অট্টহাসিতে।
ছায়ামূর্তি আর কেউ নয়, খান।
মুখ তুলতেই আতেনও দেখতে পেলো তাকে। ভয়ানক ক্রোধে জ্বলে উঠলো খানিয়ার চোখ।
এখানে কি করছো, র্যাসেন? গর্জে উঠলো সে। আমার পেছনে উঁকি মারতে এসেছো? যাও, তোমার রাজসভার মদ আর মেয়েমানুষের কাছে ফিরে যাও!
এখনও হেসে চলেছে লোকটা, হায়েনা যেমন হাসে।
কি শুনেছো তুমি? জিজ্ঞেস করলো আতেন, যে এত খুশি হয়ে উঠেছো?
কি শুনেছি? ওহহ! আমি শুনেছি, খানিয়া, আমার স্ত্রী, আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, আমার সভার মেয়েমানুষদের দেখলে ঘেন্নায় যার নাক কুঁচকে ওঠে, আমার সেই স্ত্রী আমাকে কেন বিয়ে করেছিল। আমি শুনেছি, আমার সেই প্রিয়তমা স্ত্রী এক হলদে দাড়িওয়ালা বিদেশীর কাছে প্রেম নিবেদন করেছে, আর সেই বিদেশী তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে হা-হা-হি-হি-হি… তীব্র তীক্ষ্ণ্ণ হয়ে উঠলো তার হাসির শব্দ। এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, আমি আমার প্রাসাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মেয়েটাকেও অমনভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারতাম না।
আমি আরও শুনেছি একটা জানা কথা—আমি পাগল। বিদেশীরা, শোনো, আমি পাগল, কারণ জানো? ঐ—ঐ নরকের কীট, ইদুরের বাচ্চা, হাত তুলে সিমব্রির দিকে ইশারা করলো সে, বিয়ের ভোজে আমার মদের সাথে ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলো। ভালোই কাজ করেছে ওর ওষুধ। সত্যি কথা বলছি, খানিয়া আতেনের চেয়ে বেশি ঘৃণা আমি কাউকে করি না। ওর স্পর্শে আমার গা গুলিয়ে ওঠে, বাতাস বিষিয়ে যায় ওর উপস্থিতিতে।
হলদে-দাড়ি, তোমারও নিশ্চয়ই তেমন হয়েছে? ঐ বুড়ো ইঁদুরের কাছে প্রেম জাগানিয়া ওষুধ, চাও, পারবে দিতে, দেখবে কত সুন্দর, মিষ্টি-মোহনীয় লাগছে ওকে। কয়েকটা মাস পরম আনন্দে কাটিয়ে যেতে পারবে। আবার সেই তীক্ষ্ণ্ণ তীব্র হাসি হেসে উঠলো র্যাসেন।
