বিশেষ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার যে, মুসলিম-আদর্শের এই ইউরোপীয় বর্ণনায় বিদ্যার সাধনা সকলের পুরোভাগে স্থান পেয়েছে। আরবের বাহুবল পাশ্চাত্য জগতের মনে গভীর দাগ কাটে। তবে সে দাগ বেশী দিন টিকে নাই। কিন্তু মুসলমানদের বিদ্যা ও জ্ঞান বহুপথে পাশ্চাত্য চিন্তার ভিতর অনুপ্রবিষ্ট হয়। মধ্যযুগের জ্ঞান-সাধনার ইতিহাসে মুসলিম-স্পেন একটি অত্যুজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করে। আমরা আগে দেখেছি, অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর আরম্ভ–এ দুইয়ের মধ্যবর্তীকালে আরবী ভাষা-ভাষীরাই পৃথিবীর সর্বত্র সংস্কৃতি ও সভ্যতার আলোকবর্তিকার প্রধান বাহক ছিল। তাদেরই মাধ্যমে প্রাচীন দর্শক ও বিজ্ঞান পুনর্জীবন ও পুষ্টি লাভ করে এবং সম্প্রসারিত হয়। আর এরই ফলে পশ্চিম ইউরোপে রেনেসাঁর জন্মলাভ সম্ভব হয়। মুসলিম-স্পেনের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ মৌলিক চিন্তানায়ক ছিলেন আলী-ইবনে-হাজম (৯৯৪–১০৬৪)। তিনি মুসলিম জগতের সর্বাপেক্ষা বেশীসংখ্যক বইয়ের লেখক এবং দুই বা তিনজন অসাধারণ প্রতিভা সম্পন্ন বিদ্বানের অন্যতম ছিলেন। তার জীবনী লেখকেরা বলেন, তিনি ইতিহাস, ধর্ম-বিজ্ঞান, হাদীস, তর্ক-শাস্ত্র, কবিতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে ৪০০ বই লিখেন। তাঁর যেসব বই এখন পাওয়া যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে, ধর্মের তুলনামূলক বিচার বিষয়ক গ্রন্থ। এক্ষেত্রে তিনিই জগতে প্রথম গবেষক পণ্ডিত। এই গ্রন্থে তিনি বাইবেলের কাহিনী সংক্রান্ত নানা সমস্যার কথা আলোচনা করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে যে উন্নত শ্রেণীর সমালোচনা উদ্ভব হয়, তার আগে বাইবেলীয় কাহিনীর উক্ত অসামঞ্জস্য সম্বন্ধে আর কেউ কোন শব্দ করেন নাই।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পশ্চিম ইউরোপে উপকথা, গল্প ও নীতি কাহিনী ঘটিত যে সাহিত্য উৎকর্ষ লাভ করতে থাকে, তাতে পূর্ববর্তী আরবী গ্রন্থরাজির প্রভাব ও পরিচয় নিঃসন্দেহ রকমে বর্তমান। এসব আরবী গ্রন্থের ভিত্তি আবার অনেকাংশে ছিল ইন্দোপারসিক। কালীলা ও দিমনার চিত্তাকর্ষক উপকথাগুলি ক্যাস্টাইল-লিয়নের সুবিজ্ঞ এলফনসোর জন্য (১২৫২১২৮২) স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়। কিছুকাল পর খৃস্টধর্মে দীক্ষিত একজন ইহুদী ল্যাটিনে এর অনুবাদ করেন। ফারসীতে এর যে অনুবাদ ছিল, ফরাসী ভাষা মারফত তাই লা ফনটেইন’ গ্রন্থের অন্যতম মূল ছিল। কবি নিজে একথা স্বীকার করেছেন। ‘মাকামা’ ছন্দোময় গদ্যে লিখিত গ্রন্থ। এতে শব্দ-বিজ্ঞানের অনেক কৌতূহলোদ্দীপক অলংকার রয়েছে। কোন সুন্দরীর দেহরক্ষী বীরপুরুষের দুঃসাহসী কাজের বর্ণনার মারফত এতে নৈতিক উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মাকামার সঙ্গে স্পেনীয় ভাষার বর্ণনামূলক উপন্যাসগুলির ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য অনস্বীকার্য। কিন্তু আরবী ভাষা তার প্রকাশ-ভঙ্গী দ্বারা যে প্রভাব বিস্তার করে, ইউরোপের মধ্যযুগীয় সাহিত্যে তাই তার শ্রেষ্ঠ অবদান। এ প্রভাব ইউরোপীয় সাহিত্যকে তার চিরাচরিত প্রথার নির্মম সংকীর্ণতা হতে উদ্ধার করে। স্পেনীয় সাহিত্যের ভাব-ঐশ্বর্যের মূলে আছে আরবী-সাহিত্যের আদর্শ। উদাহরণ স্বরূপ, সারভেনটিস লিখিত ‘ডন কুইজটের পরিহাস রসের কথা বলা যায়। গ্রন্থকার একদা আলজিয়ার্সে বন্দী ছিলেন এবং তামাসা করে বলতেন যে, আরবীতে তার বইয়ের একটা মূল কপি আছে। যখনই যেখানে আরবী ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তখনই সেখানে কবিতা রচনার তীব্র আকাভা দেখা গেছে। অসংখ্য কবিতা মুখে মুখে চলত এবং ছোট বড় সবারই প্রশংসা লাভ করত। শব্দের সৌন্দর্য ও শ্রুতি-মাধুর্যের এই যে অনিবার্য আকর্ষণ ও আনন্দ, এ আরবী ভাষাভাষীদের প্রকৃতিগত। স্পেনীয় ভাষাতেও এ বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়। প্রথম উমাইয়া শাসনকর্তা কবি ছিলেন। তাঁর পরবর্তী কতিপয় খলীফারও কবিতা রচনার সুনাম ছিল। বেশীর ভাগ খলীফার দরবারেই রাজ-কবি থাকত এবং ভ্রমণ বা যুদ্ধকালে খলীফারা কবিদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সেভিল সর্বাপেক্ষা অধিকসংখ্যক কবির গর্ব করত। তবে এ কবিতার মশাল অনেক আগে কর্ডোভায় প্রজ্জ্বলিত হয় এবং গ্রানাডা যতকাল মুসলিম-শক্তির অধিষ্ঠান ভূমি ছিল, ততকাল তথায় এ মশাল জ্বলতে থাকে।
ইবনে-জায়দুন (১০০৩–১০৭১) একজন প্রতিষ্ঠাবান কবি ছিলেন। এক আরব অভিজাত বংশে তাঁর জন্ম হয়। তিনি প্রথমে কর্ডোভা রাজ-শক্তির বিশ্বস্ত প্রতিনিধি ছিলেন। পরে তিনি রাজ-অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হন। জনৈক খলীফার কবি কন্যা ওয়াল্লাদার প্রতি জায়দুনের প্রবল আসক্তিই বোধহয় তার পতনের কারণ ছিল। কয়েক বছর কারাগার ও নির্বাসনে থাকার পর তিনি মুক্তি লাভ করেন এবং উজিরে আজম ও সিপাহসালারের যুক্ত পদে নিযুক্ত হন। তাঁর উপাধি হয় ‘দুই ওজাতের অধিকর্তা-কলমের ওজরত আর তলোয়ারে ওজারত। উক্ত সুন্দরী এবং প্রতিভাশালিনী ওয়াল্লাদাকে মৃত্যু ১০৮৭ অপরূপ সৌন্দর্য ও সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা উভয় দিক দিয়ে গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচীন গীতি-কবি স্যাফফোর সঙ্গে তুলনা করা হয়। কবিতা ও সাধারণ-সাহিত্য উভয়ের প্রতি স্পেনীয় আরব নারীর একটা প্রবল আকর্ষণ ছিল।
সনাতন রীতির আওতা হতে আংশিক মুক্তি লাভ করে স্পেনীয় আরবী কবিতা নব নব প্রকাশ-ভঙ্গী এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি প্রায় আধুনিক মনোভাব গড়ে তোলে। মধ্যযুগীয় দুঃসাহসিক বীরত্ববাদের দৃষ্টিভঙ্গী আগেই। আরবী লোক-গাথা ও প্রেম-গীতির অভিনব ভাব-লালিত্যে আত্মপ্রকাশ করে। কণ্ঠ ও যন্ত্র উভয় প্রকার সঙ্গীতই বরাবর কবিতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রক্ষা করে চলত।
