ছয় বৃদ্ধ শামিলের পারিষদ। তাদের সাদা, পাকা বা লাল দাড়ি, মাথায় লম্বা টুপি। কারও কারও মাথায় পাগড়ি। সবার পরনে নতুন বেশমেত আর চাপকান। কোমরবন্ধে ছোরা ঝোলানো। শামিল ঘরে ঢুকলে সবাই উঠে দাঁড়ালেন! শামিল তাদের সবার চেয়ে লম্বা। শামিলসহ সবাই হাত উঠিয়ে চোখ বুজে মোনাজাত করে সবাই বসলেন, শামিল বসলেন একটা বড় তাকিয়ায়। তারপর বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে আলোচনা করলেন। অপরাধীদের বিচার হলো শরিয়া অনুযায়ী। চুরির অপরাধে দুজনের হাত কাটার রায় হলো। খুনের জন্য একজনের রায় শিরচ্ছেদ এবং তিনজনকে মাফ করে দেওয়া হলো। তারপর তারা মূল বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন–কী করে চেচেনদের রুশদের সঙ্গে যোগ দেওয়া থামানো যায়। এই প্রবণতা বন্ধ করার জন্য জামাল উদ্দিন নিচের ঘোষণাটি লেখেন :
আপনাদের ওপর সর্বশক্তিমান আল্লাহর শান্তি আসুক!
আমি জেনেছি, রুশরা আপনাদের তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলছে। তাদের বিশ্বাস করবেন না এবং আত্মসমর্পণ করবেন না। ধৈর্য ধরুন। এই জীবনে এর জন্য পুরস্কার না পেলেও পরজীবনে এর পুরস্কার পাবেন। আগে কী ঘটেছিল, স্মরণ করুন। আপনাদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার পর তারা কী করেছিল। আল্লাহ তখন ১৮৪০ সালে আপনাদের সুমতি না দিলে আপনাদের এখন তাদের সৈন্য হয়ে থাকতে হতো। আপনাদের স্ত্রীরা পায়জামা পরতে পারতেন না। তাদের বেইজ্জত করা হতো।
অতীত দিয়ে বিচার করুন ভবিষ্যতে কী হবে। নাস্তিকদের সঙ্গে থাকার চেয়ে রুশদের শত্রু হওয়া ভালো। সামান্য ধৈর্য ধরুন। আমি কোরআন আর তলোয়ার নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে আপনাদের নেতৃত্ব দেব। এখন আপনাদের কঠোর নির্দেশ দিচ্ছি সে রকম ইচ্ছা তো দূরের কথা, রুশদের কাছে আত্মসমর্পণের চিন্তাও করবেন না।
ঘোষণাটি অনুমোদন করে শামিল তাতে সই করে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।
এরপর তারা হাজি মুরাদের ঘটনা তুললেন। শামিলের কাছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি স্বীকার না করলেও জানতেন হাজি মুরাদ তার ক্ষিপ্রতা, দৃঢ়তা আর সাহস নিয়ে তার (শা) পাশে থাকলে চেচেনদের এখন যা ঘটছে, তা ঘটত না। তাই হাজি মুরাদের সঙ্গে মিটমাট করে ফেলে তাকে আবার কাজে লাগাতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তা হওয়ার নয়। সে রুশদের সাহায্য করলে কিছুতেই আর পারা যাবে না। তাকে অবশ্যই লোভ দেখিয়ে এনে মেরে ফেলতে হবে। দুভাবে তারা কাজটা করতে পারে। তিবলিসে কাউকে পাঠিয়ে তাকে সেখানেই মেরে ফেলা। না হলে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এখানে এনে মেরে ফেলা। এখানে আনার একমাত্র উপায় তার পরিবারকে, বিশেষ করে চার ছেলেকে ব্যবহার করা। শামিল জানতেন, ছেলেদের হাজি মুরাদ কত গভীর ভালোবাসেন। তাই তারা ছেলেকে দিয়েই কাজটা করবে।
উপদেষ্টারা আলোচনা শেষ করলে শামিল চোখ বুজে নিঃশব্দে বসে থাকলেন।
উপদেষ্টারা জানতেন, এর অর্থ শামিল এখন আল্লাহর নবীর (সা.) কথা শুনছেন। তিনি তাকে বলে দেন কী করতে হবে। পাঁচ মিনিট পবিত্র নৈঃশব্দ্যে কাটিয়ে শামিল চোখ খুললেন। তারপর তাদের আরও কাছে ঘেঁষে বললেন, হাজি মুরাদের ছেলেকে আমার কাছে আনুন।
ও এখানেই, জামাল উদ্দিন বললেন। আসলে হাজি মুরাদের ছেলে ইউসুফকে ভেতরে ডাকার জন্য আগেই বাহিরবাড়ির ফটকের কাছে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। পাতলা ফ্যাকাশে ছেলেটি, ছেঁড়াফাটা দুর্গন্ধ কাপড় তার পরনে। তা সত্ত্বেও চেহারা ও স্বাস্থ্য সুন্দর। তার চোখ দুটো দাদি ফাতিমার চোখের মতো কালো আর জ্বলছে।
তার বাবা শামিল সম্বন্ধে যা ভাবত, ইউসুফ তেমন ভাবত না। সে অতীতের সব ঘটনা জানত না। জানলেও সেসব দেখেনি বলে বুঝত না শামিলের প্রতি তার বাবার এত শত্রুতা কেন। খুনজাখের নায়েবের ছেলে হিসেবে যেমন সহজ স্বাধীন জীবন কাটিয়েছে, সে শুধু সেটাই চাইত। তার মনে হতো শামিলের সঙ্গে শত্রুতার কোনো প্রয়োজন নেই। বাবার অবাধ্য হয়ে এবং বিরোধিতার তেজে সে শামিলের বিশেষ ভক্ত হয়ে গিয়েছিল। শামিল পাহাড়ি এলাকায় যে শ্রদ্ধা পেত, সে-ও সেভাবেই তাকে শ্রদ্ধা করত। শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ের অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে কাঁপা পায়ে সে মেহমানখানার দরজার কাছে এল। তার চোখ পড়ল শামিলের আধবোজা চোখে! একটু থামল সে। তারপর শামিলের কাছে গিয়ে তার লম্বা আঙুলওয়ালা হাতে চুমু খেল।
তুমি হাজি মুরাদের ছেলে?
জি, ইমাম।
তুমি জানো সে কী করেছে?
আমি জানি, ইমাম। আমি এর নিন্দা করি।
তুমি লেখাপড়া জানো?
আমি মোল্লা হওয়ার জন্য পড়ছিলাম।
তাহলে তোমার বাবাকে চিঠি লিখে দাও, সে ঈদের আগে আমার কাছে ফিরে আসবে কি না। যদি আসে, তাহলে আমি তাকে মাফ করে দেব এবং সবকিছু আগের মতোই চলবে। যদি না আসে, তাহলে তোমার দাদি, মা এবং অন্যদের ভিন্ন গ্রামে পাঠিয়ে দেব, আর তোমার কল্লা কেটে ফেলব!
ইউসুফের চেহারায় কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। শামিলের কথা বুঝেছে, মাথা নেড়ে সায় দিল।
চিঠিটা লিখে আমার লোকের হাতে দিয়ো।
শামিল কথা শেষ করে অনেকক্ষণ নীরবে ইউসুফের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
লিখে দাও–তোমার ওপর আমার দয়া হচ্ছে। তোমাকে মারব না। তোমার চোখ দুটো তুলে নেব। সব বিশ্বাসঘাতকের আমি তা-ই করি!…যাও!।
শামিলের সামনে ইউসুফ শান্ত ছিল। কিন্তু তাকে মেহমানখানার বাইরে নিয়ে এলে সে তার পাহারাদারের ছোরাটা কেড়ে নিয়ে নিজেকে জখম করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাকে ধরে বেঁধে ফেলে গর্তে ফিরিয়ে নেওয়া হলো
